সেলুলয়েডে ‘মা’

মা এর চেয়ে আপন কেউ আছে কি? আত্মার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত মা কে নিয়ে যুগে যুগে রচিত হয়েছে অসংখ্য সাহিত্য, নির্মিত হয়েছে চলচ্চিত্র। মা দিবসের এই প্রহরে পাঠকদের জন্য রইলো ‘মা’-কে নিয়ে বিভিন্ন ভাষায় নির্মিত কয়েকটি চলচ্চিত্র।

টু উইমেন (১৯৬০)

কিংবদন্তী অভিনেত্রী সোফিয়া লরেন অভিনীত পাঁচটি সেরা ছবির তালিকা করলে সেখানে নিঃসন্দেহে যায়গা করে নেবে টু উইমেন ছবিটি। বাইসাইকেল থিফস খ্যাত ইটালিয়ান পরিচালক ভিত্তোরিও দে সিকা পরিচালিত ছবিটিতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতার করুণ চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, দেখানো হয়েছে মানবতার করুণ উপাখ্যান। আলবার্তো মোরাভিয়ার লেখা একই নামের উপন্যাস থেকে চলচ্চিত্রটি নির্মিত হয়েছে যেখানে দেখানো হয়েছে বিশ্বযুদ্ধ হারিয়ে যাওয়া এক মা-মেয়ের করুণ গল্প। জার্মান নাৎসিবাহিনীর আক্রমণে রোমের লোকজনদের সঙ্গে লাতসিওতে পালিয়ে আসে সেসিরা (সোফিয়া লরেন) ও তার ১২ বছর বয়সী মেয়ে রোসেত্তা (ইলিউনোরা ব্রাউন)। শত্রুদের থেকে নিজের এবং মেয়ের জান ও সম্ভ্রম বাঁচানোর জন্য এক মায়ের সংগ্রাম নান্দনিকভাবে ফুটে উঠেছে টু উইমেন চলচ্চিত্রে। গীর্জার ভেতরে ধর্ষিত  হবার পর মেয়েকে জড়িয়ে ধরে মাই সুইট অ্যাঞ্জেল বলতে বলতে মায়ের কান্না আজও হৃদয়কে নাড়া দেয়। সেসিরার চরিত্রে অভিনয়ের জন্য সোফিয়া লরেন জিতেছিলেন অস্কারসহ মোট ২২টি আন্তর্জাতিক পুরস্কার।

ইংলিশ ভিংলিশ (২০১২)

২০১২ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত বলিউড ছবি ইংলিশ ভিংলিশ সংসারের যাঁতাকলে পিষ্ট উপমহাদেশের এক সাধারণ মায়ের স্বাবলম্বী হয়ে ওঠার গল্প। শশী গোডবোলে নামের এক উচ্চমধ্যবিত্তের গৃহিণীর জীবন কাহিনীকে ঘিরে গড়ে উঠেছে চলচ্চিত্রটি। তিনি দুই সন্তানের মা, স্বামী সন্তানের ঘর সামলে তার বাইরের জগৎ সম্পর্কে খুব একটা জানা হয়ে ওঠেনা। ইংরেজি ভাষায় বিশেষ দূর্বলতার কারনে স্বামী এমনকি সন্তানদের কাছেও দুকথা শুনতে হয় তার। এক আত্মীয়ের বিয়ের দাওয়াতে অংশ নিতে আমেরিকা যেতে হয় তাকে।

‘ইংলিশ ভিংলিশ’ ছবির একটি দৃশ্যে শ্রীদেবী

সেখানে গিয়ে তিনি ভর্তি হন ইংরেজি ভাষা শেখার স্কুলে। মজার ঘটনাসমূহের মাধ্যমে আস্তে আস্তে বদলে যেতে থাকে তার জীবন। গৌরি সিন্ধে পরিচালিত ছবিটি ফিল্মফেয়ারে সেরা নবাগত পরিচালক সহ অন্যান্য বেশ কিছু অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠানে পুরস্কার জিতে নেয়।

এরিন ব্রকোভিচ (২০০০)

মার্কিন চলচ্চিত্র এরিন ব্রকোভিচ অভিনেত্রী জুলিয়া রবার্টের ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা চলচ্চিত্র। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম উপকূলের বৈদ্যুতিক শক্তির এক বৃহৎ কোম্পানির বিরুদ্ধে সংগ্রামী নারী এরিন ব্রকোভিচের আইনী লড়াইয়ের সত্য ঘটনার উপর ভিত্তি করে সিনেমাটি তৈরি করা হয়েছে যেখানে ব্রকোভিচ চরিত্রে অভিনয় করেছেন জুলিয়া রবার্টস। ছবিটিতে অভিনয়ের জন্য জুলিয়া রবার্টস সেরা অভিনেত্রীর অস্কার পুরস্কার অর্জন করেন। ছবিতে সত্যিকারের এরিন ব্রকোভিচ ক্যামিও চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। ব্রকোভিচের মতে ছবির সাথে বাস্তবের মিল প্রায় ৯৮ ভাগ যার মানে সত্য ঘটনা থেকে খুব সামান্যই পরিবর্তন করা হয়েছে ছবিটি। ছবিতে এক সিঙ্গেল মাদারের তিন সন্তান নিয়ে সংগ্রামের গল্প ফুটে উঠেছে।

অল অ্যাবাউট মাই মাদার (১৯৯৯)

এ যুগের সেরা চলচ্চিত্রকারদের কাতারে নিঃসন্দেহে অবস্থান করছেন স্প্যানিশ চলচ্চিত্র পরিচালক পেদ্রো আলমোদোভার। তার পরিচালিত অল অ্যাবাউট মাই মাদারে তিনি দেখিয়েছেন ম্যানুলা নামের হাসপাতালের এক সেবিকাকে যার একমাত্র আদরের ছেলে ইস্তাবান। কিন্তু এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় ইস্তাবান মারা যায় ও তার হৃৎপিণ্ডকে স্থানান্তর করা হয় আরেকটি ছেলেকে। এই স্থানান্তরের দ্বায়িত্ব পালন করেন ম্যানুলা নিজেই। এরপরই তিনি সেবিকার কাজ ছেড়ে ফিরে যান ইস্তাবানের বাবা ও তার স্বজনদের কাছে। সেখানে গিয়ে এক এইডস রোগীর শিশুকে দত্তক নেন। এই শিশুকে পেয়ে নতুন রুপে মা হয়ে আবর্তিত হয় ম্যানুলার জীবন। স্প্যানিশ ভাষায় নির্মিত অল অ্যাবাউট মাই মাদার স্পেনে মুক্তি পায় ১৯৯৯ সালের ১৬ এপ্রিল। সেরা বিদেশি ভাষার ছবির অস্কারও জিতেছে ছবিটি।

মাদার (২০০৯)

দক্ষিণ কোরিয়ার ড্রামা নির্ভর ছবি মাদার মুক্তি পায় ২০০৯ সালে। ছবিটি পরিচালনা করেন বং জুন হো। দক্ষিণ কোরিয়ার দক্ষিণের এক ছোট শহরে ছেলেকে নিয়ে বাস করেন এক বিধবা। আশ্চর্যজনকভাবে সেখানে খুন হন একটি মেয়ে এবং তার খুনের দায়ে ফেঁসে যান বিধবার ছেলেটি। ছবিতে দেখানো হয় ছেলেকে বাঁচানোর জন্য মা-টির সত্যিকার খুনিকে খুঁজে বেড়ানোর গল্প। কোরিয়ান ভাষায় নির্মিত চলচ্চিত্রটি কান চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয়েছিলো।

মাদার ইন্ডিয়া (১৯৬৭)

‘মাদার ইন্ডিয়া’ চলচ্চিত্রের একটি দৃশ্য

অস্কারের মূল আসরে ভারত থেকে সর্বপ্রথম যে ছবিটি বিদেশী ভাষার ছবি হিসেবে লড়েছিলো তার নাম মাদার ইন্ডিয়া। চলচ্চিত্রটির পরিচালক ছিলেন মেহবুব খান এবং মুখ্য চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন নার্গিস, সুনীল দত্ত, রাজেন্দ্র কুমার এবং রাজ কুমার। সত্যিকার জীবনের স্বামী-স্ত্রী নার্গিস ও সুনীল দত্ত ছবিতে অভিনয় করেছিলেন মা ছেলে হিসেবে। তবে তখনো এদের দুজনের বিয়ে হয়নি। জানা যায় শ্যুটিং চলাকালীন আগুনের হাত থেকে নার্গিসকে বাঁচানোর ফলশ্রুতিতে সুনীলের সঙ্গে তার সম্পর্ক শুরু হয়েছিলো। মাদার ইন্ডিয়া চলচ্চিত্রের গল্প আবর্তিত হয় রাধা নামে এক দরিদ্র ভারতীয় গ্রামীণ গৃহবধূর জীবনকে ঘিরে। স্বামী শামু (রাজকুমার) ও চার সন্তানকে নিয়ে ভালোই চলছিলো সংসার। কিন্তু কৃষক শামু দুর্ঘটনায় পঙ্গু হয়ে পড়লে তাদের জীবনে নেমে আশে ঘোর অন্ধকার। নিজেকে সংসারের বোঝা মনে করে গৃহত্যাগ করে শামু। স্বামী পরিত্যক্তা রাধা নিজেকে বাচিয়ে রাখে গ্রামের ধনী মহাজন থেকে। অভাব অনটনে ছোট দুটি সন্তানের অকাল মৃত্যু ঘটে। তবে দুই ছেলে রামা ও বিরজুকে নিয়ে কৃষিকাজ করে রাধা চালিয়ে যায় তাদের জীবন সংগ্রাম।

লেডি বার্ড (২০১৭)

২০১৭ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত লেডি বার্ড ছবিটিতে বয়ঃসন্ধিকালের অস্থির সময়কে দারুণ দক্ষতার সঙ্গে সেলুলয়েডের পর্দায় দেখিয়েছেন চিত্রনাট্যকার ও পরিচালক গ্রিটা গেরভিগ। চলচ্চিত্রের জনরা হিসেবে লেডি বার্ড একটি কামিং অব এইজের গল্প। ছবিতে উল্লেখিত লেডি বার্ডের আসল নাম ক্রিস্টিন যে ক্যাথলিক হাই স্কুলের সিনিয়র ইয়ারে পড়াশোনা করছে। মেয়েটি ক্যাথলিক কালচার থেকে বের হয়ে কিছু একটা করতে, কিন্তু আসলে সে নিজেও জানে না যে সে কী চায়। ছবিতে দেখানো হয়েছে একজন ১৭ বছরের মেয়ের গল্প যে সব সময় তার মায়ের বিরোধিতা করে। মে মেয়ের মধুর খুনসুটি দিয়ে এগিয়ে যায় ছবিটির কাহিনী। ছবিতে লেডি বার্ড চরিত্রে অভিনয় করেছেন সার্শা রোনান ও মায়ের চরিত্রে ছিলেন লরি মেটক্যালফ।

মাদারস ডে (২০১৬)

তারকা সম্বলিত হলিউড চলচ্চিত্র মাদারস ডে মুক্তি পায় ২০১৬ সালে। মা দিবসকে ঘিরেই ছবিটির কাহিনী আবর্তিত যেখনে দিবসটি পালন করতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা একটি পরিবারের সদ্যসরা একত্র হয়। ছবিটির পরিচালক গ্রে মার্শালের অবশ্য ভ্যালেন্টাইন্স ডে ও নিউ ইয়ার্স ইভ নামে দিবস ভিত্তিক আরো দুটি চলচ্চিত্র রয়েছে। ছবিতে অভিনয় করেছেন জেনিফার অ্যানিষ্টন, জুলিয়া রবার্টস, কেট হাডসন সহ আরো অনেকে।

আর্টিকেলটি banglanews24.com-এ পূর্বপ্রকাশিত

লেখকের অনুমতি ছাড়া সাইটে ব্যবহৃত সকল প্রকার লেখা পুনঃপ্রকাশ বেআইনি। জরুরী যোগাযোগে ইমেইলঃ altamishnabil@gmail.com

আরো পড়ুন...