সাপলুডু : শেষমেশ জিতলো কে?

‘এ সিনেমা হিট না হলে ইন্ডাস্ট্রির কিচ্ছু হবে না’! 

গোলাম সোহরাব দোদুল পরিচালিত প্রথম সিনেমা ‘সাপলুডু’ দেখার পর মনের ভেতর থেকে এই কথাটাই বেরিয়ে আসে।

দেশের অন্যতম বড় প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান বেঙ্গল মাল্টিমিডিয়াকে দেখেছি সিনেমাটির প্রচারে তাদের সাধ্যমত চেষ্টা করতে৷ নায়ক আরেফিন শুভও বিভিন্ন টেলিভিশন, পত্রিকা, অনলাইন নিউজ পোর্টালসহ ট্রেন্ড ফলো করে দেশের বেশকিছু ইউটিউব চ্যানেলে নিজের সিনেমার প্রচারে সময় দিতে।

অনেক জায়গায় রাস্তার দু’পাশ ভরে গেছে সিনেমাটির নয়নাভিরাম পোস্টারে। শুনেছি স্টার সিনেপ্লেক্সে মুক্তির দিনে কিছুটা টিকেট সংকট ছিল, তবে আমি রাজধানীর অন্য আরেকটি সিনেপ্লেক্সে প্রথম দিনের শেষ শো-তে দেখি প্রেক্ষাগৃহে দর্শক অর্ধেক ভরতেই যেন কষ্ট হচ্ছিল। এতে সিনেমাটি দেখে তৃপ্ত হতেই মনটা আবার হতাশ হয়ে গেল!

যাইহোক, থ্রিলার এমনিতেই আমার প্রিয় জেনার। ২০১৯’র সায়াহ্নে এসে এ বছরের প্রথম বাংলাদেশি সিনেমা হিসেবে ‘সাপলুডু’র কন্টেন্ট মনে ধরলো তাই দেখতে আসা। সিনেমা শেষে বলা যায় অনেকটা তৃপ্তি নিয়েই বাড়ি ফিরেছি।

মঞ্চ ও টিভি নাটকের মহারথীদের একযোগে নিপুণ সমন্বয়ের মাধ্যমে বড়পর্দায় আনলে যে ধামাকা হয়, তারই এক জ্বলন্ত এই ‘সাপলুডু’। সিনেমাটিতে অভিনয় করেছেন আরেফিন শুভ, বিদ্যা সিনহা মিম, তারিক আনাম খান, জাহিদ হাসান, সালাহউদ্দিন লাভলু, শতাব্দী ওয়াদুদ, রুনা খান, মারজুক রাসেল, ইন্তেখাব দিনার, শাহেদ আলী, নিকুল মণ্ডলসহ আরও অনেকে।

‘সাপলুডু’র গল্পে দেখা যায় চট্টগ্রাম বিভাগের একটি ছোট্ট থানার আদিবাসীদের গ্রামে হামলা হয়। ঘটনাচক্রে নিখোঁজ হন এক বিখ্যাত ফটোসাংবাদিক। এর দায় বর্তায় এলাকার এমপি আহসানউল্লাহের (তারিক আনাম খান) উপর। বিষয়টি নিয়ে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। 

রহস্য উদঘাটনের জন্য অভিযান শুরু হয়। সিনেমাতে এমপি’র ভাই ইরফানের চরিত্রে অভিনয় করেছেন জাহিদ হাসান ও কেন্দ্রীয় চরিত্র আরমানের ভূমিকায় রয়েছেন আরেফিন শুভ-যিনি একই রাজনৈতিক দলের সক্রিয় কর্মী ও এমপি ভ্রাতা ইরফানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী। 

‘সাপলুডু’র দৃশ্যে আরিফিন শুভ

এছাড়া বাবা হারিয়ে বাড়ি থেকে বিতাড়িত তরুণী পুষ্প’র চরিত্রে দেখা যায় বিদ্যা সিনহা মিমকে। সিনেমাতে আরেফিন শুভ অভিনয়ে ফুল মার্কস না পেলেও উৎরে গিয়েছেন তার সুদর্শন লুক দিয়ে। আর নায়িকা মিমের মৌন উপস্থিতি একরাশ স্নিগ্ধতা ছড়িয়েছে। পর্দায় শুভ-মিমের প্রেমের রসায়ন মন্দ ছিল না।

তারিক আনাম খান, জাহিদ হাসান ছিলেন বরাবরের মতই দুর্দান্ত। তবে যার কথা বিশেষভাবে না বললেই নয় তিনি সালাহউদ্দিন লাভলু। পুলিশের এডিসি চরিত্রে এ ঘটনার তদন্তে নেমে তিনি নানা হাস্যরসের জন্ম দিয়েছেন। আরেফিন শুভকে নিয়ে পর্দায় তার নানা রগড় দৃশ্য দর্শকমনে আনন্দ দিয়েছে।

আশা রাখা যাচ্ছে, লাভলু এরপর থেকে সিনেমায় নিয়মিত হবেন। অন্তত মূলধারার প্রযোজক-পরিচালকরা তাদের নতুন সিনেমার কাজে এ অভিনেতার উপর যে এখনই জেঁকে বসবেন এ ব্যাপারে কোনই সন্দেহ নেই। তবে রহস্যের কিনারা কি আদৌ হয়, কারা ঘটিয়েছিল এ হামলা? এর উত্তর মিলবে সিনেমার শেষের দিকে, জানা যাবে ক্ষমতা দখলের এ ‘সাপলুডু’ খেলায় শেষমেশ কে জেতে। 

খেলার অংশ সবাই, কিন্তু কেউ একজন আড়াল থেকে খেলে সবাইকে নিয়ে। এ খেলার ভুলের মাসুল দিতে হয় নিঃশ্বাসের দামে। কতকটা ‘শেষ হইয়াও হইল না শেষ’-এর মতো সিনেমার শেষে এমন কিছু আভাস রেখে দেওয়া হয় সেটা ‘সাপলুডু’।

এতে লিনিয়ার স্টোরিটেলিং করেও নির্মাতা দোদুল থ্রিলার ঘরানার গল্পে টানটান উত্তেজনা ধরে রাখতে পেরেছেন প্রায় শেষ পর্যন্ত। এজন্য সাধুবাদ তার প্রাপ্য। গল্পে প্লটহোল একদমই ছিল না তা বলা যাবে না, তবে সেগুলো কখনোই দর্শককে মূল গল্প থেকে বিচ্যুত করেনি।

মানিকগঞ্জ, গাজীপুরের মধুপুর, রাঙ্গামাটি, বান্দরবনের লামা, কক্সবাজারের টেকনাফসহ দেশের এমন সুন্দর স্থান নেই যা ফ্রেমবন্দি করাতে বাদ রেখেছেন পরিচালক। সিনেমা দেখে মনে হচ্ছিল, বৃথাই এতদিন ব্যাংকক কিংবা বালিতে শুটিংয়ের অর্থনৈতিক ও শারীরিক ঝক্কি কেন নিয়েছে অন্যান্য নির্মাতারা! আমাদের দেশ কি কম সুন্দর নাকি? দেখার মত করে দেখতে পারাটাই আসল জরুরী বিষয়। সিনেমাটির ক্যামেরার কাজও ছিল প্রশংসা করার মতো। 

শোনা যায়, সিনেমাটির শুটিং চলাকালীন সময়ে এর কোনো স্থির কিংবা ভিডিওচিত্র পরিচালকের অনুমতি ছাড়া প্রকাশ করতে পারেননি সংশ্লিষ্ট কেউ-ই। সবার মোবাইল ফোন নাকি শুটিংয়ের সময়ে বন্ধ রেখে নির্দিষ্ট একটি জায়গায় জমা রাখা হতো। 

এ প্রসঙ্গে পরিচালক দোদুলের ভাষ্য ছিল, ‘সব কিছু আগে দেখে ও জেনে গেলে প্রেক্ষাগৃহে কেনো দর্শকরা আসবেন?’ 

সিনেমার গানগুলো শ্রুতিমধুর। কণা, হৃদয় খান, পড়শী, বাপ্পা মজুমদারসহ প্রত্যেকেই তাদের গাওয়া গানে দর্শকদের মন ছুঁয়েছেন।

সাজ্জাদুল ইসলাম সায়েম বরাবরের মতই দুর্দান্ত পাবলিসিটি ডিজাইন করেছেন এ সিনেমায়। বিগত কয়েক বছরে এদেশের আলোচিত কিংবা বিগ বাজেট প্রায় সমস্ত সিনেমার পোস্টারের ডিজাইনেই দেখা যাচ্ছে তার সরব উপস্থিতি। গলাকাটা পোস্টারের যুগ পেরিয়ে বাংলাদেশি চলচ্চিত্রকে একের পর এক নান্দনিক ও সৃজনশীল পোস্টার উপহার দেওয়ার জন্য আলাদা ধন্যবাদ প্রাপ্য এ তরুণের।

বাংলাদেশি সিনেমার বিকাশে একটি ‘সাপ-লুডু’র ব্যবসাসফল হওয়াটা খুব জরুরী। না হয় সম্ভাবনা জাগিয়েও সেই আস্তাকুড়ে পড়ে থাকবে এদেশের সিনেমা, যা আমরা কেউই চাই না। রূপালী পর্দার একটি পুনর্জাগরণের প্রত্যাশায়…

একনজরে ‘সাপলুডু’

পরিচালনা, রচনা ও চিত্রনাট্য: গোলাম সোহরাব দোদুল।
প্রযোজনা: সৈয়দ আশিক রহমান।
প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান: বেঙ্গল মাল্টিমিডিয়া।
অভিনয়: আরেফিন শুভ, বিদ্যা সিনহা সাহা মিম, তারিক আনাম খান, জাহিদ হাসান, সালাহউদ্দিন লাভলু, শতাব্দী ওয়াদুদ, রুনা খান, মারজুক রাসেল, ইন্তেখাব দিনার, শাহেদ আলী, নিকুল কুমার মণ্ডল, মৌসুমী হামিদ প্রমুখ।
সংলাপ: গোলাম সোহরাব দোদুল ও শাহজাহান সৌরভ।
সঙ্গীত পরিচালনা: বাপ্পা মজুমদার, ইমন সাহা, তানভীর আলম সজীব ও হৃদয় খান।
চিত্রগ্রাহক: রাজু রাজ।
সম্পাদনা: মো. কালাম।
মুক্তি: ২৭ শে সেপ্টেম্বর ২০১৯।
রেটিং: ৭.৯/১০।

আর্টিকেলটি banglanews24.com-এ পূর্বপ্রকাশিত

লেখকের অনুমতি ছাড়া সাইটে ব্যবহৃত সকল প্রকার লেখা পুনঃপ্রকাশ বেআইনি। জরুরী যোগাযোগে ইমেইলঃ altamishnabil@gmail.com

আরো পড়ুন...