রুপকথার পারস্যের চলচ্চিত্রবিকাশ

রুপকথার জন্য বিখ্যাত পারস্য যার বর্তমান নাম ইরান! বৃহৎ খনিজ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের ভাণ্ডারসমৃদ্ধ ইরানে আনুমানিক ১৯০০ সালে আমদানিকৃত কিছু চলচ্চিত্র দিয়ে চলচ্চিত্র প্রদর্শন শুরু হয়। ১৯০০ সালের ১৮ই আগস্ট প্রথম একজন ইরানী ক্যামেরায় চিত্র ধারণ করেছিলেন। তবে সেদেশে প্রথম পূর্নদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মিত হয় ১৯৩০ সালে যার নাম আবি ভা রাবি (আবি ও রাবি) যা পরিচালনা করেন আভানেস ওহানিয়ান। আর দেশটির প্রথম সবাক ছবির নাম দখতার ই লর (১৯৩৩)। প্রথম দিকটাতে ইরানের ছবিগুলোতে পার্শ্ববর্তী ভারতের প্রভাব বেশী থাকতো। এরসঙ্গে ইরানী চলচ্চিত্রের উপর বিপ্লবী ও ধর্ম পরিপন্থী কোনকিছু প্রদর্শনের বিধিনিষেধ চাপানোর ফলে পশ্চিমা চলচ্চিত্র প্রদর্শনে ভাটা পড়ে। তবে ষাটের দশকে ইরানের শেষ রাজা মোহাম্মদ রেজা শাহ পাহলভীর পশ্চিমাপ্রীতির কারনে বাইরের দেশের চলচ্চিত্র প্রদর্শন সুগম হয়। এসময় মার্কিনীদের সঙ্গে ইরানের রাষ্ট্রীয় সুসম্পর্ক থাকায় সেদেশের সব প্রেক্ষাগৃহ হলিউডের দখলে চলে যায়। শুধু হলিউড নয়, প্রেক্ষাগৃহে চলতো বলিউডের সিনেমাও। প্রায় তিন দশক জুড়ে ইরান নির্মান করে হলিউডের অ্যাকশন আর বলিউডের আদলে ক্লাইমেক্স, নাচ গানে  নাচ-গানে ভরপুর সব সিনেমা।

তবে ১৯৬৯ এর দিকে প্রথাবিরুদ্ধ কিছু চলচ্চিত্র ‘দ্য কাউ’, ‘কায়সার’ দিয়ে ইরানী নতুন ধারার চলচ্চিত্র নির্মান শুরু হয় যেগুলো সমাজের কথা বলে, যেসব চলচ্চিত্রের রয়েছে নিজস্ব ভাষা। চলচ্চিত্র বিশারদরা একে ‘ইরানী নবতরঙ্গ’ বলে অভিহিত করে থাকে। শুরু থেকে এখন পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে নানা সামাজিক, রাজনৈতিক বাধার সম্মুখীন হয়েছে ইরানের ছবি, তারপরেও কিছু গেরিলা ইরানী নির্মাতা স্বমহিমায় দর্শকদের বিশ্বমানের চলচ্চিত্র উপহার দিয়েছে।

আব্বাস কিয়রোস্তামি, ফারুগ ফারোখ্‌জদ, মোহসেন মাখমালবফ, আসগর ফরহাদি, জাফর পানাহি, বাহমান গবাদি, মাজিদ মাজিদি সহ নানা সময়ে ইরানী নির্মাতারা দর্শকদের উপহার দিয়েছেন ভিন্ন স্বাদের, গল্পের ছবি। বুঝিয়েছেন তাদেরও চলচ্চিত্রের নিজস্ব ভাষা রয়েছে। পিছিয়ে ছিলেননা নারী নির্মাতারাও। রাখসান বানি এতমাদ, পুরান দেরাখশানদেহ, তাহমিনা মিলানি, মারজান সাত্রাপি, সামিরা মাখমালবফর মত নারী নির্মাতারা উপহার দিয়েছেন নিজের ভাষার ভিন্নধারার চলচ্চিত্র। ইরানের অন্যতম সেরা পরিচালক আব্বাস কিয়রোস্তামি মর্যাদাপূর্ণ কান চলচ্চিত্র উৎসবের সর্বোচ্চ পুরস্কার পাম দোর জিতে নিয়েছে তার নির্মিত “টেস্ট অফ চেরি” চলচ্চিত্রের জন্য। 

অস্কারের আসরেও পরিচালক আসগর ফরহাদি একটি সফল নাম। সেরা বিদেশী ভাষার চলচ্চিত্রের জন্য দুইবার অ্যাকাডেমি পুরস্কার জিতেছেন তিনি। ছবিগুলো হলো এ সেপারেশন (২০১২) এবং দ্য সেলসম্যান (২০১৬)। এর ফলশ্রুতিতে তিনি বিদেশী ভাষার চলচ্চিত্রে দুইবার একাডেমী পুরস্কার লাভ করা আকিরা কুরোসাওয়া ও রেন ক্ল্লেমেন্টের মতো বিখ্যাত পরিচালকদের কাতারে দাড়াতে সক্ষম হয়েছেন যা ইরানী চলচ্চিত্রের জন্য বিশাল সম্মানের। শিশুতোষ চলচ্চিত্র ধাঁচের ছবি বানানো চিলড্রেন অব হ্যাভেন খ্যাত নির্মাতা মাজিদ মাজিদি ইদানিংকালে ভারতদেশেও এসে চলচ্চিত্র নির্মান শুরু করেছেন।

পাঠকদের জন্য এবারে রইলো ইরানদেশে নির্মিত কিছু আলোচিত চলচ্চিত্র আলোচনা।

দ্য কাউ (১৯৬৯)

ইরানের চলচ্চিত্রের যে নবতরঙ্গ বা নতুন ধারা সৃষ্টি হয়েছিলো সে সময়ের সবচেয়ে সফল চলচ্চিত্রের নাম দ্য কাউ। তখনও ইরানে চলছে শেষ রাজা পাহলভীর শাসন। রাষ্ট্রীয় শাসননীতি জনগণের মনে জীবন নিয়ে জন্ম দিয়েছিলো এক রকমের বিতৃষ্ণার। এমনই এক পরিস্থিতিতে ইরানের এক তরুণ নির্মাতা দারিউস মেহেরজুই নির্মাণ করেন ‘দ্য কাউ’ চলচ্চিত্রটি। 

তৎকালীন ইরানে মানবিকতার অবক্ষয়ের বিপরীতে একটি গাভীর প্রতি একজন মানুষের আত্নার টানকে চলচ্চিত্রে তুলে ধরা হয়েছে। রাষ্ট্র যেখানে জনগনের প্রতি মানবিক নয়, তখন একজন মানুষ তার গৃহে পালিত পশুটিকে যে কিভাবে ভালোবাসছে বিষয়টি উপস্থাপনের মাধ্যমে পরিচালক রাষ্ট্রযন্ত্রে মৃদু একটি ধাক্কা দিয়ে দেয়। ১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত এই চলচ্চিত্রটি রাষ্ট্রীয় অনুদানে নির্মিত প্রথম ইরানী চলচ্চিত্র হলেও ছবিটি রাষ্ট্রের শাসকদের বিরুদ্ধেই আঙ্গুল তলে। তাই মুক্তি পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি নষ্ট করার অজুহাতে নিষিদ্ধ হয় চলচ্চিত্রটি। এই ছবিটি নির্মানের মাধ্যমে পরবর্তীকালে অনেক স্বাধীন নির্মাতা চলচ্চিত্র নির্মাণে স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। দ্য কাউ চলচ্চিত্রটি এক বছর নিষিদ্ধ থাকার পর ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দে আবার মুক্তি পায়। ১৯৭১ সালে তৎকালীন সরকারকে ফাঁকি দিয়ে গোপনে ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে পাঠানো হয় এটি এবং এর ভাগ্যে জোটে আন্তর্জাতিক সমালোচক পুরস্কারসহ বেশ কয়েকটি পুরস্কার লাভ করে।

চিলড্রেন অব হেভেন (১৯৯৭)

প্রখ্যাত ইরানী নির্মাতা মাজিদ মাজিদি পরিচালিত চিলড্রেন অব হেভেন সম্ভবত বিশ্ববাসীর কাছে সর্বাধিক পরিচিত চলচ্চিত্র। ছবিটি ১৯৯৮ সালে বিদেশী ভাষার ছবি হিসেবে অস্কার পুরস্কারের জন্য মনোনীত হবার পর থেকেই সবার কাছে আলোচিত হতে থাকে ছবিটি। ইরানের একটি পরিবারের ছোট দুই ভাই-বোনের জুতো হারানোর করুণ উপাখ্যান নিয়ে নির্মিত হয়েছে ছবিটি। দুঃখ যাতনায় ভরা ছবিটি অবশ্য আনন্দময় সমাপ্তিই হয়েছে। ছবিতে ভাই আলীর চরিত্রে অভিনয় করেছেন আমির ফারুক এবং বোন জারার চরিত্রে ছিলেন বাহারি সিদ্দিকি। 

টেষ্ট অব চেরি (১৯৯৭)

আরেক গুণী নির্মাতা আব্বাস কিয়ারোস্তামি পরিচালিত ইরানী চলচ্চিত্র টেষ্ট অব চেরি মুক্তি পায় ১৯৯৭ সালে । কিয়ারোস্তামি এই ছবির জন্য কান চলচ্চিত্র উৎসবে পাম দোর অর্জন করেন। ছবির গল্প আগায় জনাব বাদি নামের এক মধ্যবয়স্ক ইরানী লোককে ঘিরে। বাদি তেহরানের রাস্তায় গাড়ি চালিয়ে যে কোন একজন মানুষ খুঁজছেন যে তাকে তার একটি অদ্ভুত কাজ করে দিতে পারবে যার বিনিময়ে লোকটিকে দেয়া হবে প্রচুর অর্থ। কাজটি হল বাদিকে তার আগে থেকে খোঁড়া কবরে সমাধিস্থ করা। ছবিতে বহুলভাবে ব্যবহৃত হয়েছে লম্বা দৈর্ঘ্যের শট। পুরো ছবি জুড়েই শূন্যতা লক্ষ করা গেছে ছবিতে আর প্রকটভাবে ফুটে উঠেছে মিনিমালিজম ব্যাপারটি।

কালার অব প্যারাডাইস (১৯৯৯)

তালিকায় রয়েছে মাজিদ মাজিদি পরিচালিত আরেকটি চলচ্চিত্র কালার অব প্যারাডাইস যার ফারসি শিরোনাম রাং এ খুদা। আট বছরের অন্ধ, বুদ্ধিমান এবং প্রকৃতিপ্রেমী মোহাম্মদের জীবনে বাস্তবতার কশাঘাত নিয়ে ছবিটি নির্মিত হয়েছে। ছবিতে বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন হুসেইন মাহজুব, মোহসেন রামেজানী, সালামেহ ফেয়জী, ফারাহনায সাফারী প্রমুখ। ছবি দেখতে গিয়ে মুহাম্মাদের কষ্টগুলো কখন যে আপনি নিজের করে নেবেন তা আপনি টেরও পাবেননা। ছবি শেষে অন্ধদের প্রতি একটি অদ্ভুত রকমের মমত্ববোধ সৃষ্টি করবে দর্শকের মনে যার রেশ থেকে যাবে আজীবন।

এ সেপারেশন (২০১১)

১৯৯৭ সালে অস্কার জয়ের কাছাকাছি গিয়েই তা হাতছাড়া হয়ে যাওয়ায় ইরানীদের আক্ষেপ ঘুচলে এ সেপারেশন চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। চলচ্চিত্রটির পরিচালনা এবং কাহিনী ‎‎লিখেছেন আসগার ফারহাদি। চলচ্চিত্রটিতে অভিনয় করেছে লেইলা হাতামি, পেয়মান মোয়াদি, সাহেব হুসাইনি, সারেহ বায়াত এবং পরিচালক কন্যা সারিনা ফারহাদি। অস্কার ছাড়াও ছবিটি বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবে জিতেছিলো গোল্ডেন বিয়ার এবং গোল্ডেন গ্লোবে সেরা বিদেশী ভাষার চলচ্চিত্র । মধ্যবিত্ত সুখী দম্পতি নাদের ও সিমিন তাদের একমাত্র মেয়ে তারমেহকে নিয়ে সুখে শান্তিতেই বাস করছিলো তেহরান শহরে। তবে একদিন সিমিন উন্নত জীবনযাপনের আশায় তেহরান ছেড়ে পরিবারকে নিয়ে বিদেশ যেতে চায়। কিন্তু এতে বাধ সাধে নাদের, নিজের অসুস্থ বাবাকে দেশে রেখে সে কোনভাবেই বিদেশ যেতে চাইছিলোনা। একারনে একসময় সিমিন নাদেরকে ডিভোর্স দিতে সিদ্ধান্ত নেয়। এমনই ঘটনা-দুর্ঘটনা ও মানসিক দ্বন্দ্ব নিয়ে সিনেমাটি গল্প এগিয়েছে।

দ্য সেলসম্যান (২০১৬)

এ সেপারেশন দিয়েই শুধু ক্ষান্ত থাকেননি পরিচালক আসগার ফারহাদি। নিজেকে ছাপিয়ে গেছেন তখনই যখন দ্য সেলসম্যান দিয়ে ইরান দ্বিতীয়বারের মত সেরা বিদেশী ভাষার অস্কার জিতে নেয় এবং দুটি ছবির পরিচালকই তিনি নিজে। তবে আশ্চর্যজনকভাবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নিষেধাজ্ঞার কারণে অস্কার অনুষ্ঠানে আসগর ফারহাদি পুরস্কার নিতে আসতে পারেননি সে সময়ে। পরিচালকের পক্ষে অনুষ্ঠানে তাই একটি বিবৃতি পড়ে শোনান আনুশেহ আনসারি। ছবিটি নামে সেলসম্যান হলেও ছবিটি কোন বিক্রয়কর্মীর জীবনের গল্প নয়। ইমাদ এবং রানা নামের এক দম্পতির গল্প বলা হয়েছে ছবিতে যাদেরকে মঞ্চে আর্থার মিলারের ডেথ অব আ সেলসম্যান নাটকটি নিয়ে কাজ করতে দেখা যায়। তবে এটির আড়ালে ছবিতে দেখানো হয়েছে এক অজ্ঞাত ব্যক্তির দ্বারা স্ত্রী রানার লাঞ্চিত হওয়া এবং পরবর্তীকালে স্বামী ইমাদের লোকটিকে খুঁজতে থাকার গল্প। ছবিতে এমাদ ও রানার চরিত্রে অভিনয় করেন সাহাব হসেইনি আর তারানে আলিদুস্তি।

ভোরের কাগজ মেলায় পূর্বপ্রকাশিত

লেখকের অনুমতি ছাড়া সাইটে ব্যবহৃত সকল প্রকার লেখা পুনঃপ্রকাশ বেআইনি। জরুরী যোগাযোগে ইমেইলঃ altamishnabil@gmail.com

আরো পড়ুন...