রবীঠাকুরের গল্পে সত্যজিতের চার কন্যা

আজ ২ মে, কিংবদন্তী চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়ের ৯৯ তম জন্মবার্ষিকী।

পরিচালনার এই বর্ণিল ক্যারিয়ারে অনেক উপন্যাসিক এর গল্প উপন্যাসেই কাজ করেছেন সত্যজিৎ রায়। তবে সবসময়ই তার একটা বিশেষ দূর্বলতা ছিলো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কর্মে। ১৯৬১ সালে সত্যজিৎ রায় রবীঠাকুরের তিন ছোটগল্প সমাপ্তি, পোস্টমাস্টার ও মণিহারা নিয়ে একত্রে নির্মাণ করেন পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘তিন কন্যা’। তার তিন বছর পর ১৯৬৪ সালে মুক্তি পায় নষ্টনীড় গল্প অবলম্বনে নির্মিত ছবি ‘চারুলতা’ যেখানে একজন নিঃসঙ্গ নারীর কথা তুলে ধরা হয়েছে। সত্যজিতের জন্মদিনের এই বিশেষ প্রহরে তিন কন্যা আর চারুলতার এক কন্যা মিলে এই চার কন্যার গল্প শোনা যাক তবে।

তিন কন্যা (১৯৬১)

১৯৬১ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শততম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে মুক্তি পায় সত্যজিৎ রায় পরিচালিত ‘তিন কন্যা’। চলচ্চিত্রটি মূলত রবীন্দ্রনাথের তিনটি ছোট গল্প পোস্টমাস্টার, মণিহারা ও সমাপ্তি থেকে করা তিনটি চলচ্চিত্রের সংকলন। প্রত্যেক গল্পের তিনটি প্রধান চরিত্রই নারী বা কন্যা, এই তিন নারী চরিত্রকে বোঝাতে চলচ্চিত্রটির নাম দেয়া হয়েছে তিন কন্যা। প্রথম গল্প পোস্টমাস্টার-এ কন্যার বয়স ৮-৯ বছরের। দ্বিতীয় গল্প মণিহারা-তে কন্যা বিবাহিতা, তার বয়স ২০-২৫। আর তৃতীয় গল্প সমাপ্তি-তে কন্যা ষোড়শী।

প্রথম গল্প পোস্টমাস্টারে আমরা দেখতে পাই শহুরে পরিবেশে বড় হওয়া পোস্টমাস্টার নন্দলালকে, যাকে চাকরির খাতিরে আসতে হয় এক অজপাড়াগাঁয়ে। তার জন্য কাজ করে ১২ বছরের এক কিশোরী যার নাম রতন। পোস্টমাস্টার মূলত এই দুই চরিত্রের মনস্তাত্তিক সম্পর্কের গল্প। নন্দলাল বেশ কিছুদিন সেই পোস্টঅফিসে কাজ করার দরুন রতনকে তার নিজের ছোট বোনটির মতো ভাবতে শুরু করে। রতনকে পড়ালেখাও শেখায় সে। নিজের ভয়াবহ অসুখ তার সময় রতন তাকে দিনরাত সেবা করে সারিয়ে তোলে। কিন্তু নন্দলাল যখন চাকরি ছেড়ে সেখান থেকে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, যাবার সময় অভিমানে রতন তার সাথে কথা বলা দূরে থাক ফিরেও তাকায় না! এই ছবিতে অভিনয় করেছেন চন্দনা বন্দ্যোপাধ্যায়, অনিল চট্টোপাধ্যায়, নৃপতি চট্টোপাধ্যায়।

অন্যদিকে, মণিহারা গল্পটি অনেকটা রহস্য ও ভৌতিকতার আবেশ তৈরি করে দর্শকমনে। ছবিতে গহনার লোভে চিত্তবিকারগ্রস্ত কন্যা মণিমালিকার ভূমিকায় অভিনয় করেন কণিকা মজুমদার আর তার স্বামী জমিদার ফণীভূষণ সাহার ভূমিকায় অভিনয় করেন কালী বন্দ্যোপাধ্যায়। ছবির কাহিনিতে দেখা যায় সোনার গয়নাতে আসক্ত জমিদার ফণীভূষণের স্ত্রী মণিমালিকা। সন্তান না হওয়ার পরিবারের লোকজনের নানান কটুকথা শুনে সবার কাছ থেকে দূরে চলে আসে তারা। ওদিকে তাদের খোঁজ পেয়ে ছুটে আসে মণিমালিকার পুরনো প্রেমিক ও দূর সম্পর্কের ভাই মধুসূদন ছোট একটা চাকরির খোঁজে। জমিদারের গুদামে লাগে আগুন, সবকিছু পুড়ে হয় ছাই, প্রয়োজন হয় প্রচুর অর্থের। সে অর্থের জোগাড় করতে মণিমালিকাকে একা রেখে শহরে যায় জমিদার। ওদিকে মণিমালিকা, লোভী মধুসূদনকে নিয়ে সমস্ত গয়নাসহ পালিয়ে যায়। জমিদার ফিরে এসে মণিমালিকার কোনো খোঁজ পায় না। এরপর জমিদার স্ত্রীর শোকে কাতর হয়ে পাগল হয়ে যায়। ছবিটিকে ভূতের ছবির তকমাও পুরোপুরিভাবে দেয়া যায় না কারণ এতে কতকটা রহস্য আর নারী মনের নতুন একটা দিকও উঠে এসেছে। ছবির শেষাংশে সোনার কঙ্কণ পরা কঙ্কালের হাত ফণীভূষণের পাশে রাখা গহনার দিকে নাটকীয়ভাবে এগিয়ে আসলে সেটি ত্রাসের সঞ্চার করে, কিন্তু এতে রহস্য উন্মোচন হয় না পুরোপুরি, মণিমালিকা আদৌ বেঁচে আছে কি নেই!

সর্বশেষ গল্প সমাপ্তিতে অভিনয় করেছেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, অপর্ণা সেন। ব্লাউজ ছাড়া শাড়ি, নাকে ফুল আর জবজবে তেল বাঁধা চুল; ডানপিটে দস্যি মেয়ে মৃন্ময়ীর চরিত্রে অপর্ণা সেনের অনবদ্য অভিনয় এখনো চোখে লেগে আছে। সারাদিন গাছে ঝুলে দস্যিপনা করা, গয়না গায়ে বাসর ঘর থেকে পালিয়ে যাওয়া, পোষা কাঠবিড়ালির সঙ্গে তার ছেলেমানুষী খেলা, ছবির শুরুর দৃশ্যে পালতোলা নৌকা, গ্রামের কর্দমাক্ত মেঠোপথ এসবই যেন আবহমান বাংলাকে ফুটিয়ে তোলে।

উল্লেখ্য, তিন কন্যা থেকে সত্যজিৎ তাঁর চলচ্চিত্রের সঙ্গীত নিজেই রচনা করতেন। ছবিটি বেস্ট ফিচার ফিল্ম এর ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড পায়। এছাড়া শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রের খেতাব জেতে মেলবোর্ন ও বার্লিন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে।

চারুলতা (১৯৬৪)

১৯০১ সালে রবীঠাকুর তার ছোটগল্প নষ্টনীড় লেখেন। এটি তার রচিত শ্রেষ্ঠ ছোটগল্পগুলোর মধ্যে একটি বলে বিবেচিত। কথিত আছে, এই গল্পটি রচিত হয় রবীন্দ্রনাথের বড় ভাই জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর, তার স্ত্রী কদম্বরী দেবী ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মধ্যেকার সম্পর্কের ওপর নির্ভর করে। এই উপন্যাসের গল্পটি, তিনটি কেন্দ্রীয় চরিত্র চারু, অমল ও ভূপতিকে নিয়ে গড়ে উঠেছে। ১৯৬৮ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত সত্যজিৎ রায়ের নির্মিত ছবি চারু, অমল ও ভূপতির চরিত্রে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, মাধবী মুখোপাধ্যায় এবং শৈলেন মুখোপাধ্যায় অভিনয় করেছিলেন। চিত্রায়ণের খাতিরে মূল গল্পের কাহিনি থেকে ছবির গল্পের কাহিনি কতকটা পরিবর্তন করা হয়েছে।

চলিচ্চিত্রটির কাহিনিতে দেখা যায়, উচ্চবিত্ত এক বাঙালি পরিবারের বড়কর্তা ভূপতি তৎকালীন রাজনৈতিক চিন্তায় মগ্ন ও অনুপ্রাণিত হয়ে নিজ বাড়িতেই একটি ইংরেজি পত্রিকা প্রকাশ করেন যার নাম দেন ‘সেন্টিনেল’। পত্রিকার কাজে তিনি দিনরাত এক করে খাটেন, কিন্তু ওদিকে তার ব্যস্ততা সদ্য যৌবনে পদার্পণকারী স্ত্রী চারুলতার প্রতি সময় না দেয়া কারণ হয়ে দাঁড়ায়। স্ত্রী চারুর সময় কাটে নিঃসঙ্গতায়। চারুর ভাই উমাপদ তার স্ত্রী মন্দাকিনীসহ তাদের বাড়িতে এসে উঠলেও তাতে নিঃসঙ্গতা কাটে না চারুর। এক সময় তাদের পরিবারে আগমন ঘটে ভূপতির পিসতুতো ভাই অমলের। চারুলতা আর অমলের দুজনেই আগে থেকে বেশ ঘনিষ্ঠতা ছিল, তবে সেটি বৌঠান-ঠাকুরপোর স্বাভাবিকতায় সীমাবদ্ধ। আস্তে আস্তে সময়ের ব্যবধানে প্রতীয়মান হয় চারুর সাথে অমলের সম্পর্ক তখন আর কেবল বৌঠান-ঠাকুরপোর নয়, এর মধ্যে অন্য কিছুও রয়েছে। এরপর অমলের বিয়ের প্রস্তাব আসে বর্ধমান থেকে। নিজের প্রতি চারুর দুর্বল হওয়ার ব্যাপারটি আঁচ করতে পেরে অমল সিদ্ধান্ত নেয় দাদার বিশ্বাসের মর্যাদা রাখতে তাকে এ বাড়ি থেকে সরে পড়তে হবে। কিন্তু  চারুর ভাই উমাপদ বিশ্বাসঘাতকতা করে তাদের পত্রিকার টাকা মেরে দিয়ে সে সস্ত্রীক বাড়ি থেকে সটকে পড়ে। এই অবস্থায় ভেঙে পড়ে ভূপতি আর সে অমলকে বাড়ি ছেড়ে না যাওয়ার অনুরোধ জানায়। কিন্তু অমল সে রাতেই দাদার উদ্দেশে একটা ছোট চিঠি রেখে বাড়ি ছেড়ে পালায়। পত্রিকা প্রকাশের ভ্রম কাটলে স্ত্রীর দিকে মনোযোগী হয় ভূপতি। কিন্তু মনের মধ্যে এখনও অমলের প্রতি অনুরাগ কমে না চারুর। ছবির শেষে অমলের চিঠি পেয়ে চারু জানতে পারে অমল বিয়ে করে ফেলছে খুব শীঘ্রই। এ খবর জানার পর কান্নায় ভেঙে পড়ে চারু যা দেখে ফেলে ভূপতি। ভাইয়ের সাথে তার স্ত্রীর সম্পর্ক বড় রকমের অশান্তিতে ফেলে দেয় ভূপতিকে। সেই দিনটিতেই যে চারু আর ভূপতির নীড়টা ভেঙে গেছে সেই রেশ নিয়ে ছবি শেষ হয়।

চলচ্চিত্রটিতে যে বাড়িতে শ্যুটিং হয়, সেটি মূলত মাটি থেকে তিন-চার তলা উঁচু হতে নির্মিত এক তলা একটি সেট যেটি নির্মাণ করেছিলেন বংশী চক্রবর্তী। দোতলার আদল দেখানোর জন্য বাড়ির বারান্দা থেকে কোনো হাই এঙ্গেল শটের ব্যবহার করেননি ছবিটির চিত্রগ্রাহক সুব্রত মিত্র। ওদিকে পান খাওয়ার অভ্যাসের কারণে মাধবী মুখার্জীকে অভিনয়ে নিতে গিয়ে খানিকটা ঝামেলায় পড়তে হয়েছিল সে সময়। পান খাওয়ার বদ অভ্যাসের ফলে দাঁতে প্রায় স্থায়ী দাগ হয়ে যাওয়ায় চিত্রগ্রাহক ডায়লগের সময় আই লেভেলের চেয়ে কিছুটা উঁচু থেকে শট নিয়েছিলেন।

দেশের বাইরে চারুলতা নিয়ে বাহবা পেলেও নিজ দেশে ছবিটির চিত্রনাট্য নিয়ে বিতর্কের মুখে পড়েছিলেন সত্যজিৎ। বেশকিছু চিত্র সমালোচক ছবিটিকে ‘নষ্টনীড়’ এর মূলানুগ না হওয়ায় অভিযোগের আঙুল তোলেন। কিন্তু সত্যজিৎ এসব সমালোচকদের কড়া জবাব দিতে একবিন্দু ভাবেননি। কিশোর কুমারের কণ্ঠে গাওয়া ছবিটির গান ‘আমি চিনিগো চিনি’ আজও দর্শকমনকে শীতল করে।

চারুলতা চলচ্চিত্রের শ্যুটিং চলাকালীন সত্যজিৎ রায় ও ছবির নায়িকা মাধবী মুখোপাধ্যায় দুজনেই বিবাহিত ছিলেন। সত্যজিৎ এর স্ত্রী ছিলেন বিজয়া রায় আর মাধবীর স্বামী অভিনেতা নির্মল কুমার। সে সময়ের চলচ্চিত্র অঙ্গনে গুজব উঠেছিল একসঙ্গে কাজ করার সূত্রে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে গিয়েছিলেন সত্যজিৎ আর মাধবী। ঘটনাটির সত্যতা পাওয়া যায়, ২০০৪ সালে প্রকাশিত সত্যজিৎ এর স্ত্রী বিজয়া রায়ের আত্মজীবনীমূলক ‘আমাদের কথা’ বইটিতে। অবশ্য নির্মল কুমারের সাথেও সংসার টিকেনি মাধবী মুখার্জির। কিন্তু সত্যজিৎ সব ভুলে আবারো ফিরেছিলেন বিজয়া রায়ের সাথে সংসারে। বাস্তবে তাদের নীড়টি আর নষ্ট হয়নি।

এই চলচ্চিত্রটি ১৯৬৪ সালে বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয় এবং সেখান থেকে সিলভার বেয়ার পুরস্কার পায়। ১৯৬৫ সালে সেরা চলচ্চিত্র হিসাবে ভারতের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের গোল্ডেন লোটাস পুরস্কার অর্জন করে এবং ওই একই বছর ১৯৬৫ সালে ওসিআইসি পুরস্কার পায় চলচ্চিত্রটি।

নষ্টনীড় উপন্যাসকে কেন্দ্র করে ২০১১ সালে চারুলতা নামে আরেকটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন পরিচালক অগ্নিদেব চট্টোপাধ্যায়। এই ছবিটিতে চারুলতার চরিত্রে অভিনয় করেছেন ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত। তিন কন্যা ও চারুলতা ছাড়াও সত্যজিৎ রায় ১৯৮৪ সালে নির্মাণ করেন ঘরেবাইরে সাহিত্যকর্ম থেকে একই নামের একটি চলচ্চিত্র যেখানে অভিনয় করেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, ভিক্টর বন্দ্যোপাধ্যায়, জেনিফার কাপুর ও স্বাতীলেখা সেনগুপ্ত।

লেখাটি বাংলানিউজ২৪-এ পূর্বপ্রকাশিত

লেখকের অনুমতি ছাড়া সাইটে ব্যবহৃত সকল প্রকার লেখা পুনঃপ্রকাশ বেআইনি। জরুরী যোগাযোগে ইমেইলঃ altamishnabil@gmail.com

আরো পড়ুন...