কোয়েরেন্টাইনে অস্কারের সেরা কিছু ছবি

বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাসের প্রকোপের কারণে থেমে গেছে জনজীবন। লকডাউন এবং কোয়েরেন্টাইনের সুবাদে মানুষজন দীর্ঘ সময়ের জন্য ঘরে থাকার সুযোগ পাচ্ছেন। আর এমন পরিস্থিতিতে সময় কাটানোর জন্য ভালো ছবি কিংবা বইয়ের বিকল্প নেই। পাঠকদের জন্য আজ রইলো অস্কারের সেরা ছবির পুরস্কার জেতা পাঁচটি আলাদা ধরণের চলচ্চিত্রের গল্প।
ওয়ান ফ্লু ওভার কুকুস নেস্ট (১৯৭৫)
অনেকের মতে জ্যাক নিকোলসনের সেরা ছবির তালিকায় দ্য শাইনিং কিংবা চায়নাটাউনকে আনলেও আমার মতে এটাই তার জীবনের সেরা অভিনয়। যুক্তরাষ্ট্রের এক পাগলা গারদের একদল পাগল এবং পাগল সর্দারকে নিয়ে সিনেমা ওয়ান ফ্লু ওভার কুকুস নেস্ট। তবে পাগলাগারদের আড়ালে ছবিতে রয়েছে রুপকধর্মী অর্থ। হাসপাতালের কঠোর শৃঙ্গলার মধ্য দিয়ে মূলত সেই দশকে আমেরিকার ভেতরকার অবস্থা ফুটিয়ে তোলা হয়েছিলো। এটি কেন কেসি রচিত একই নামের একটি উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত। ১৯৬৩ সালে এই উপন্যাসের উপর ভিত্তি করে নির্মিত হয়েছিলো একটি মঞ্চ নাটক। কিন্তু চলচ্চিত্রটিতে সেই স্ক্রিপ্ট ব্যবহৃত হয়নি। ছবিটি পরিচালনা করেন মিলশ ফরমান। এই চলচ্চিত্র প্রধান পাঁচটি ক্ষেত্রেই (ছবি, পরিচালক, অভিনেতা, অভিনেত্রী ও চিত্রনাট্য) অস্কার পুরস্কার লাভ করে যা অস্কার ইতিহাসে বিরল। গোল্ডেন গ্লোব ও বাফটা পুরস্কারেও বাজিমাৎ করে ছবিটি।
ক্রেমার ভার্সাস ক্রেমার (১৯৭৯)

একটি বিবাহ বিচ্ছেদ কি শুধু পাত্র-পাত্রীর উপরেই প্রভাব ফেলে! সন্তানের জীবনেও থেকে যায় এর বিরাট প্রভাব। সংসার জীবনের উপরে হাপিয়ে উঠে সন্তানকে বাড়িতে রেখেই গৃহত্যাগ করে জোয়ানা ক্রেমার (মেরিল স্ট্রিপ)। বাড়িতে ছেড়ে আসে ক্যারিয়ারের র‍্যাট রেসে ব্যস্ত স্বামী টেড ক্রেমার (ডাষ্টিন হফম্যান) ও হতভাগ্য সন্তান বিলিকে। এরপর শুরু হয় টেড আর বিলির একাকী পথচলা। এমন গল্প নিয়ে নির্মিত অস্কারজয়ী সিনেমা ক্রেমার ভার্সাস ক্রেমার যা পরিচালনা করেন রবার্ট বেন্টন। ১০৫ মিনিটের ছবি মনকে এককথায় উদাস করে দেয়। ছবিটি অস্কারের সেবারের আসরে সেরা ছবির সঙ্গে জিতেছিলো সেরা পরিচালক, অভিনেতা, পার্শ্ব অভিনেত্রী ও অভিযোজিত চিত্রনাট্যের পুরস্কার। ছবির চিত্রনাট্যের অন্যতম সেরা দিক হলো একপাক্ষিক নয়, এটি সংসার ছাড়া জোয়ানা কিংবা সংসারে সময় না দেয়া টেড এই দুজনের জীবনদর্শনের পক্ষকেই সমানভাবে সমর্থন জানায়। ছবি সম্পর্কে আরেকটা উল্লেখযোগ্য তথ্য দেয়া ভালো। এই ছবির আদলে নির্মিত বলিউড সিনেমাটি হয়তো অনেকেই দেখেছেন। ১৯৯৫ এ মুক্তি পাওয়া আমির খান-মনীষা কৈরালা জুটির একেলে হাম একেলে তুম।
দ্য সাইলেন্স অব দ্য ল্যাম্বস (১৯৯১)

১৯৯১ সালে মুক্তি পাওয়া হলিউডের দ্য সাইলেন্স অব দ্য ল্যাম্বস নরখাদক ধাঁচের সিরিয়াল কিলার এবং ফরেন্সিক সাইক্রেটিষ্ট হ্যানিবাল লেকটার সিরিজের ছবি যা অস্কারের আসরে ৫ টি মূল ক্যাটাগরিতেই পুরস্কার জিতে নেয়। মূল উপন্যাসটির রচয়িতা মার্কিন লেখক টমাস হ্যারিস। হ্যানিবাল চরিত্রে অ্যান্থনি হপকিন্সের দূর্দান্ত অভিনয় মনে দাগ কেটে রাখার মতো। ছবিতে জেলে বন্দি হ্যানিবালকে এফবিআই এজেন্ট ক্লারিসকে (জোডি ফষ্টার) বাফেলো বিল নামের মনোবিকারগ্রস্থ এক সিরিয়াল কিলারকে ধরার ব্যাপারে সাহায্য করতে দেখা যায়। তবে হ্যানিবালের খুনি হওয়ার গল্পগুলো জানতে আপনাকে দেখতে হবে রেড ড্রাগন (২০০২) এবং হানিবল রাইজিং (২০০৭) প্রিক্যুয়ালগুলো। বিশ্ববিখ্যাত চলচ্চিত্র সমালোচক রজার ইবার্টের মতে, হ্যানিবাল এমন একটি চরিত্র যে ডিনারের টেবিলে আপনার সেরা গল্প বলার সঙ্গী হতে পারে, যদিনা আপনি আস্ত ও জ্যান্ত থাকেন তবেই!
আমেরিকান বিউটি (১৯৯৯)

এযাবৎকালের অস্কারের আসরের সেরা ছবির পুরস্কার জেতা নান্দনিক ছবিগুলোর তালিকা করলে যে ছবিটির নাম শীর্ষস্থানে থাকবে সেটা আমেরিকান বিউটি। ছবির পরিচালক স্যাম মেন্ডেজ যিনি পরবর্তীকালে জেমস বন্ডের কিছু ব্যবসাসফল ছবিও পরিচালনা করেন। একজন মধ্যবয়সের মিডলাইফ ক্রাইসিস ও ঘুণে ধরা পারিবারিক বন্ধন ছবির মূল প্রতিপাদ্য বিষয়। পরিবারের সবার জীবনে সবকিছু থেকেও যেন তারা একে অপরের প্রতি, নিজের জীবনের প্রতি খুশি নন। ছবির মূল চরিত্রগুলো বর্তমানে থেকে সুখ খুঁজে ফেরে তাদের অতীতে গিয়ে কিংবা ভবিষ্যৎ চিন্তায়। লেস্টার বার্নাম (কেভিন স্পেসি) ছবির প্রধান চরিত্র যে সমাজ এবং পরিবারের চোখে একজন অসফল মানুষ। ছবির চরিত্রগুলো অবশ্য বাস করে যুক্তরাষ্ট্রের এক শহরতলীতে এবং বড় স্বপ্নের উদ্দেশ্যে হামেশাই নিউ ইয়র্কে যাবার বাসনা রাখে। তবে যতই অশান্তি থাকুকনা কেন তারা বাইরের দুনিয়ায় নিজেদের সুখী প্রমাণ করতে যারপরনাই ব্যস্তসন্ত্রস্ত। সমালোচক ও দর্শক সবার কাছেই বিপুল প্রশংসিত হয় অ্যামেরিকান বিউটি । সেবারের অস্কার আসরে জিতে নেয় সেরা ছবি ও সেরা পরিচালকসহ মোট পাঁচটি ক্ষেত্রে একাডেমি পুরস্কার।
আ বিউটিফুল মাইন্ড (২০০১)

মার্কিন গণিতবিদ জন ন্যাশ, যিনি গেইম থিওরি নিয়ে কাজ করার জন্য অর্জন করেন অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার। বহুল আলোচিত ও জনপ্রিয় হলিউড চলচ্চিত্র আ বিউটিফুল মাইন্ড নির্মিত হয়েছে এই জন ন্যাশের জীবনকে কেন্দ্র। রহস্য, সিজোফ্রেনিয়া ও সুন্দর মনের এক সংগ্রামী মানুষকে ঘিরে নির্মিত এই সিনেমাটি অস্কারের সেবারের আসরের সেরা ছবি, সেরা পরিচালক, সেরা অ্যাাডাপ্টেড স্ক্রিনপ্লে ও সেরা পার্শ্ব অভিনেতার পুরস্কার জিতে নেয়। ছবিটির পরিচালক রন হাওয়ার্ড ছবিটি ছাড়াও ভিঞ্চি কোড খ্যাত রবার্ট লুডলাম সিরিজের ছবিগুলো পরিচালনা করে জনপ্রিয়তা পেয়েছেন। ছবিটিতে ন্যাশের সিজোফ্রেনিয়া রোগীতে পরিণত হওয়া এবং সেখান থেকে সংগ্রামের মাধ্যমে ফিরে আসার গল্পটিকে মূলত দেখানো হয়েছে। তার স্ত্রী ও বন্ধুদের সহায়তায় মূলত ন্যাশ ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠেন ও শেষ বয়সে নোবেল পদক লাভ করেন। ছবিটি দেখতে গিয়ে নতুন একটি দিক জানা গেলো। কেউ নোবেল জিতলে তাকে সন্মান দেখানোর জন্য একটা রীতি রয়েছে, আর তা হলে নিজের প্রিয় কলমটি তাকে দিয়ে দেয়া। সিলভিয়া নাসার-এর পুলিৎজার মনোনয়ন প্রাপ্ত পাঠকপ্রিয় উপন্যাস আ বিউটিফুল মাইন্ড খ্যাত উপন্যাস অবলম্বনে তৈরি হয়েছে এ ছবিটি যার মূল চরিত্রে অভিনয় করেছে রাসেল ক্রো।

লেখাটি ভোরের কাগজে পূর্বপ্রকাশিত

লেখকের অনুমতি ছাড়া সাইটে ব্যবহৃত সকল প্রকার লেখা পুনঃপ্রকাশ বেআইনি। জরুরী যোগাযোগে ইমেইলঃ altamishnabil@gmail.com

আরো পড়ুন...