কোয়ারেন্টাইনে কান পাল্ম দর জেতা সিনেমা

পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন এবং প্রভাবশালী চলচ্চিত্র উৎসবের নাম কান চলচ্চিত্র উৎসব। দক্ষিণ ফ্রান্সের শহর কানে প্রতি বছর অনুষ্ঠিত হওয়া এ উৎসবে অংশ নেয়া ছবিগুলোর প্রতি নজর থাকে সারা বিশ্বের অসংখ্য চলচ্চিত্রমোদীদের। উৎসবটির সেরা পুরস্কারকে বলা হয় পাল্ম দর বা স্বর্ণপত্র (স্বর্ণ এর পাম পাতা)। এ পুরস্কারটি সাধারণত উৎসবের সেরা চলচ্চিত্রের পরিচালককে দেয়া হয়। পৃথিবীতে উদ্ভূত এ কোয়ারেন্টাইন সময়ের অবসরে দেখে নিতে পারেন কানের আসরে সেরা পুরস্কার জেতা এ ছবিগুলো। চলুন জেনে আসি গত তিন আসরে পুরস্কার বিজয় ছবিগুলোর গল্প।
প্যারাসাইট (২০১৯)

শুধু কান চলচ্চিত্র আসর নয়, অস্কারেও রীতিমত রেকর্ড সৃষ্টি করেছে দক্ষিণ কোরিয়ার এ ছবিটি। প্যারসাইট ছবির গল্প দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউল এর আলাদা শ্রেণীর দুই পরিবারকে ঘিরে গড়ে উঠেছে। প্রথম পরিবার মানে দরিদ্র পরিবারটি থাকে মাটির নিচে সেমি-বেজমেন্টের একটি ফ্লাটে যাকে বলা হয় বানজিহা, এই পরিবারটির মূল উপার্জন আসে পিজ্জার জন্য বানানো কাগজের বাক্সকে ভাঁজ করে! গল্পে দেখানো আরেক পরিবার বাস করে শহরের অভিজাত পল্লীর সুরম্য অট্টালিকায়। প্যারাসাইট ছবিটি আমার মতে গরিব পরিবারটির অভিজাত পরিবারে সুই হয়ে ঢুকে ফালি হয়ে বেরোনোর গল্প। গল্পের সমাপ্তি বিয়োগান্তক ধাঁচের। প্রায় ১৩২ মিনিট দৈর্ঘ্যের এই ছবিটি পরিচালনা করে সারা বিশ্বে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন পরিচালক বং জুন-হো। জানা গেছে ছবিটি নির্মান হওয়ার পর দক্ষিণ কোরিয়ার সরকার বানজিহার বসবাসকারীদের জীবনমান উন্নয়নের জন্য আলাদা নজর দিচ্ছে। সিনেমা দিয়ে সামাজিক পরিবর্তন সম্ভব এটা এই চলচ্চিত্রই আরেকবার প্রমাণ করলো। ধন্যবাদ প্যারাসাইটের পুরো দলকে।
শপলিফটার্স (২০১৮)

শপলিফটিং এক ধরনের চাতুর্যবৃত্তি পেশার নাম। সুপার শপ কিংবা বিভিন্ন দোকানে গিয়ে দামী জিনিসপত্র দোকানীকে ফাঁকি দিয়ে চুরি করে নিয়ে আসা শপিফটার্সদের কাজ। জাপানের এক অ-জৈবিক পরিবারের গল্প এ ছবিটি যাদের জীবিকা অনেকটা এই পেশানির্ভর। জাপানীয় এ ছবিটি পরিচালনা করেছেন কোরে-এদা হিরোকাজু। ছবিতে যে পরিবারের কথা বলা হয়েছে তারা রক্ত নয়, অনেকটা আত্মার সম্পর্কে একে অপরের সাথে জড়িত। জাপানের রাজধানী টোকিও শহরের বড় সব অট্টালিকার বাইরে ছোট এক বস্তিতে বাস করে এই পরিবার। বুড়ি হাটসু, স্বামী ওসামু, তার স্ত্রী নোবুইয়ো, তরুণী আকি এবং ছোট্ট ছেলে শোটা। এরা প্রত্যেকেই সমাজে কোন না কোন অপরাধে জড়িত। তবে প্রবল শীতে কাঁপতে থাকা একাকী এক মেয়ে শিশুকে দেখে সব ভুলে গিয়ে তাদের মনে ঠিকই মানবিকতার দশংন দেখা যায়, শিশুকে ঠাই দেয় নিজেদের ছোট্ট বাসায়। কান চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা ছবির সাথে শপলিফটার্স ডেনভার চলচ্চিত্র উৎসব, মিউনিখ চলচ্চিত্র উৎসবসহ আরও অনেক মর্যাদাপূর্ণ চলচ্চিত্র উৎসবসমূহে সেরা চলচ্চিত্রের পুরষ্কার পেয়েছে। এছাড়াও অস্কার, গোল্ডেন গ্লোব, বাফটাতেও সেরা বিদেশী ছবির ক্যাটাগরিতে মনোনয়ন পেয়েছে ১২১ মিনিট দৈর্ঘ্যের এ ছবিটি।
দ্য স্কয়ার (২০১৭)

২০১৭ কান চলচ্চিত্র উৎসবে স্বর্ণপাম জেতা ছবিটি নিয়ে সম্ভবত বাংলা ভাষায় আমিই প্রথম বিস্তারিত কিছু লিখছি। সুইডিশ এই ছবিটি পরিচালনা করেন রুবেন অস্টলুন্ড যার আরেক অন্যতম সেরা ছবির নাম ফোর্স ম্যাজুয়ের (২০১৪)। ছবির গল্প এক মধ্যবয়সী এলিট সমাজের প্রতিনিধি ক্রিষ্টিয়ানকে ঘিরে যে রাজধানী স্টকহোম শহরের এক্স রয়্যাল মিউজিউয়াম নামের নামকরা এক জাদুঘরের প্রধান কিউরেটর এবং সেমি সেলিব্রেটি। নিজের মিউজিয়াম থেকে মনুষত্ব নিয়ে নানান জ্ঞানগর্ভ আর্ট এক্সিবিশন ক্যাম্পেইন নামানো ক্রিষ্টিয়ান নিজেকে দয়ালু ও ভালো মানুষ মনে করলেও আদতে কি সে তাই! রাস্তায় একদিন নিজের ফোন ও মানিব্যাগ খুইয়ে এবং আমেরিকান এক সাংবাদিকের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে রীতিমত নিজের ভেতরের অন্যদিকগুলো চিনতে শুরু করে ক্রিষ্টিয়ান। মিউজিয়ামটির নতুন শিল্পকর্মের নাম দ্য স্কয়ার। ৪ বনাম ৪ ফুটের দ্য স্কয়ার শিল্পকর্মটি মূলত বিশ্বাস এবং যত্নের প্রতীকী হিসেবে প্রদর্শিত, যার ভেতর দাড়ালে সবাই সমান! এক্সিবিশনটির জন্য ভাইরাল ধরনের পিআর নিয়ে ভাবতে গিয়ে তারা এমন একটি ভিডিও কন্টেন্ট তৈরি করে ফেলেন যা পুরো দেশকে নাড়িয়ে দেয়। সমালোচনার তোপে আর্ট মিউজিয়ামটি থেকে বিনিয়োগকারীদের মুখ ফিরিয়ে নেয়ার আশংকা দেখা দেয়। কিউরেটর পদ থেকে ইস্তফা দেয় ক্রিষ্টিয়ান। ছবির কিছু দৃশ্য দর্শককে অস্বস্তিকর কিছু সত্যের মুখোমুখি দাড় করিয়ে দেয়। কিউরেটরের পদ হারিয়ে ছবির শেষে সত্যিই নিজের ভেতরের মনুষত্বের দেখা পায় ক্রিষ্টিয়ান। মোটা দাগে ছবির তেমন কোন তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা না থাকলেও মনে দাগ কাটা অনেক মুহুর্ত আছে। তবে ছবির দৈর্ঘ্য কি আড়াই ঘন্টার কি আদৌ দরকার ছিলো কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়!

লেখাটি ভোরের কাগজে পূর্বপ্রকাশিত

লেখকের অনুমতি ছাড়া সাইটে ব্যবহৃত সকল প্রকার লেখা পুনঃপ্রকাশ বেআইনি। জরুরী যোগাযোগে ইমেইলঃ altamishnabil@gmail.com

আরো পড়ুন...