কাঞ্চনজঙ্ঘা – বেড়িয়ে আসি অনত্র!

পরিব্রাজক ইবনে বতুতা একদা বলেছিলেন, ভ্রমন প্রথমে তোমাকে নির্বাক করে দেবে, তারপর তোমাকে গল্প বলতে বাধ্য করবে। ভ্রমনের মাঝে অনিন্দ্যসুন্দর সব গল্প খুঁজেছেন অনেকে। সত্যজিৎ রায়ও তার ব্যতিক্রম হননি। তার চলচ্চিত্রের চরিত্রগুলোকে কখনো ফেলেছেন বিহারের পালামৌতে বনের ধারে কোন এক ডাক বাংলোতে কিংবা কাঞ্চনজঙ্ঘার পাহাড় আর লেপচাদের মাঝে দারুন কোন পরিবেশে। ভ্রমনকে উপজীব্য করে নির্মিত কাঞ্চনজঙ্ঘা চলচ্চিত্রটি মুক্তি পায় ১৯৬২ সালে।

দেয়ালের কান থাকতে পারে, পাহাড়ের তো নেই! আর তাইতো পরিবারের সমস্ত সদস্যরা কাঞ্চনজঙ্ঘায় বেড়াতে এসে নিজেদের সমস্যাগুলো নিয়ে খোলাখুলি আলোচনা কওে এবং তা নিরসনের চেষ্টা চালায় সত্যজিৎ রায়ের মৌলিক চিত্রনাট্যের প্রথম ছবি কাঞ্চনজঙ্ঘায়। ছবিটি কাঞ্চনজঙ্ঘা পর্বতের কাছে অবস্থিত জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র দার্জিলিং-এ স্বপরিবারে ছুটি কাটাতে যাওয়া এক উচ্চবিত্ত বাঙালি পরিবারের গল্প। মৌলিক চিত্রনাট্যের পাশাপাশি এটি সত্যজিৎ রায়ের প্রথম রঙিন চলচ্চিত্রও বটে।

শিল্পপতি ইন্দ্রনাথ রায় পুরো বাড়ি শাসন করেন। তার কথার একচুল নাড়ানোর জো নেই। তাইতো দার্জিলিং বেড়াতে এসেও তার দ্বিতীয় কন্যা মনীষাকে নিজ পছন্দের পাত্রের সাথে বিয়ে দিতে তাদেরকে এক করে। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে বাবার পছন্দের প্রতিষ্ঠিত পাত্রকে পছন্দ না করে মনীষার কোলকাতার চালচুলোহীন এক যুবক অশোককে ভালো লেগে যায়। ওদিকে ইন্দ্রনাথ রায়ের অসুখী প্রথম কন্যা অনিমা ও তার স্বামী বহু বছরের সাংসারিক দ্বন্দ মিটে যায় এই সফরকে ভিত্তি করেই। ছবির কাহিনীতে হিমালয়ের বিশালতাকে পশ্চাৎপটে রেখে পরিচালক মানব সম্পর্কের জটিলতার সমস্ত উত্তরগুলো খুঁজেছেন। দার্জিলিংয়ে বেড়াতে আসা ইন্দ্রনাথ-পরিবারের ছুটির শেষ এক দিনকে কাজে লাগিয়ে একদিনে তিনি বর্ননা করেছেন পুরো গল্প। ওদিকে বৃটিশপ্রেমী ইন্দ্রনাথ রায়ের মুখের উপর চাকরির আশায় থাকা যুবক অশোকের চাকরির প্রস্তাব প্রত্যাখান তৎকালীন যুবকসমাজে দেশপ্রেমের মাত্রাকে সুনিপুণভাবে ফুটিয়ে তোলে।

চিত্রায়নের দিক দিয়ে এটিই সম্ভবত বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসের প্রথম হাইপারলিংক ছবি যার একটি যোগসূত্র থাকে যা ধীরে ধীরে দর্শকের কাছে প্রকাশ পায়। পাহাড়ের বিশালতায় মনের অজান্তে ‘এ পরবাসে রবে কে’ নামের যে রবীন্দ্র সংগীত গেয়ে ফেলেন ইন্দ্রনাথ রায়ের স্ত্রী লাবণ্য সেটি অমিয়া ঠাকুরের গাওয়া যিনি রবীঠাকুর পরিবারের একজন সদস্য। কাঞ্চনজঙ্ঘা চলচ্চিত্রটিতে আরেকটি ভালোলাগার বিষয় ইন্দ্রনাথ রায় চরিত্রে ছবি বিশ্বাস এর অভিনয়। শুরুর মত ছবির শেষটাও হয় শিশু কন্ঠে লেপচা ভাষার গানের সুরে সুরে পাহাড়ের দৃশ্য দেখানোর মাধ্যমে।

লেখকের অনুমতি ছাড়া সাইটে ব্যবহৃত সকল প্রকার লেখা পুনঃপ্রকাশ বেআইনি। জরুরী যোগাযোগে ইমেইলঃ altamishnabil@gmail.com

আরো পড়ুন...