তুম্বাড়-অভিশপ্ত এক গ্রামের গল্প

২০১৮ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত এবং ৬ বছর ধরে নির্মিত হিন্দি ভাষার পিরিয়ড হরর সিনেমা তুম্বাড়। একটি গ্রামকে নিয়ে সিনেমার নাম, যেটিকে অভিশপ্ত হিসেবে গন্য করা হয়। ছবিতে দেখানো হয় সমৃদ্ধি ও পূর্ণতার দেবীকে, যে কিনা অনন্ত সোনা-সম্পদ ও খাদ্যের প্রতীক। এই পৃথিবী দেবীর জঠর। বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের শুরুতে দেবী তার এই পেট থেকে ষোলো কোটি দেবদেবীর যারা একেক জন একেক বৈশিষ্ট্য লাভ করেন। তবে দেবীর সবচেয়ে প্রিয় ছিলো তার প্রথম সন্তান যার নাম হাস্তর। তবে হাস্তরের লোভ ও লালসার কারনে সে দেবীর সমস্ত সোনা-সম্পদ দখল করে হাত বাড়ায় খাদ্য-শষ্যের দিকে। তখনই বাকী দেবতারা তাকে মারতে উদ্দ্যত হয়।
দেবী শেষে সমঝোতার মাধ্যমে বাঁচান হাস্তরকে। শর্তমতে তাকে কেউ পূজো করবেনা এবং পৃথিবী থেকে তার নাম মুছে যাবে। এরপর বহু যুগ কেটে যায়, হাস্তর তার মায়ের গর্ভে ঘুমিয়ে থাকে। শেষমেশ তুম্বাড় গ্রামের কিছু মানুষ হাস্তরকে স্মরণ করে এবং তার নামের মন্দির গড়ে তোলেন। ক্রমে গ্রামটি হয়ে ওঠে অভিশপ্ত। দেব-দেবীদের অভিশাপ গ্রামটিতে বৃষ্টি আকারে বর্ষিত হয়ে থাকে বছরের সারা সময়টা ধরে।
মহত্মা গান্ধীর মতে এই ইহজগতের সম্পদ মানুষের প্রয়োজনকে মেটানোর জন্য যথেষ্ট, কিন্তু লোভকে মেটানোর জন্য নয়। দেবতা হাস্তরের মতোই লোভী ছিলো তুম্বাড় গ্রামের ছেলে বিনায়ক। আর তার লোভকেও হার মানিয়েছিলো বিনায়কের ছেলে পান্ডুরাং। তুম্বাড় সিনেমাটি তাই মোটাদাগে একটি লোভে পাপ, পাপে মৃত্যুর প্রবচনকে স্বার্থক করার গল্প। কেনইবা তা, সেটা জানতে আপনাকে অপেক্ষা করতে হবে ছবিটির শেষ অবদি পর্যন্ত।
ছবিটিতে বিনায়কের শৈশব, কৈশর এবং পৌড় এই তিন সময়কালে ভাগ করা হয়েছে। বৃটিশ শাসিত এবং স্বাধীন ভারতের সময়গুলোকে শিল্প নির্দেশনায় দূর্দান্তভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে ছবিটিতে। ভারতে সনাতন ধর্মের প্রাচীন কল্পকথাকে নিয়ে যে এত অসাধারণ সুন্দর সিনেমা বানানো সম্ভব তা তুম্বাড় না দেখলে বিশ্বাস হতোনা। সিনেমাটির প্রডাকশন ডিজাইন, থমথমে বৃষ্টিঘেরা তুম্বাড় গ্রামটি এখনো চোখে লেগে আছে।
ছবিটি সহ প্রয়োজনা করেছেন সোহম শাহ যিনি ছবিটিতে বিনায়কের মুখ্য চরিত্রেও অভিনয় করেছেন।

ছবিটি নির্মিত হয়েছে মারাঠি লেখক নারায়ন ধরাপ এর গল্প হাস্তর এর অনুপ্রেরণায়। এটিই প্রথম ভারতীয় চলচ্চিত্র যা সম্মানজনক ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে ফিল্ম ক্রিটিক সপ্তাহের উদ্ধোধনী চলচ্চিত্র হিসেবে প্রদর্শিত হয়েছে। ভারতীয় অস্কারখ্যাত ফিল্মফেয়ার পুরস্কারে তুম্বাড় তিনটি ক্যাটাগরিতে পুরস্কার লাভ করে যার মধ্যে ছিলো সেরা চিত্রগ্রহণ, সেরব প্রডাকশন ডিজাইন এবং সাউন্ড ডিজাইন। দীর্ঘ ছয় বছর ধরে নির্মিত ছবিটিতে তুম্বাড় গ্রামের বৃষ্টিভেজা দৃশ্যধারন করা হয়েছে চার চারটি বর্ষাকাল জুড়ে।
বলিউডের প্রচলিত বানিজ্যিক থিউরি কিংবা আর্ট ঘরানার বিপরীতে এটি একশোভাগ আন্ডাররেটেড সিনেমা আমার মতে। তবে দিনশেষে ভালো জিনিস প্রচারে আটকে থাকেনা, নাহলেকি ছবি মুক্তির দুই বছর পরে ছবিটি খুঁজে দেখে ভাবনায় বুদ হয়ে ছবিটি নিয়ে দুকলম লেখা হতো? অ্যামজন প্রাইমে সিনেমাটি সহজলভ্য। দেখলে ঠকবেননা, দ্বায়িত্ব নিয়ে এতটুকু কথা দর্শককে দেয়াই যায়!

লেখাটি ভোরের কাগজে পূর্বপ্রকাশিত

লেখকের অনুমতি ছাড়া সাইটে ব্যবহৃত সকল প্রকার লেখা পুনঃপ্রকাশ বেআইনি। জরুরী যোগাযোগে ইমেইলঃ altamishnabil@gmail.com

আরো পড়ুন...