অস্কারের সেরা ছবিঃ শেষ হাসি কার?

অ্যান্ড দ্য অস্কার গোজ টু.. আগামী ৪ই মার্চ হলিউডের ডলবি থিয়েটারে উক্ত লাইনটির পুনঃপুন উচ্চারনে আবারো মুখরিত হবে চলচ্চিত্র বিশ্ব। একাডেমি পুরস্কার (অস্কার) এর ৯০ তম আসর এটি। এই উপলক্ষে অভিনেত্রী টিফেনি হ্যাডিশ ও অভিনেতা অ্যান্ডি সারকিস গত ২৩ জানুয়ারী ঘোষণা করলেন অস্কার মনোনয়ন তালিকা। এবারের অস্কার মনোনয়নের শীর্ষে রয়েছে গিয়ের্মো দেল তোরো পরিচালিত ‘দ্য শেইপ অব ওয়াটার’ ছবিটি। এছাড়াও ক্রিস্টোফার নোলানের ‘ডানকার্ক’ ছাড়াও গোল্ডেন গ্লোব বিজয়ী ‘থ্রী বিলবোর্ডস আউট সাইড ইবিং, মিসৌরি’ ছবিগুলোও পিছিয়ে নেই। চলুন জেনে নেই অস্কারের এবারের আসরে ‘সেরা চলচ্চিত্রের’ (বেষ্ট পিকচার) মনোনয়ন প্রাপ্ত ছবিগুলোর ইতিবৃত্ত।
কল মি বাই ইওর নেইম
‘তুমি আমাকে তোমার নামে ডেকো, এবং আমি তোমাকে আমার নামে ডাকবো’, অলিভার নামের এক যুবক এলিও নামের এক কিশোরকে এভাবেই তার মনের কথা নিবেদন করছে। ইতালীয় পরিচালক লুকা গুয়াদাগনিনোর চলচ্চিত্র ‘কল মি বাই ইউর নেম’ কামিং অব এইজ ড্রামা চলচ্চিত্র। একই লিঙ্গের দুজনের ঘনিষ্ঠতার গল্প ফুটে উঠেছে চলচ্চিত্রটিতে। গতবছর জানুয়ারিতে সানড্যান্স চলচ্চিত্র উৎসবে প্রথম প্রদর্শিত হয় ছবিটি। এরপর থেকেই বোদ্ধা মহলে ছবিটি সাড়া ফেলতে শুরু করে। তিন দশমিক পাঁচ মিলিয়ন ডলার ব্যায়ের ছবিটি ইতিমধ্যে বিশ্বব্যাপী ২৬ মিলিয়ন ডলারের ব্যবসা করে ফেলেছে।
ডার্কেষ্ট আওয়ার
২০০২ সালে বিবিসির এক জরিপে সর্বকালের সেরা ব্রিটেনবাসী হিসেবে স্বীকৃত উইনস্টন চার্চিল যুক্তরাজ্যের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অধিক পরিচিত। শুধু রাজনীতিবিদ নন, ১৯৫৩ সালে তিনি তার আত্মজৈবনিক রচনার জন্য নোবেল পুরস্কার লাভ করেন! জো রাইট পরিচালিত ‘ডার্কেষ্ট আওয়ার’ ছবিটির কাহিনী ১৯৪০-এর প্রেক্ষাপটে উইনস্টন চার্চিলকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। নেভিল চেম্বারলেনের পর ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে চার্চিলের ক্ষমতার আসা, স্রোতের বিপরীতে এসে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন সময়ে হিটলারের সঙ্গে আপস না করা, ফ্রান্সের ডানক্রিক থেকে আটকে থাকা ইংরেজ সৈনিকদের বের করে আনতে ‘অপারেশন ডায়ানামো’ এর পরিকল্পনা এসব জিনিসই ফুটে উঠেছে ছবিটিতে। চার্চিলের চরিত্রে ব্রিটিশ অভিনেতা গ্যারি ওল্ডম্যান ছিলেন লা জবাব। ইতিমধ্যেই গোল্ডেন গ্লোব অ্যাওয়ার্ড বগলদাবা করে নেয়া ওল্ডম্যান এবারে ছবিটির জন্য সেরা অভিনেতার অস্কার জিতে নিলে সেটা অবাক করার কোন বিষয় হবেনা।

ডানক্রিক
উত্তর ফ্রান্সের সমুদ্রতীর ডানক্রিকে ঘটে যাওয়া ‘অপারেশন ডায়নামো’ এর ঘটনার প্রেক্ষাপট নিয়ে নির্মিত দুটি ছবি এবারের অস্কারে মনোনীত হয়েছে। ‘ডার্কেষ্ট আওয়ার’ ও ‘ডানক্রিক’ ছবিদুটো ঐতিহাসিক এই ঘটনাটিকে দুই দৃষ্টিকোন থেকে ব্যাখ্যা করে। ইনসেপশন, দ্য ডার্ক নাইট, ইন্টারস্টেলার, দ্য প্রেস্টিজ ও মেমেন্টো খ্যাত পরিচালক ক্রিস্টোফার নোলানকে নিয়ে আর নতুন করে কিছু বলার নেই। স্পিলবার্গ, ক্যামেরুনের মত সারাবিশ্বে বর্তমানে নোলানেরও রয়েছে অগনিত ভক্ত যারা তার ছবির জন্য সারাবছর মুখিয়ে থাকেন। নোলান পরিচালিত সর্বশেষ চলচ্চিত্র ‘ডানকার্ক’ এ তুলে ধরা হয়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সেই বহুল আলোচিত অভিযান অপারেশন ডায়নামোর গল্প। গতবছর জুলাইয়ে ছবিটি মুক্তি পর থেকেই বোদ্ধা ও সাধারন দর্শক, উভয় মহলে ছবিটি দারুনভাবে প্রশংসিত হয়। ‘৪ লক্ষ মানুষ বাড়ি যেতে পারছেনা, তাইতো বাড়িই তাদের কাছে এসে পড়েছে’, ছবির এই ট্যাগলাইনই অপারেশন ডায়নামোর পুরো ঘটনাকে এক লাইনে ব্যাখ্যা করে দেয়। একপারে সাগর, অপরদিকে জার্মান নাৎসি বাহিনী। ওদিকে উপর থেকে ধেয়ে আসছে জার্মান এয়ারফোর্সের বোমা। এমন অবস্থা থেকে এত সংখ্যাক ব্রিটিশ সৈনিক কিভাবে বেঁচে ফিরলো সেই অলৈকিক ঘটনার বর্ণনাটিই আছে ছবিটিতে। ১০০ মিলিয়ন ডলার বাজেটের ছবিটি ইতিমধ্যেই কামিয়ে নিয়েছে ৫২৫ কোটি ডলারেরও বেশী অর্থ। ও হ্যা, ছবিটিতে টানটান উত্তেজনার সাথে আরো রয়েছে লিজেন্ড হ্যান্স জিমারের মনোমুগ্ধকর আবহসঙ্গীত।
গেট আউট
অস্কারের সেরা ছবির মনোনয়ন তালিকায় একটিমাত্র ভৌতিক ছবি, যার নাম ‘গেট আউট’। ১০৩ মিনিটের এ ছবিটি পরিচালনা করেছেন জর্ডান পিলে। পেশায় ফটোগ্রাফার এক আফ্রিকান-আমেরিকান কৃষ্ণকায় তরুণ প্রথবারের মতো তার শ্বেতকায় বান্ধবীর বাবা-মায়ের সঙ্গে মেয়ের বাড়িতে দেখা করতে যাচ্ছে। মধুর এই যাত্রাটি একপর্যায়ে পরিণত হয় দুঃস্বপ্নে। ছবিটির গল্প যত এগোয়, ততই শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির উদ্ভব হয়ে থাকে। গতবছর ফেব্রুয়ারিতে মুক্তি পাওয়া সাড়ে চার মিলিয়ন ডলার বাজেটের ছবিটি আয় করেছে ২৫৪ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি। ছবিটির মাধ্যমে চলচ্চিত্র পরিচালনায় অভিষেক ঘটিয়েছেন অভিনেতা জর্ডান।

লেডি বার্ড
এবারের গোল্ডেন গ্লোব আসরের ‘সেরা পূর্নদৈর্ঘ্য মিউজিকাল ও কমেডি’ ক্যাটাগরির সেরা চলচ্চিত্র নির্বাচিত হয়েছে গ্রিটা গেরভিগ পরিচালিত ‘লেডি বার্ড’। ছবিটিতে একটি মেয়ের বয়ঃসন্ধিকালীন অস্থির সময়কে ভিন্ন আঙ্গিকে বড়পর্দায় তুলে ধরেছেন ছবিটির পরিচালক। নিজের নামকরনকৃত লেডি বার্ড নামক এক কিশোরীর অ্যাডভেঞ্চার ঘটনা নিয়ে নির্মিত হয়েছে লেডি বার্ড। উত্তর ক্যালিফোর্নিয়ায় বসবাসকারী কিশোরীটি মনে প্রাণে ঘৃণা করে ক্যালিফোর্নিয়া শহরকে। মায়ের অবাধ্য সেই মেয়েটি যেতে চায় আমেরিকার পূর্ব উপকূলবর্তী কোনো এক শহরে। জমে উঠতে থাকে অ্যাডভেঞ্চারের গল্প। মায়ের সাথে ঝগড়া করে যেই মেয়ে চলন্ত গাড়ির দরজা খুলে লাফিয়ে পড়তে পারে সে কতটা দস্যি তা আর বলে দিতে হয়না। দস্যিপনায় পটু ও একগুয়ে লেডি বার্ড চরিত্রে সাওইরস রোনানের সঙ্গে ছবিটিতে আরো অভিনয় করেছেন অস্কারের অন্যতম মনোয়নপ্রাপ্ত ছবি কল মি বাই ইওর নেইম ছবিটির প্রধান চরিত্র টিমোথি চালামেট।

ফ্যান্টম থ্রেড
‘ফ্যান্টম থ্রেড’ ছবির একটি বিশেষত্ব আছে, আর তা হলো ছবিটি দিয়ে তিনবারের অস্কারজয়ী অভিনেতা ড্যানিয়েল ডে-লুইস তার চলচ্চিত্র ক্যারিয়ারকে বিদায় জানানোর ঘোষণা দিয়েছেন। খুব সম্ভবত ছবিটি মুক্তির পর এটি প্রেক্ষাগৃহে দেখতেও যাননি তিনি। তার এই আকস্মিক সিদ্ধান্তের কারন তেমনভাবে জানা যায়নি, তবে মন বলছে সেরা অভিনেতার জন্য ড্যানিয়েল ডে-লুইস ও গ্যারি ওল্ডম্যানের (ডার্কেষ্ট আওয়ার) মধ্যে একটা হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে এবারের অস্কারে। নির্মাতা পল থমাস এন্ডারসন পরিচালিত চলচ্চিত্র ফ্যান্টম থ্রেড এর পটভূমি ১৯৫০-এর লন্ডন, রেনল্ডস উডকক (ড্যানিয়েল) নামের এক ফ্যাশন ডিজাইনার ছবিটির প্রধান চরিত্র। লন্ডনের ফ্যাশন জগতের খ্যাতিপ্রাপ্ত ফ্যাশন ডিজাইনার উডককের জীবনে প্রেম আসে বেশ দেরিতে। নানা চড়াই উৎরাই দিয়ে ছবির গল্প তথাপি উডককের প্রেম মোড় নেয় আকাঙ্ক্ষিত কোন পরিণতিতে। জেনে রাখা ভালো, ছবির পরিচালক পল থমাস এন্ডারসনের পরিচালনায় এটি ড্যানিয়েলের দ্বিতীয় চলচ্চিত্র। একসাথে করা তাদের প্রথম ছবি দেয়ার উইল বি ব্ল্যাড ড্যানিয়েলকে তার ক্যারিয়ারের দ্বিতীয়বারের মতো অস্কার এনে দিয়েছিলো।

দ্য পোষ্ট
অস্কারের মত এত বড় আসর আর তাতে স্টিভেন স্পিলবার্গ থাকবেনা তা কি করে হয়! চলচ্চিত্র নির্মাণ করে সর্বকালের সবচেয়ে বেশি অর্থ উপার্জনকারী হিসেবে স্বীকৃত স্পিলবার্গ এবারের অস্কারে হাজির হচ্ছেন ‘দ্য পোষ্ট’ নামের একটি ছবি নিয়ে। শুধু হাই প্রোফাইল পরিচালক নয়, অস্কার বিজয়ী অভিনেত্রী মেরিল স্ট্রিপ ও অভিনেতা টম হ্যাঙ্কসকে মুখ্য দুই চরিত্রে দেখা যাবে এই চলচ্চিত্রে। ৭০ দশকের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে তুলে ধরা হয়েছে এই ছবিটিতে। ভিয়েতনাম যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট’ এবং ‘দ্য নিউইয়র্ক টাইমস’ এর নির্ভীক সাংবাদিকদের ‘পেন্টাগন পেপারস’ প্রকাশের কাহিনী নিয়ে তৈরি করা হয়েছে এই ছবিটি। ১১৬ মিনিটের পলিটিকাল থ্রিলার এ ছবিটি মুক্তি পেয়েছে গতবছরের ২২ ডিসেম্বর।

শেপ অব ওয়াটার
শুধু ভৌতিক নয়, ফ্যান্টাসি ঘরানার চলচ্চিত্রও রয়েছে এবারের অস্কারের সেরা ছবি মনোনয়ন তালিকায়। ‘শেপ অব ওয়াটার’ শিরোনামের এ ছবিটি পরিচালনা করেছে গিয়ের্মো দেল তোরো। গতবছর ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা চলচ্চিত্র পুরস্কার দ্য গোল্ডেন লায়ন জিতে নিয়েছে ছবিটি। শুরু তাই নয়, ৭১তম বাফটা অ্যাওয়ার্ডের মনোনীতদের তালিকায়ও ১২ টি বিভাগে মনোনয়ন নিয়ে এগিয়ে আছে দেল তোরো পরিচালিত এ ছবিটি। জলজ এক জীবের সঙ্গে এক মানবীর মমতাময় ও অদ্ভুতুড়ে প্রেমের আখ্যান ‘দ্য শেইপ অফ ওয়াটার’। গল্পের প্রেক্ষাপট ১৯৬২ সালের দিকের একটি গবেষণাগার। বিচিত্রময় সব বিষয়ের উপরে গবেষণা করা হয় সেখানটায়। গবেষণাগারে কাজ করা এক বাকশক্তিহীন তত্ত্বাবধায়ক প্রেমে পড়েন গবেষণার জন্য আনা অনেকটা রুপকথার জলমানবের মত দেখতে এক অদ্ভুত আকৃতির জলজ প্রাণীর। অ্যামাজনের আদিবাসীরা এই প্রাণীটিকে আবার পূজা করে থাকে। সর্বাধিক ১৩টি মনোনয়ন পেয়ে এবারের অস্কারের আসরে শক্ত অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে শেপ অব ওয়াটার ছবিটি। তবে অস্কারের সর্বাধিক মনোনয়নের পাশাপাশি অভিযোগ উঠেছে ছবিটির প্লট নিয়ে। হলিউড গনমাধ্যমে এসেছে এটির কাহিনী নাকি প্রখ্যাত নাট্যকার পল জিন্দেল রচিত ও মঞ্চস্থ নাটক ‘লেট মি হিয়ার ইওর হুইসপার’ থেকে টুকে নেয়া হয়েছে। তবে সেই অভিযোগের পুরোপুরি সত্যতা মেলেনি।

থ্রি বিলোবোর্ডস আউটসাইড এবিং, মিসৌরী
সড়কের ধারে বড় বড় বিলোবোর্ডে শহরের পুলিশের গাফিলতিকে অঙ্গুলিপ্রদর্শন। ‘থ্রি বিলবোর্ডস আউটসাইড এবিং, মিসৌরি’ চলচ্চিত্রটি মূলত খুনের ঘটনায় মেয়ে হারানো মায়ের এবং কর্তব্য পালনে ব্যর্থ পুলিশের দ্বন্দের গল্প। ছবির গল্পে দেখা যায়, মেয়ের হত্যাকারীদের খুঁজে বের করতে পুলিশের অবহেলায় হতাশাগ্রস্থ হয়ে পড়েন তার মা। তাই তিনি সড়কের দু’ধারে ধারের বিলবোর্ডগুলোতে তার মনের ক্ষোভের প্রকাশ ঘটিয়ে বিভিন্ন জিনিস লিখে খুনটির পুনঃতদন্তের জন্য পুলিশের উপর চাপ দিয়ে থাকেন। শুধু লেডি বার্ড নয়, গোল্ডেন গ্লোবের এবারের আসরের ‘সেরা পূর্নদৈর্ঘ্য ড্রামা’ ক্যাটাগরির সেরা চলচ্চিত্রের খেতাব জিতেছে ‘থ্রি বিলোবোর্ডস আউটসাইড এবিং, মিসৌরী’ ছবিটি।

লেখকের অনুমতি ছাড়া সাইটে ব্যবহৃত সকল প্রকার লেখা পুনঃপ্রকাশ বেআইনি। জরুরী যোগাযোগে ইমেইলঃ altamishnabil@gmail.com

আরো পড়ুন...