কিটন-লরেল হার্ডি-লয়েড: নির্বাক যুগে হলিউড

শুধু কি চার্লি চ্যাপলিন, হলিডের নির্বাক যুগে অভিনয় করে গেছেন অজস্র অভিনেতা অভিনেত্রী। কালের খেয়ায় অধিকাংশজনকে ভুলে গেছে সময়। তবে সময়কে পেছনে ফেলে আবার কালোতীর্ণ হয়েছেন কেউ কেউ। আজকের আয়োজনটি হলিউডের সেসব কিছু তারকাদের নিয়ে।

বাষ্টার কিটন

পর্ক পাই হ্যাট পরিহিত নির্বাকযুগের এই অস্কারজয়ী মার্কিন কমেডি অভিনেতা ও চলচ্চিত্র পরিচালককে চিনতে পারছেন? তার নাম বাস্টার কিটন, যাকে কিছু ক্ষেত্রে চার্লি চ্যাপলিনের চেয়েও প্রতিভাবান ভাবা হয় । সিনেমা জগতে এই ২ জনের প্রভাব এতই যে কিটন ও চ্যাপলিনের প্রতিযোগিতার বিষয়টি ফিল্ম স্টাডিজে আলাদাভাবে গুরুত্ব দিয়ে পড়ানো হয়।

চাঁদে কিংবা এভারেষ্টে প্রথম পা রাখার মানুষটিকেই বিশ্ববাসী মনে রাখে। চলচ্চিত্র ইতিহাসেও কিটনের ক্ষেত্রে ঘটেছে প্রায় একই ঘটনা। নির্বাক সিনেমায় চ্যাপলিনের আধিপত্য এতটাই বেশী ছিলো যে বিশ্ববাসী এখন ভুলে গেছে কিটনের নাম। তবে আমেরিকান ফিল্ম ইনিস্টিটিউট তাঁকে সর্বকালের সেরা অভিনেতার তালিকায় ২১তম স্থান দিয়েছে। সিকুয়েন্স যতোই গুরুগম্ভীর হোক আর যতোই হাসির হোক তার মুখের ভঙ্গির কোনো পরিবর্তন হতো না। এটিই ছিলো তার সিগনেচার স্টাইল । বাষ্টার কিটন এজন্য দর্শকদের কাছে পরিচিত ছিলেন ‘দ্য গ্রেট স্টোন ফেস’ নামে। কিটনের আরেকটি নাম হলো দ্য মাইকেলেঞ্জেলো অফ সাইলেন্ট কমেডি।

জোসেফ ফ্র্যাংক বাস্টার কিটন জন্মগ্রহণ করেন ১৮৯৫ সালের ৪ঠা অক্টোবর। ছোট বেলায় প্রকৌশলী হতে চাইলেও শেষমেশ বাবা মা অভিনয় পেশায় থাকার কারনে সেদিকেই ঝোঁকেন তিনি। চার বছর বয়স থেকেই শুরু করেছিলেন অভিনয়, তবে মজার ব্যাপার হচ্ছে সে বয়সে তাকে খুব একটা টানতোনা থিয়েটার মঞ্চ। তবে স্কুলে ভর্তির পরই অভিনয় ব্যাপারটা উপভোগ করা শুরু করলেন তিনি, শুরু করলেন নিয়মিত থিয়েটার। তবে সিনেমার পোকা মাথায় ঢুকলে ছেড়ে দিলেন থিয়েটার। সিনেমার শুরুটাও হয় তার বাবার হাত ধরেই, বাবার এক বন্ধু পরিচালক তাকে সিনেমায় অভিনয়ের সুযোগ করে দিলেন।  অভিনয়ের পর সিনেমা পরিচালনা ও লেখালেখিও শুরু করেন তিনি। কিটনের আরেকটি বৈশিষ্ট ছিলো তিনি নিজের সিনেমার সমস্ত স্টান্ট নিজেই করতেন। চ্যাপলিনের চেয়ে কিছুটা গতিশীল চলচ্চিত্র তিনি নির্মান করেছেন যেখানে স্টান্ট এর প্রয়োজনীয়তা ছিলো। তার সিনেমায় অন্য চরিত্রের স্টান্টও তিনি মাঝে মাঝে করে দিতেন। উচু পাহাড় থেকে গড়িয়ে পড়া কিংবা লাফ দেয়া, বাইকের সম্মুখপ্রান্ত বসে বাইক চালানো এসব ছিলো কিটনের কাছে নস্যি। পরবর্তীতে তার এই স্টান্ট অভিজ্ঞতা অনুপ্রেরণা দিয়েছে জ্যাকি চ্যান এর মত অভিনেতাদের। তার আলোচিত তিনটি ছবির মধ্যে রয়েছে শার্লক জুনিয়র, দ্য জেনারেল ও দ্য ক্যামেরাম্যান।

শার্লক জুনিয়র (১৯২৪) তার ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা চলচ্চিত্র। চলচ্চিত্রে কিটনকে একটি সিনেমা হলের প্রজেকশনিস্ট ও ঝাড়ুদার এর ভূমিকায় অভিনয় করতে দেখা যায়। ছবিতে কিটনকে পছন্দের মেয়েটিকে কাছে পাবার জন্য স্থানীয় এক প্রভাবশালীর সঙ্গে লড়াই করতে দেখা যায়। এই সিনেমার একটি দৃশ্যে স্টান্ট করতে গিয়ে আহত হন, যা তাকে আট বছর ভোগায়।  তিনি এতই পারফেকশনিষ্ট ছিলেন একটি পুল খেলার দৃশ্যের ট্রিকস শট খেলতে তাকে চার মাস অভিজ্ঞদের কাছে তালিম নিতে দেখা গেছে। ছবিটি পরিচালনা করেন কিটন নিজেই।

দ্য জেনারেল (১৯২৬/২৭) চলচ্চিত্রটি কিটনের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বিতর্কিত সিনেমা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গৃহযুদ্ধের সময় একটি সত্য ঘটনা অবলম্বনে নির্মিত হয়েছে ছবিটি। এটি যৌথভাবে পরিচালনা করেন বাষ্টার কিটন ও ক্লাইড ব্রুকম্যান। প্রেমিকা ও ট্রেন দুটিকেই একই সাথে বাঁচানোর গল্প দ্য জেনারেল। ছবিতে ট্রেন ইঞ্জিনিয়ার জনি গ্রে এর চরিত্রে অভিনয় করেন কিটন। ছবিটি আমেরিকান ফিল্ম ইনিষ্টিটিউটের সর্বকালের সেরা ১০০ চলচ্চিত্রের তালিকায় স্থান পেয়েছে।

কিটনের আরেকটি আলোচিত ছবি দ্য ক্যামেরাম্যান (১৯২৮)। মেট্রো-গোল্ডউইন-মেয়ার প্রযোজনা সংস্থার সাথে কিটনের প্রথম চলচ্চিত্র এটি। ছবিতে নিউ ইয়র্ক এক আলোকচিত্রীর ভূমিকায় অভিনয় করেছেন তিনি।

যেই চার্লি চ্যাপলিন আর বাষ্টার কিটনের দৌরথ নিয়ে আলোচনা সেই দুজনের মধ্যে ব্যক্তিগত সম্পর্ক কেমন ছিলো? জানা যায়, শীর্ষস্থান নিয়ে স্নায়ুযুদ্ধ থাকলেও দুজনেই দুজনের শুভাকাঙ্ক্ষী ছিলেন। তাইতো কিটন পরিচালিত ওয়ান উইক (১৯২০) চলচ্চিত্রে চ্যাপলিন যেমন অভিনয় করেছিলেন তেমনি চ্যাপলিনের ছবি লাইমলাইট (১৯৫২) এর চলচ্চিত্রে তার সঙ্গে পর্দা ভাগ করেছিলেন কিটন।

বিখ্যাত সিনে-ম্যাগাজিন এন্টারটেইনমেন্ট উইকলি-তে সর্বশ্রেষ্ঠ পরিচালকের তালিকায় সাত নম্বর, আমেরিকান ফিল্ম ইন্সটিটিউট এর হলিউডের গ্রেটেস্ট ক্লাসিক সিনেমা স্টারের তালিকায় ২১তম স্থান নিজের করে নিয়েছেন এ গুণী অভিনেতা-পরিচালক। আর কর্মের সন্মাননা হিসেবে ১৯৫৯ সালে জিতেছিলেন সম্মানসূচক অস্কার, হলিউড ওয়াক অব ফেইম এও আছে তার জন্য দুটি স্টার।

লরেল-হার্ডি

স্ট্যান লরেল ও অলিভার হার্ডি, চলচ্চিত্রের শুরুর দিকের কমেডিয়ান জুড়ি বলতে তাদের কথাই আসে। স্ট্যান লরেলের প্রকৃত নাম আর্থার স্ট্যানলি জেফারসন আর অলিভার হার্ডির প্রকৃত নাম নরভেল হার্ডি। লরেল জন্ম নেন ইংল্যান্ডের ল্যাংকাশায়ারে আর হার্ডির জন্ম যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়ায়। তবে ভাগ্য পরিক্রমায় বৃটিশ ও আমেরিকার এই যুগল কিভাবে মিলিত হলে দুনিয়া কাঁপালেন সেটা অদৃষ্টের লিখন ছাড়া আর কিছুইনা। সম্পুর্ন ভিন্ন অবয়বের লরেল ছিলেন রোগা-পাতলা আর হার্ডি ছিলেন নাদুস নুদুস। বিপাকে পড়ার পর হার্ডির একটি কমন সংলাপ ছিলো যা হলো, ওয়েল, দ্যাটস অ্যানাদার ফাইল মেস ইউ আর গাটেন মি ইনটু (বেশ, তুমি আমাকে আরেকটা গ্যাঁড়াকলে ফেলে দিয়েছ)!

১৯২১ সাল থেকে দ্য লাকি ডগ চলচ্চিত্র থেকে এই জুটির শুরু। এরপর ১৯৫১ পর্যন্ত তারা দুজনে জুটি বেঁধে শতাধিক কমেডি ছবিতে অভিনয় করেছেন যার মধ্যে যেমন ছিলো নির্বাক ঠিক তেমনি নানা সবাক চলচ্চিত্র। দ্য মিউজিক বক্স, বেবসা ইন টয়ল্যান্ড, ওয়ে আউট ওয়েষ্ট, হেল্পমেটস, অ্যানাদার ফাইন মেস, সন্স অব দ্য ডেজার্ট, ব্লক-হেডস, বিজি বডিস এই জুটির আলোচিত কিছু ছবির নাম। লরেল হার্ডির ছবিগুলো দিয়ে তার প্রযোজক পরিচালকেরা অজস্র ডলার উপার্জন করলেও তারা মারা গেছেন অভাব অনটনে জর্জরিত হয়ে। হার্ডি পরলোকগমন করেন ১৯৫৭ সালে, আর লরেল ১৯৬৫ সালে।

হ্যারল লয়েড

শুধু চার্ল চ্যাপলিন আর বাষ্টার কিটন নয়, নির্বাক চলচ্চিত্রের ইতিহাসে সেরা অভিনেতাদের তালিকায় আরো একজনের নাম উচ্চারিত হয় যার নাম ল্যারল্ড লয়েড। অভিনেতা লয়েড জন্মগ্রহণ করেন ১৮৯৩ সালের ২০শে এপ্রিল আমেরিকার নেব্রাস্কা প্রদেশে। ১৯২৪ থেকে ১৯৪৭ সালের মধ্যে প্রায় ২০০ এর মত সবাক ও নির্বাক কমেডি ঘরানার ছবিতে অভিনয় করেছেন জয়েড। তার গ্লাস ক্যারেক্টার সিরিজ দিয়ে তিনি মূলত দর্শকমহলে জনপ্রিয়তা পান। তার পড়া গোলাকার রিমের চশমাকে পরে লয়েড চশমা হিসেবে নাম দেয়া হয়। তার চলচ্চিত্রের বিশেষত্ব হলো এতে এতে লম্বা দৈর্ঘ্যে কাউকে তাড়া করা কিংবা রোমাঞ্চকর শারীরিক কসরতের দৃশ্য থাকতো। শুটিং এর কাজে একটি বোমা নিয়ে দুর্ঘটনায় তার ডান হাতের আঙুল ক্ষতিগ্রস্থ হয়। ফলে পরের দিকে ছবিগুলোতে তাকে একটি বিশেষ কৃত্রিম প্রসথেটিক দস্তানা ব্যবহার করতে দেখা যেতো।

তার সেফটি লাষ্ট (১৯২৩) চলচ্চিত্রে বহুতল ভবনে ঘড়ি ধরে ঝুলে থাকার দৃশ্যটি চলচ্চিত্র ইতিহাসের অন্যতম আইকনিক দৃশ্য। তবে এটির দৃশ্যধারন সত্যি সত্যি করা হয়নি, এতে ছিলো ট্রিক শর্টের ব্যবহার। সেফটি লাষ্ট ছাড়াও দ্য ফ্রেসম্যান (১৯২৫), দ্য কিড ব্রাদার (১৯২৭), গার্ল শাই (১৯২৪), গ্রান্ডমাস বয় (১৯২২), স্পিডি (১৯২৮) প্রভৃতি লয়েড অভিনীত অন্যতম সেরা চলচ্চিত্র।

চ্যাপলিনের মত লয়েডের ছবিগুলো অতটা ব্যবসাসফল না হলেও বিশ্ব চলচ্চিত্র ইতিহাসে তার অভিনয় দক্ষতার জন্য তিনি চলচ্চিত্রপ্রেমীর মনে স্থান করে নিয়েছেন। মোশন পিকচারে তার অবদানের জন্য হলিউড ওয়াক অব ফেইমে তার নামে রয়েছে একটি স্টার। ১৯৫৩ সালে তিনি মাষ্টার কমেডিয়ান ও ভালো নাগরিক হিসেবে জিতে নেন সন্মানসূচল অস্কার পুরস্কার। ৮ মার্চ ১৯৭১ সালে পরলোকগমন করেন এ গুণী অভিনেতা।

লেখাটি ভোরের কাগজে পূর্বপ্রকাশিত

লেখকের অনুমতি ছাড়া সাইটে ব্যবহৃত সকল প্রকার লেখা পুনঃপ্রকাশ বেআইনি। জরুরী যোগাযোগে ইমেইলঃ altamishnabil@gmail.com

আরো পড়ুন...