সেলুলয়েডে গণিতবিদদের জীবনী

চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির,

জ্ঞান যেথা মুক্ত, যেথা গৃহের প্রাচীর..

গণিত বা ম্যাথমেটিকস শব্দটি এসেছে গ্রীক ম্যাথেমা থেকে যার অর্থ জ্ঞান। পৃথিবীর বুকে মুক্ত এই জ্ঞান আহরন করেছেন জগৎসেরা গণিতবিদেরা যাদের বিভিন্ন তত্ত্ব-উপাত্ব-গবেষণা সহজ করেছে আমাদের আজকের এই জীবনকে। এই উপমহাদেশের অধিকাংশ শিক্ষার্থীর কাছে গণিত একটা ভয়ের নাম হলেও এর মমত্ব যারা যত বেশী বুঝেছে পৃথিবীর বুকে তারাই সবচেয়ে বেশী সফল জাতি। ভোরের কাগজ মেলার পাঠকদের জন্য আজ রইলো গণিতবিদদের জীবনী নিয়ে নির্মিত ৫ টি চলচ্চিত্র পর্যালোচনা।

এ ম্যান হু নিউ ইনফিনিটি (২০০১)

শ্রীনিবাস রামানুজন চরিত্রে দেব প্যাটেল

শ্রীনিবাস রামানুজন, একজন ক্ষনজন্মা কিন্তু প্রতিভাবান ও স্বার্থক মানুষের নাম। অদম্য ইচ্ছা আর অধ্যবসায় থাকলে কাউকেই যে আটকে রাখা যায়না তার বড় প্রমান তিনি। ১৮৮৭ খৃষ্টাব্দে জন্মেছিলেন ব্রিটিশ শাসিত ভারতের এক গরীব ব্রাক্ষণ পরিবারে। স্কুলজীবনে দারুন পারফর্মেন্সের সুবাদে সে বছরই সরকারী কলেজে বৃত্তিসহ পড়তে যান। তবে গণিত বিষয়ে তার এতটাই আগ্রহ ছিলো যে, সারাদিন গণিত নিয়ে মেতে থাকা রাজানুজন বাকী বিষয়ে ফেল করে বসেন তিনি। বন্ধ হয়ে যায় বৃত্তি। ১৯১৩ সালে রামানুজন তৎকালীন বিখ্যাত ব্রিটিশ গণিতবিদ জি. এইচ. হার্ডির ‘অর্ডারস অফ ইনফিনিটি’ বইটি দেখে তাকে একটি চিঠি লেখেন যেখানে তিনি তার কাজের কিছু নমুনাও সংযুক্ত করেন। রামানুজনের কাজ হার্ডির এতটাই পছন্দ হয়, হার্ডি তাকে ক্যামব্রিজে ডেকে নিয়ে যান। অধ্যাবসায়ের জোরে ভারতবর্ষে কলেজ ফেল লোকটি ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শেষমেশ বিজ্ঞান বিভাগে স্নাতক ডিগ্রি নিয়েই ছাড়েন। মাদ্রাজের অজপাড়াগায়ের ছেলেটি ১৯১৮ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের দার্শনিক সমিতির সদস্য পদে মনোনীত হন। কেবলমাত্র বত্রিশ বছর বয়সে পৃথিবী ছেড়ে যাওয়া এই গণিতজ্ঞেকে বলা হয় গণিতবিদদের গণিতবিদ। শুরুর জীবনে প্রথাগত শিক্ষায় বেশিদূর অগ্রসর না হলেও পুরোপুরি নিজের চেষ্টায় গণিতের বিভিন্ন শাখা, বিশেষত গাণিতিক বিশ্লেষণ, সংখ্যাতত্ত্ব, অসীম ধারা ও আবৃত্ত ভগ্নাংশ শাখায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন তিনি। মৃত্যুর পর তাঁর রেখে যাওয়া নোটবুক বা ডায়েরি হতে পরবর্তীতে আরও অনেক নতুন সমাধান পাওয়া গেছে।

রামানুজনকে নিয়ে নির্মিত হয়েছিলো ‘দ্য ম্যান হু নিউ ইনফিনিটি’ নামের একটি চলচ্চিত্র যেখানে প্রধান চরিত্রে দেখা গিয়েছে স্মামডগ মিলিয়নিয়ার খ্যাত দেব প্যাটেলকে। রবার্ট কানিগেল এর একই নামের বই থেকে ছবিটি নির্মিত হয়েছে। ম্যাথু ব্রাউনের পরিচালনায় ছবিটিতে আরও আছেন জেরেমি আয়রনস, টোবি জোন্স, স্টিফেন ফ্রাই প্রমুখ। সেলুলয়েডে অবশ্য রামানুজনকে নিয়ে এটিই নির্মিত একমাত্র চলচ্চিত্র নয়। ২০১৪ সালে ‘রামানুজন’ নামে এই গণিতজ্ঞের আরেকটি বায়োপিক নির্মিত হয়েছিলো যার ভাষা ছিলো তামিল।

বিউটিফুল মাইন্ড (২০০১)

জন ন্যাশ, মার্কিন গণিতবিদ যিনি গেইম থিওরির উপরে কাজ করার জন্য অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। বহুল আলোচিত হলিউড চলচ্চিত্র ‘আ বিউটিফুল মাইন্ড’ ন্যাশের জীবনকে কেন্দ্র করে নির্মিত। রহস্য, সিজোফ্রেনিয়া ও সুন্দর মনের এক সংগ্রামী মানুষকে ঘিরে নির্মিত এই সিনেমাটি অস্কারের সেবারের আসরের সেরা ছবি, সেরা পরিচালক, সেরা অ্যাাডাপ্টেড স্ক্রিনপ্লে ও সেরা পার্শ্ব অভিনেতার পুরস্কার জিতে নেয়। ছবিটির পরিচালক রন হাওয়ার্ড ছবিটি ছাড়াও ভিঞ্চি কোডের রবার্ট লুডলাম সিরিজের ছবিগুলো পরিচালনা করে সুখ্যাতি পেয়েছেন। ছবিটি ন্যাশের শুরুর জীবনের কিছু ঘটনার ওপর ভিত্তি করে নির্মিত হয়েছে। ছাত্র হিসেবে মেধাবী ন্যাশ একপর্যায়ে সিজোফ্রেনিয়ার রোগীতে পরিণত হয়। নিজেকে ঘিরে এক কল্পজগৎ তৈরি করেন তিনি, খুবই অদ্ভুতভাবে সরকারী গোপন সব সমস্যার সমাধান করতে থাকেন যার পুরোটাই ছিলো তার কল্পিত। অবশেষে তার স্ত্রী ও বন্ধুদের সহায়তায় তিনি ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠেন ও শেষ বয়সে নোবেল পদক লাভ করেন। ছবিটি দেখতে গিয়ে নতুন একটি দিক জানা হবে সবার। কেউ নোবেল জিতে গেলে তাকে সন্মান দেখানোর জন্য একটা রীতি রয়েছে। আর তা হলে নিজের প্রিয় কলমটি তাকে দিয়ে দেয়া। সিলভিয়া নাসার-এর পুলিৎজার মনোনয়ন প্রাপ্ত পাঠকপ্রিয় উপন্যাস আ বিউটিফুল মাইন্ড খ্যাত উপন্যাস অবলম্বনে তৈরি হয়েছে এ ছবিটি যার মূল চরিত্রে অভিনয় করেছে রাসেল ক্রো।

আগোরা (২০০৯)

হাইপেশিয়ার চরিত্রে রাচেল ভাইস

বিখ্যাত মিশরীয় নব্য প্লেটোবাদী দার্শনিক এবং মহিলাদের মধ্যে তিনিই প্রথম উল্লেখযোগ্য গণিতজ্ঞ। বলছিলাম হাইপেশিয়ার কথা। ঊনবিংশ শতাব্দীর সাহিত্যিকগন তাকে সৌন্দর্য্যে দেবী এথেনের সঙ্গে তুলনা করেছেন। হাইপেশিয়ার এই সৌন্দর্য্য তার দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের সাথে এক হয়ে তাকে অন্য এক পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলো। তাই তৎকালীন যুগে তিনি এতোটা বিখ্যাত হয়েছিলেন। হাইপেশিয়ার জীবনীর উপর নির্মিত ছবি ‘আগোরা’। ২০০৯ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত এ ছবিতে আগোরা চরিত্রে অভিনয় করেছেন দ্য মাম্মি খ্যাত রাচেল ভাইস। প্রধাগত ধর্ম বিশ্বাস থেকে হটে আসা হাইপেশিয়া তার  ছাত্রদের টলেমি, প্লেটো, অ্যারিস্টোটলদের গবেষণা পড়াতেন। শিক্ষকতা বাসে বাকী সময় আপন মনে গবেষণা করতেন সৌরজগৎ নিয়ে। পৃথিবীর ঘোরা কিংবা তাকে কেন্দ্র করে বাকীসব গ্রহ, নক্ষত্র ঘোরার বিতর্কে হাইপেশিয়া পৃথিবীর ঘোরার পাশাপাশি অনুমান করেছিলেন আবর্তনের উপবৃত্তাকার কক্ষপথের ব্যাপারটিও। বিতর্কিত মতবাদের জন্য পাথর ছুড়ে হত্যা করা হয় তাকে। বিজ্ঞান নিয়ে গবেষনা ও করুণ মৃত্যু তাকে বিজ্ঞানের ইতিহাসে অমরতব দান করেছে। ৪১৫ খৃষ্টাব্দে মৃত্যু হওয়া এই নারী গণিতজ্ঞের অনেকটা দিক নিয়ে আলোকপাত করা হয়েছে আগোরা ছবিটিতে।

দ্যা ইমিটেশন গেম (২০১৪)

অ্যালান টুরিং এর ভূমিকায় শার্লক খ্যাত বেনেডিক্ট কাম্বারব্যাচ

বিজ্ঞানের আবিস্কারে দিনশেষে যন্ত্র মানুষকে নিয়ন্ত্রন করছে কিনা সে প্রশ্ন বহুদিনের। কোন যন্ত্র কি ‘ইমিটেশন গেম’-এ অংশ নিতে পারবে! সে কি পারে মানুষকে অনুকরণ করে প্রশ্ন এবং উত্তর দিতে! যদি এর উত্তর হ্যা হয়, তবে যন্ত্রটির আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এ আই) আছে। আধুনিক কম্পিউটারের রূপকার গণিতবিদ অ্যালান টুরিং এর জীবনের সাথে ইমিটেশন গেম শব্দটি অনেক ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। টুরিং এবং তার এই কর্মকান্ড নিয়ে ২০১৪ সালে নির্মিত হয়েছে চলচ্চিত্র ‘দ্য ইমিটেশন গেম’ যেখানে টুরিং এর ভূমিকায় অভিনয় করেছেন শার্লক খ্যাত বেনেডিক্ট কাম্বারব্যাচ। ১৯৩৯ সালে টুরিং যখন ব্রিটিশ কোডব্রেকিং সংস্থার হয়ে কাজ করতেন ঠিক এমন সময় পোলিশ সরকার নিয়ে এলো জার্মান সিক্রেট এবং কমপ্লেক্স মিলিটারি কোড প্রেরণকারী মেশিন এনিগমার তথ্য নিয়ে। এনিগমা হলো একটি গোপনবার্তা প্রেরণকারী যন্ত্র, যার মাধ্যমে জার্মানরা দূর্বোধ্য কোডে সৈন্যদের কাছে আক্রমণের নির্দেশ পাঠাতো। কোডগুলো মিত্রবাহিনী পেলেও তা ভাঙ্গতে করতে পারতো না। এনিগমার এই কোড ভাঙ্গার জন্য টুরিং আরেক বিজ্ঞানীকে নিয়ে তৈরি করেন ‘বম্বে’ নামক যন্ত্র। এরপর ১৯৪৮ সালের দিকে তিনি মেশিনের আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এ আই) নিয়ে কাজ করা শুরু করেন যেটি পরীক্ষার জন্য তিনি বেছে নেন টুরিং টেষ্ট নামের একটি পরীক্ষা যার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে অনুলিপিকরন পরীক্ষা অর্থাৎ ‘ইমিটেশন গেম’। ছবিতে উল্লেখ রয়েছে এসব ঘটনার যার অন্যতম চরিত্রে অভিনয় করেছেন কেইরা নাইটলি।

হিডেন ফিগারস (২০১৬)

মার্কিন পরিচালক থিওডোর মেলফির ‘হিডেন ফিগারস’ ছবির গল্প ষাটের দশকের তিন কৃষ্ণাঙ্গ নারী গণিতবিদকে ঘিরে। সে সময়টায় যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত রাশিয়ার মাঝে চলছিলো মহাকাশ জয়ের এক দুরন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা যেখানে পুরোটাই ছিলো মেধা ও গণিতের খেলা। এমন সময় মার্কিনদের দলভারী করে নাসায় যোগ দেন তিন কৃষ্ণকায় নারী যাদের একসঙ্গে বলা হতো ‘মানব কম্পিউটার’। তাদের প্রধান হলেন প্রথম আফ্রিকান-আমেরিকান গণিতবিদ ক্যাথরিন জনসন। ক্যাথরিনের দুই সহকর্মী হচ্ছেন মেরি জ্যাকসন ও ডরোথি ভন। একটি জাতির গণিতজ্ঞান যে তাকে কোথায় নিয়ে যেতে পারে তার দূর্লভ প্রমান এই ঘটনাটি। গাণিতিক বিশ্লেষনে একের পর এক সমস্যার সমাধান করতে থাকেন এই থ্রি মাস্কেটিয়ার্স আর তাতেই এগিয়ে থাকা সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে তাল মেলাতে সক্ষম হয় যুক্তরাষ্ট্র। বর্ণবাদ ও নারী-পুরুষের বৈষম্যকে দূরে ঠেলে বাঁধা পেরোনো এই তিন নারীর সত্যি ঘটনা নিয়ে মার্গট লি শেটারলি লিখেছেন ‘হিডেন ফিগারস’ গ্রন্থটি যার অবলম্বনেই তৈরি হয়েছে চলচ্চিত্রটি। ছবিটিতে ক্যাথেরিন জি. জনসন চরিত্রে অভিনয় করেছেন টারাজি পি. হেনসন, দুই সহকর্মীর ভূমিকায় আছেন অক্টাভিয়া স্পেন্সার ও জানেল মোনেই।

আর্টিকেলটি দৈনিক ভোরের কাগজে পূর্বপ্রকাশিত

লেখকের অনুমতি ছাড়া সাইটে ব্যবহৃত সকল প্রকার লেখা পুনঃপ্রকাশ বেআইনি। জরুরী যোগাযোগে ইমেইলঃ altamishnabil@gmail.com

আরো পড়ুন...