“হাসিখুশী ভদ্রবেশী
আদ্যপান্ত ভেতো,
মধ্যবিত্ত শান্তচিত্ত
আলুপোস্ত তেতো।“
চেহারা আর পোষাকের আদল দেখে ভ্রম হতে পারে, ফেলুদা সিরিজের কোন নতুন জটায়ুকে দেখছিনাতো! মাথাভর্তি টাক, ইয়া বড় গোফ আর গালভর্তি হাসি নিয়ে ছোটখাট মাঝবয়সী কোন মানুষকে যে জটায়ু ভিন্ন ভাবা যায়, সেই ভাবনার দুয়ার খুলে দিলো ওয়েব সিরিজ ‘একেনবাবু’। শ্রী ভেঙ্কেটেশ ফিল্মস এর মালিকানাধীন কোলকাতাভিত্তিক সাবস্ক্রিপশন মোবাইল অ্যাপ ‘হইচই’ এর জন্য নির্মিত হয়েছে এই ওয়েব সিরিজ যার ইতিমধ্যেই প্রথম সিজনের দশটি পর্ব মুক্তি পেয়ে গিয়েছে। আর এরইসাথে বাংলার গোয়েন্দাভক্তরা নতুন এক গোয়েন্দার খোঁজ পেলো।
নাম তার একেন্দ্র সেন। সেখান থেকে একেন সেন, তথা একেনবাবু যিনি থাকেন কোলকাতায়। মুখে বলেন সরকারের কেরানী তিনি, ছ্যাচড়া কাজ তার। কিন্তু আদতে তিনি সরকারি গোয়েন্দা। সরকারের দেয়া কাজেই তার ব্যাঙ্গালোর আসা। প্রথম দর্শনে বোকাসোকা, একগুয়ে কিন্তু বিনয়ী একেন বাবু হোটেল থেকে বিতাড়িত হন হোটেলের দরজা খুলে গোছল করার দায়ে! এরপর গিয়ে ওঠেন তার এক বন্ধুর বন্ধু গবেষক-শিক্ষক বাপিবাবুর বাড়িতে। অনবরত স্যার-স্যার ডেকে আর খাওয়ার সময় পিয়াজ, কাঁচামরিচ, লেবুর বায়না ধরে খুব সহজেই বাপিবাবুর মনে জ্বালা ধরিয়ে দেন তিনি। গল্পে ঢুকে পড়ে আরেক চরিত্র, বাপিনবাবুর বন্ধু প্রমথ সমাদ্দার। প্রমথের ফ্লাটে এসে অনেকটা দুম করেই খুন হয়ে যান তার বাড়িতে আসা আরেক অতিথি। গল্পের রহস্য জমে ওঠে সেই খুনকে ঘিরে, জানা যায় খুনের পেছনে রয়েছে একটা দামি পাথর, একখানা মুনস্টোন। সেই দূর্লভ পাথরের চোরকে আর খুনিকে খুঁজতে লেগে পড়েন একেনবাবু। তবে বাকিদের থেকে অনেকটা গোয়েন্দা পরিচয় গোপন রেখেই।
সাধারণত গোয়েন্দাগল্প থেকে একেনবাবু অনেক দিক দিয়েই আলাদা। গোয়েন্দা সিরিজের ট্রেডিশনাল কনসেপ্টের মত এখানে একেন সেনের কোন সহকারী নেই, যেমনটা ফেলুদার তোপসে, ব্যোমকেশের অজিত কিংবা শার্লক হোমসের ওয়াটসন ছিলো। সাধারনত গোয়েন্দা চরিত্রদের সাথে নায়কোচিত যে ব্যাপারটা লক্ষ্য করা যায় সেটির উপস্থিতি একেবারেই একেনবাবুতে নেই। ভিন্নধর্মী এই গোয়েন্দার সাথে কেবল একজনেরই তুলনা চলে, আর সে হলো ব্রিটিশ লেখিকা আগাথা ক্রিস্টির চরিত্র এরকুল পোয়ারোর (Hercule Poirot)।
ম্যানহাটানে মুনস্টোন নামক যে উপন্যাস অবলম্বনে একেনবাবুর প্রথম সিজনের সৃষ্টি সেটি মূলত একই নামের একটি গোয়েন্দা সিরিজ যার লেখক ওপার বাংলার সুজন দাশগুপ্ত। লেখকের বর্ণনা অনুযায়ী একেন সেনের মাথায় উস্কোখুস্কো চুল, ক্যাংলা শরীর। গায়ে পরনে নোংরা শার্ট, দলামোচা করা কোট। ওদিকে হইচই এর একেন বাবুর বর্ননাতো লেখার শুরুতেই দেয়া হলো। গল্পের সাথে আলাদা করে একেনবাবুকে অনেকটা জটায়ুর লুক দেয়টা পুরাটাই পরিচালকের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে করা। এক লাইনে বললে সিরিজটির একেনবাবু যেন বুদ্ধিতে ফেলুদা কিন্তু দেখতে জটায়ু।
ওয়েব সিরিজটি পরিচালনা করেছে অনির্বাণ মল্লিক ও একেনবাবুর চরিত্রে দূর্দান্ত অভিনয় করেছেন যিনি তার নাম অনির্বাণ চক্রবর্তী। বাপি ও প্রমথ চরিত্রে অভিনয়ে ছিলেন যথাক্রমে সৌম্য ব্যানার্জী ও দেশপ্রিয় বাগচী। পর্দায় যেরুপে একেনবাবুর আবির্ভাব হলো এতে করে পরিচালক সন্দীপ রায় তার পরবর্তী ফেলুদার ছবিতে নির্দ্বিধায় জটায়ু চরিত্রে অনির্বাণ চক্রবর্তীকে ভেবে ফেলতে পারেন।
আর্টিকেলটি দৈনিক ভোরের কাগজে পূর্বপ্রকাশিত
লেখকের অনুমতি ছাড়া সাইটে ব্যবহৃত সকল প্রকার লেখা পুনঃপ্রকাশ বেআইনি। জরুরী যোগাযোগে ইমেইলঃ altamishnabil@gmail.com
