ভুবন মাঝি : জানা গেল মুক্তিযুদ্ধের নতুন এক দিক

জাতীয় সংগীত শুনলে কিংবা জাতীয় পতাকা দেখলে কোন বাংলাদেশী আছে যার অন্তরটা একবার হলেও নাড়া দিয়ে ওঠেনা। দেশপ্রেম বড় আবেগী জিনিস। এর গভীরতা সহজে বোঝা যায়না। পরিস্থিতি এসেই মানব মনে জানান দেয়, দেশপ্রেমের মহত্ব কি। গ্রাম থেকে সদ্য কুষ্টিয়া শহরে আসা থিয়েটারপাগল ‘নহিরের’ জীবনে ‘মুক্তিযুদ্ধ’ এসে দেশপ্রেমের তেমনটাই জানান দিয়েছিল। নয়তোবা সাধারন-সাদাসিদে নহির কেন দেশের জন্য নিজের হাতে অস্ত্র হাতে তুলে নেবে, কি দায় তার!

ভুবন মাঝি, চলতি  মার্চে মুক্তি পাওয়া ফাখরুল আরেফিন খান পরিচালিত পূর্নদৈর্ঘ্যটি একজন সাধারণ সংগ্রামী মানুষের বিদ্রোহী হয়ে ওঠার গল্প বলে। ছবিতে গল্পের তিনটা সময়কাল; ১৯৭০-৭১, ২০০৪ এবং ২০১৩ সাল। ৭০ এর নির্বাচনের কিছু আগে নহির কুষ্টিয়া শহরে আসে ডিগ্রি পড়তে আসে। দেশজুড়ে তখন নির্বাচন আর স্বাধীনতার আন্দোলন। তবে  তাতে নহিরের বিন্দুমাত্র গা নেই। বরং চাচাত বোনের বান্ধবী ফরিদা বেগমের সঙ্গে প্রনয় আর থিয়েটার ছিল তার ধ্যান-জ্ঞান।

Bhuban Majhi Still 2

চাচাত বোনের বান্ধবী ফরিদা বেগমের সঙ্গে প্রনয় আর থিয়েটার ছিল তার ধ্যান-জ্ঞান

সময় গড়িয়ে যায়, ধীরে ধীরে স্বাধীনতা সংগ্রাম ও বাংলাদেশের জন্মের বহু ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী হয়ে যায় নহির। মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায় আম্রকাননে ৭১-এর ১৭ এপ্রিল অস্থায়ী সরকারের মন্ত্রী পরিষদ শপথ অনুষ্ঠানে জাতীয় সংগীত গেয়ে শোনানোর সুযোগ মেলে নহিরের। এরপর সে কলকাতায় যায় আকাশবাণীতে গান গাইতে। সেখান থেকেই একসময় তিনি যুদ্ধে যাওয়ার প্রস্তুতি নেয়। ওদিকে সমান্তরালভাবে এগিয়ে চলে, ২০১৩ সালে কুষ্টিয়ায় আনন্দ পাগলা নামে এক বাউলের মৃত্যুর পর তার সৎকারের ধরন নিয়ে নানা কান্ড। কাহিনীসূত্রে জানা যায় এই আনন্দ পাগলই মুক্তিযোদ্ধা নহির। তবে নহির আর ফরিদার প্রেম কি কোন পরিনতি পেয়েছিলো, এই প্রশ্নের উত্তর মিলবে ভুবন মাঝিতে। ৩ মার্চ মুক্তিপ্রাপ্ত ছবিটি এখন চলছে সারাদেশে। সত্য ঘটনা থেকে অনুপ্রানিত এই ‘ভুবন মাঝি’র পরিচালক মারফত জানা যায় ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্র নহিরের আসল নাম ‘মতিউর রহমান’। তবে তার ব্যাপারে বিস্তারিত তেমন কিছু জানা যায়নি।

ভুবন মাঝি চলচ্চিত্রটি বাংলাদেশ সরকার এর অনুদান লাভ করার পর ২০১৬ সালের ১৯ জানুয়ারি ছবিটির মহরত হয়। গত বছরের ৪ ফেব্রুয়ারি থেকে ছবিটির শুটিং শুরু হয়। নির্মাতা ফাখরুল আরেফিন খান তার ছবিতে শিল্পী নির্বাচনে মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন। নহিরের চরিত্রের ছবিতে রেখেছেন আমার পছন্দের তালিকায় উপরের দিকে রাখা ওপার বাংলার শক্তিমান অভিনেতা পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়কে। এছাড়াও ফরিদা চরিত্রে অপর্ণা ঘোষ, মাজনুন মিজান, কাজী নওশাবা আহমেদ, মামুনুর রশীদ, শুভাশিষ ভৌমিক, ওয়াকিল আহাদ, আরিফ হক সহ ছবির প্রত্যেক অভিনয়শিল্পীর অভিনয় ছিলো যথাযত।

ছবির আরো দুইটি শক্তিশালী দিক ছিলো চিত্রগ্রহন ও সংগীত।

kalikaprasad bhattacharya

ছবি মুক্তি পর ৭ মার্চ এক সড়ক দুর্ঘটনায় কালিকাপ্রসাদ ভট্টাচার্য মারা গেলে ছবিটি তাকে উৎসর্গ করা হয়।

চিত্রগ্রাহক রানা দাশগুপ্ত তার ক্যামেরায় গড়াই ব্রিজ, গড়াই নদী সহ আদি কুষ্টিয়াকে এক নতুন রূপে দেখিয়েছেন। ছবির দৃশ্যধারন করা হয়েছে কুষ্টিয়ায় ও কোলকাতায়। ভুবন মাঝি চলচ্চিত্রের সুর ও সঙ্গীত পরিচালনা করেছেন কালিকাপ্রসাদ ভট্টাচার্য। এই চলচ্চিত্র দিয়ে তাঁর সঙ্গীত পরিচালনায় অভিষেক হয়। ছবি মুক্তি পর ৭ মার্চ এক সড়ক দুর্ঘটনায় তিনি মারা গেলে ছবিটি তাকে উৎসর্গ করা হয়। ছবিটিতে ছয়টি গান রয়েছে, যার গীত রচনা করেছেন কালিকাপ্রসাদ ভট্টাচার্য ও আকাশ চক্রবর্তী। এছাড়া দ্বিজেন্দ্রনাথ রায় এর “ধনধান্যে পুস্পভরা” গানটিও এই ছবিতে ব্যবহৃত হয়েছে। গানে কণ্ঠ দিয়েছেন সপ্তর্ষি, পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়, শিমুল ইউসুফ, বাপ্পা মজুমদার, পার্থ বড়ুয়া, বুশরা শাহরিয়ার, কোনাল, সালমা, ও সাব্বির। “আমি তোমারই নাম গাই” শিরোনামের গানটি আমার ব্যক্তিগত পছন্দের তালিকায় ঢুকে গেছে।

জীবন থেকে নেয়া-ওরা ১১ জন থেকে শুরু করে গেরিলা-জীবনঢুলী-মেঘমল্লার-আমার বন্ধু রাশেদ; মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এযাবৎকালে অনেক অনেক ছবি দর্শকদের উপহার দিয়েছেন নির্মাতারা। এ দেশের সুস্থ ধারার চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে একটি বড় অংশ জুড়ে আছে এই মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক চলচ্চিত্রগুলো। মুক্তিযুদ্ধের পুরো ইতিহাস একটা ছবিতে তুলে ধরা সম্ভব নয়। একেক ছবিতে যুদ্ধের একেক দিক নিয়ে আলোচনা করা হয়।  নির্মাতা ফাখরুল আরেফিন খান এবারে মুক্তিযুদ্ধের অন্য এক দিক দৃষ্টিগোচর করেছেন তার ভুবন মাঝি দিয়ে। ছবিটি দিয়ে আমরা জানতে পেরেছি মুক্তিযুদ্ধের নতুন এক অধ্যায়ের। ছবিতে দেখেছি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়া বাউল সাধকেরা এযুগে হেয় প্রতিপন্ন হচ্ছে। তাদের দাফনের ঠিক ঠিকানা নেই, কেটে দেয়া হচ্ছে তাদের চুল দাড়ি। ওদিকে একাত্তরের খাস রাজাকারগুলোও এখন বহাল তবিয়তে বেঁচে আছে। ইতিহাসের এ-অধ্যায় নতুন এক ভাবনার জন্ম দেয়। দেশকে শত্রুমুক্ত করার তাগিয়ে যারা অস্ত্র ধরেছিলেন তাদের ঋন কি এভাবে শোধ করছি আমরা!

লেখকের অনুমতি ছাড়া সাইটে ব্যবহৃত সকল প্রকার লেখা পুনঃপ্রকাশ বেআইনি। জরুরী যোগাযোগে ইমেইলঃ altamishnabil@gmail.com

আরো পড়ুন...