১৯৫৪ সালের ৬ আগষ্ট শাহবাগ হোটেলে অনুষ্ঠিত হয় মুখ ও মুখোশ ছবির মহরত, আর ১৯৫৬ সালের ৩ আগষ্ট মুক্তি পায় ইতিহাস সৃষ্টিকারী এ ছবিটি। আজকের পর্বে পাঠকদের জন্য রইলো বাংলাদেশের ইতিহাস সৃষ্টিকারী প্রথম চলচ্চিত্র নিয়ে লেখাটি।
তখন এমন একটি সময় যখন বৃটিশরা এ অঞ্চল ছেড়েছে, চলছে পাকিস্থান শাসন। সে সময়টাতে পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমান বাংলাদেশ) তখনো নিজস্ব কোন চলচ্চিত্র শিল্প আকারে গড়ে উঠেনি। ঢাকাসহ প্রধান শহরগুলোর সিনেমা হলগুলোতে কলকাতা কিংবা লাহোরের চলচ্চিত্র দেখানো হতো। সে সময়ে পশ্চিম পাকিস্তানের চলচ্চিত্র প্রযোজক, গুলিস্তান সিনেমার মালিক অবাঙ্গালী এফ. দোসানীর পূর্ব পাকিস্তানে চলচ্চিত্র প্রযোজনার ব্যাপারে নেতিবাচক মন্তব্য করেন। অন্যান্য বাঙ্গালীদের মত সে সময়ে ফুঁসে ওঠেন নাট্যজন আব্দুল জব্বার খান। সৃষ্টি হয় একটি ইতিহাসের, নির্মিত হয় মুখ ও মুখোশ নামের বাংলাদেশের প্রথম চলচ্চিত্রের।
বাংলা ১৩২২ সালের ৭ই বৈশাখ (১৯১৬ ইং) তারিখে মুন্সিগঞ্জের লৌহজং উপজেলার উত্তর মসদ গাঁও নামক স্থানে জন্মগ্রহণ করেন আব্দুল জব্বার খান। তার পিতা হাজী মোহাম্মদ জমশের খান পাটের ব্যবসা করতেন। শৈশবে স্কুলজীবন থেকেই তিনি জড়িয়ে পড়েন নাটকের সঙ্গে। অভিনয় করেন বেহুলা, সোহরাব রোস্তম এর মত নাটকে। ভারতের বিখ্যাত অভিনেতা, চলচ্চিত্র পরিচালক প্রমথেশ বড়ুয়ার সঙ্গে সখ্যতার দরুন চলচ্চিত্রের প্রতি ঝোক সৃষ্টি হয় তার। ১৯৪১ সালে আহসানুল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুল থেকে ডিপ্লোমা করে যোগ দেন চাকরিতে। ১৯৪৯ সালে পাকাপোক্তভাবে ঢাকায় চলে আসেন তিনি, এখানে সংগঠিত করেন কমলাপুর ড্রামাটিক এসোসিয়েশন। এ সংগঠনের উদ্যোগেই তিনি টিপু সুলতান ও আলীবর্দী খান’র মত নাটক মঞ্চায়ন করেন। এরপর রচনা করেন ঈসাখাঁ (১৯৫০), প্রতিজ্ঞা (১৯৫১), ডাকাত (১৯৫৩), জগোদেশ (১৯৫৯)।
অনেকটা চ্যালেঞ্জ হিসেবে ছবিটি নির্মানের উদ্যোগ নিলেও আব্দুল জব্বার খানের ছিলোনা তেমন পূর্ব অভিজ্ঞতা। মুখ ও মুখোশ চলচ্চিত্রটি নির্মানের জন্য প্রাথমিক গল্প হিসেবে আবদুল জব্বার খান ডাকাত নাটকের পান্ডুলিপি এবং সঙ্গে কবি জসীম উদ্দীন, কাজী নজরুল ইসলামের কিছু বই নিয়ে কলকাতায় যান। তার সফরসঙ্গী ছিলেন কিউ এম জামান যিনি কলকাতা ও মুম্বাইয়ে সহকারী পরিচালকের কাজ করেছেন। জামানের সহযোগিতায় পরিচয় হয় কলকাতার চিত্রনাট্যকার মনি বোসের সঙ্গে যিনি গল্প বাছা এবং প্রাথমিক চিত্রনাট্যের কাজটি করে দেন। ঠিক হয় আব্দুল জব্বারের লেখা ডাকাত নাটকের গল্প থেকেই নির্মিত হবে ছবি। কলকাতায় তিনি আরও দেখা করলেন কিউ এম জামানের বস চিত্রগ্রাহক মুরারী মোহনের সঙ্গে যার পরামর্শক্রমে কেনা হলো পুরোনো একটি ক্যামেরা।
ছবির চিত্রগ্রহণের কাজ শেষমেশ করেন আব্দুল জব্বারের কলকাতা সফরসঙ্গী এই এই কিউ এম জামান’ই। ছবির মেকআপম্যান হিসেবে আসেন কলকাতা থেকে শ্যাম বাবু। সমর দাসের সংগীত পরিচালনায় ছবির গানে কন্ঠ দেন আবদুল আলীম ও মাহবুবা হাসনাত। শব্দগ্রহণ করেন মইনুল ইসলাম। এর পোস্টার ডিজাইন করেন সুভাষ দত্ত। ছবির প্রধান চরিত্রে নায়ক হিসেবে হাজির হলেন অভিনেতা ইনাম আহমেদ। দ্বিতীয় প্রধান পুরুষ চরিত্রে অভিনয় করেন স্বয়ংআবদুল জব্বার খান।

ছবির নায়িকা হলেন চট্টগ্রামের মেয়ে পূর্ণিমা সেন। অন্যান্য চরিত্রে ছিলেন নাজমা (পিয়ারী), জহরত আরা, আলী মনসুর, রফিক, নুরুল আনাম খান, সাইফুদ্দীন, বিলকিস বারী প্রমুখ। শ্যুটিংয়ের মূল স্থানগুলো ছিল সিদ্ধেশ্বরী, তেজগাঁও, রাজারবাগ, কমলাপুর, লালমাটিয়া, জিঞ্জিরা এবং টঙ্গীর নানা জায়গা। বাংলা ভাষায় নির্মিত প্রথম এ সিনেমার দৈর্ঘ্য ছিলো ৯৯ মিনিট। ১৯৫৪ সালের ৬ আগষ্ট শাহবাগ হোটেলে অনুষ্ঠিত হয় মুখ ও মুখোশ ছবির মহরত। উক্ত অনুষ্ঠানটি উদ্বোধন করেন তৎকালীন গভর্ণর জেনারেল ইসকান্দার মীর্জা।

আসলে ছবির আনুষ্ঠানিক এ মহরত অনুষ্ঠিত হওয়ার প্রায় আট মাস আগেই শুরু হয়েছিলো ছবির শ্যুটিং, কোন প্রকার মহরত ছাড়াই। ছবির দৃশ্যধারন এরপর চলে ১৯৫৫ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত। অসামাজিক কর্মকাণ্ড, পারিবারিক কলহ ও দুর্নীতির মতো বিষয়বন্তু নিয়ে নির্মিত হয় মুখ ও মুখোশ।

স্থানীয় অভিনেতারা সিনেমায় অভিনয়ের পূর্ব অভিজ্ঞতা ছাড়াই অভিনয় করেন এতে, অবশ্য সেটা বিনা পারিশ্রমিকেই। ঢাকায় স্থানীয়ভাবে কোন ফিল্ম স্টুডিও না থাকার দরুন, ছবির নেগেটিভ ডেভেলপের জন্য একে পাঠানো হয় লাহোরে। লাহোরের শাহনূর স্টুডিওতে এ ছবির পরিস্ফূটন কাজ সম্পন্ন হয়। সিনেমাটির সম্পাদনা করেন পশ্চিম পাকিস্তানে আব্দুল লতিফ। মুখ ও মুখোশ এর প্রথম প্রদর্শনী হয় লাহোরে। ঢাকায় ফিরে আসার পর ছবিটি প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শনীর বিষয়ে কোন হল মালিক আগ্রহ দেখাচ্ছিলোনা। ছবি মুক্তির আগেই লোকমুখে চাউর হয় এটা নাকি কোনো ছবিই হয়নি! দর্শক হলে গিয়ে ছবি দেখে অসন্তুষ্টিতে হলের চেয়ারও ভেঙে ফেলতে পারে। তবে এমন অবস্থায় আব্দুল জব্বার খানের পাশে দাড়ান মুকুল (এখন আজাদ) ও রূপমহল সিনেমা হলের মালিক কমল বাবু। তিনি রাজি হন ছবিটি মুক্তি দিতে। ১৯৫৬ সালের ৩ আগষ্ট মুক্তির তারিখ হয়। ছবি উদ্বোধন করলেন তখনকার গভর্নর শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক। ছবি শেষে নিন্দার বদলে বাহবাই পান আব্দুল জব্বার। জিত হয় বাঙ্গালী জাতির।
লেখাটি দৈনিক ভোরের কাগজে পূর্বপ্রকাশিত
লেখকের অনুমতি ছাড়া সাইটে ব্যবহৃত সকল প্রকার লেখা পুনঃপ্রকাশ বেআইনি। জরুরী যোগাযোগে ইমেইলঃ altamishnabil@gmail.com
