একটি কমিউনিস্ট আন্দোলনের নাম নকশাল আন্দোলন যা বিংশ শতাব্দীর সপ্তম দশকে ভারতবর্ষের পশ্চিমবঙ্গের নকশালবাড়ি থেকে আরম্ভ হয়ে ধীরে ধীরে ছত্তিশগড় (তৎকালীন মধ্যপ্রদেশ) এবং অন্ধ্রপ্রদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। নকশাল বিদ্রোহের সূচনা হয়েছিল ১৯৬৭ সালের ২৫ মে যখন নকশালবাড়ি গ্রামের কৃষকদের ওপর স্থানীয় ভূস্বামীরা ভাড়াটে গুন্ডার সাহায্যে অত্যাচার করছিল। ঠিক তখনই কৃষকরা ঘুরে দাঁড়ায় আর ঐ ভূস্বামীদের অত্র অঞ্চল থেকে উৎখাত করে। এই নকশাল আন্দোলনের মূল প্রবক্তা ছিলেন চারু মজুমদার যিনি চীনের কমিউনিস্ট পার্টির নেতা মাও সে তুং এর অনুসারী ছিলেন। চারু মনে করতেন ভারতের কৃষক এবং গরিব মানুষের শ্রেণীশত্রুদেরকে চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম করা প্রয়োজন। তাই তিনি নকশাল আন্দোলনকে সারাদেশে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন তার লেখনীর মাধ্যমে। এই নকশাল আন্দোলন কলকাতার ছাত্র সংগঠনগুলোর ব্যাপক সমর্থন পেয়েছিল এবং সেসময়কার মেধাবী ছাত্রদের একটি বড় অংশ পড়ালেখা ছেড়ে দিয়ে বিপ্লবী কর্মকান্ডে অংশ নিয়েছিল। যদিও ১৯৭০ সালের দিকে এ আন্দোলন অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কারণে কয়েকটি বিরোধী অংশে বিভক্ত হয়ে পড়ে। নকশাল আন্দোলনের বাংলা সাহিত্য চলচ্চিত্রে নানাবিধ প্রভাব রয়েছে। তেমনই এক প্রচ্ছন্ন প্রভাব আমরা দেখতে পাই সত্যজিৎ রায়ের কলকাতা ত্রয়ী’তে। তার পরিচালিত প্রতিদ্বন্দ্বী (১৯৭০), সীমাবদ্ধ (১৯৭১) ও জন-অরণ্য (১৯৭৫) এই তিনটি ছবিকে একত্রে বলা হয় কলকাতা ট্রিলজি বা ত্রয়ী। কলকাতা ত্রয়ীর সমস্ত চলচ্চিত্রগুলোর পেছনে ছিল শহর কলকাতা। ছবিগুলোর মাধ্যমে দর্শকরা জেনেছে কোলকাতা শহরের নানা রূপ।
গত ২৩ শে এপ্রিল ছিলো কিংবদন্তী চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়ের প্রয়াণ দিবস। এ উপলক্ষে আমার ব্লগের পাঠকদের জন্য রইলো এই লেখাটি।
প্রতিদ্বন্দ্বী (১৯৭০)

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় রচিত উপন্যাস অবলম্বনে সত্যজিৎ রায় নির্মাণ করেন চলচ্চিত্র প্রতিদ্বন্দ্বী। চলচ্চিত্রটির মুখ্য চরিত্র সিদ্ধার্থের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন ধৃতিমান চট্টোপ্যাধায়। কলকাতা ত্রয়ীর মধ্যে কেবলমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বীতেই নকশাল আন্দোলনের পরবর্তী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের প্রভাব রয়েছে সবচেয়ে বেশি। ছবির শুরুতে নেগেটিভ ফিল্টার ভিডিও টোনে আমরা দেখতে পাই সিদ্ধার্থের বাবাকে হারানোর দৃশ্য। এরপরই দেখা যায় সংসার চালানোর জন্য তার চাকরি পাওয়ার প্রাণান্তকর দৌড়ঝাঁপ।
কোন এক চাকরির সাক্ষাৎকারে সিদ্ধার্থকে জিজ্ঞাসা করা হয়, এই শতাব্দীর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা কী? সবাইকে অবাক করে দিয়ে তিনি বলেন ভিয়েতনামের যুদ্ধ যেখানে তারা শুনতে চেয়েছিল চাকরিপ্রার্থী মানুষের প্রথম চাঁদে যাওয়ার ঘটনাটিকেই আলোকপাত করবেন। সিদ্ধার্থের মতো বিজ্ঞানের উন্নতির ফলে মানুষ তো একদিন না একদিন চাঁদে যেত, তবে ভিয়েতনামের সাধারণ মানুষ যুক্তরাষ্ট্রের সাম্রাজ্যবাদী পরাশক্তিকে শুধু মনোবল দিয়েই হটিয়ে দিলো তা অবাক করার মতোই ঘটনা। তিনি বিপ্লবী কিনা সে সন্দেহ প্রকাশ হওয়ায় চাকরিটি শেষ পর্যন্ত সিদ্ধার্থের হয়নি। তার এই দৃষ্টিভঙ্গি নকশাল আন্দোলনের প্রতি দুর্বলতাকে ইঙ্গিত করলেও আত্মকেন্দ্রিক সিদ্ধার্থের কাছে, আন্দোলনের কাছে চাকরি নিয়ে দুমুঠো খেয়েপরে বেঁচে থাকাটাই আসল। কিন্তু অন্য আরেকটি ইন্টারভিউতে একদল চাকরিপ্রার্থীকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড় করিয়ে রেখে ইন্টারভিউ বন্ধ করে চাকরীর কর্তাদের মধ্যাহ্নভোজ করার বিষয়টিতে সিদ্ধার্থের চাকরীদাতাদের মারতে উদ্যত হওয়ার দৃশ্য তাকে আবারো বিপ্লবী হিসেবেই প্রকাশ করায়। শেষদিকে ক্রমাগত প্রত্যাখ্যাত, অপমানিত হয়ে হাল ছেড়ে দিয়ে কলকাতা ছাড়ে সে। মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভ এর একটা ছোট চাকরি নিয়ে কলকাতার বাইরে চলে যেতে দেখা যায় তাকে। শহরের কোলাহল থেকে বেরিয়ে মফস্বলের পাখির ডাক শুনতে শুনতে ছবি শেষ হয়।
শোনা যায় রাজনীতি বিষয়টাকে অপছন্দের চোখে দেখতেন সত্যজিৎ রায়। এই নকশাল আন্দোলনকে আরো বেশি অপছন্দ করতেন। তাই এটাকে তিনি অভিহিত করেছেন বামপন্থীদের ভেতরকার দ্বন্দ্ব হিসেবে।
সীমাবদ্ধ (১৯৭১)

সীমাবদ্ধ ছবির প্রধান চরিত্র শ্যামলেন্দু চ্যাটার্জি যে কিনা তরুণ বয়সে যোগ্যতা আর ভাগ্যের বলে একটি বহুজাতিক কোম্পানির ডিরেক্টর পদে অভিষিক্ত হন। চরিত্রগত দিক দিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী সিদ্ধার্থের থেকে পুরোপুরিই আলাদা সীমাবদ্ধের শ্যামলেন্দু। কলকাতা শহরের বেকারদের ভিড়ে হারিয়ে যাওয়া এক নাম সিদ্ধার্থ, অপরদিকে তারই সমসাময়িক শ্যামলেন্দু চ্যাটার্জি একটি সফলতার গল্প। তবে সিদ্ধার্থ নিজের নীতিবোধের সাথে আপস না করতে পারলেও, সীমাবদ্ধের শ্যামলেন্দু চাকরিতে উন্নতির লোভে হীন কাজ করতেও দ্বিধাবোধ করে না।
মধ্যবিত্ত থেকে ক্রমশ উচ্চবিত্ত হওয়ার দিকে এগুনো শ্যামলেন্দুর মতো সামাজিক স্ট্যাটাস প্রাপ্তির লোভ তার স্ত্রী দোলনচাঁপারও রয়েছে। তাইতো তাদের একমাত্র পুত্র রাজাকে ছোট বয়সে পাঠিয়ে দেয় বোর্ডিংয়ে। এমনকি শ্যামলেন্দুর বয়স্ক মা-বাবারও ঠাঁই হয়না তাদের আধুনিক বড় বাড়িতে। মণিশংকর মুখোপাধ্যায়ের উপন্যাস সীমাবদ্ধ অবলম্বনে একই নামে এই চলচ্চিত্রটি নির্মিত। এটি সত্যজিৎ রায় নির্মিত কলকাতা ত্রয়ী সিরিজের ২য় চলচ্চিত্র।
ছবির কাহিনিতে দেখা যায় শ্যামল ব্রিটিশ সিলিং ফ্যান ম্যানুফেকচারিং কোম্পানি পিটারস ফ্যানে চাকরি করেন। দোলন নামের এক নারীকে বিয়ে করে নিজ কোম্পানির ফ্ল্যাটেই থাকে তারা। তাদের বাড়িতে পাটনা থেকে দোলনের ছোট বোন টুটুল আসেন বেড়ানোর উদ্দেশ্যে। দামি সব রেস্টুরেন্ট, বিউটি পার্লার, ক্লাব, রেসকোর্সের আনাগোনার জীবন থেকে নিজের দিদিকে কতকটা হিংসেই হয় টুটুলের। একসময় শ্যামলের ফ্যানের একটা অর্ডার লটের ম্যানুফ্যাকচারিং-এ বড় রকমের খুঁত বের হয়। হাতে ডেলিভারির সময় না থাকায় অর্ডার বাতিল হওয়া ঠেকাতে এক হীন পন্থা বেছে নেয় শ্যামল। শর্তানুয়ায়ী ফ্যাক্টরিতে গোলমাল লাগলে ডেলিভারির তারিখ পেছাবে বিধায় লোক লাগিয়ে নিজের ফ্যাক্টরিতেই গোলমাল বাধিয়ে দেয় সে। সঙ্কট মোকাবিলায় দক্ষতা দেখে কোম্পানির মালিকরা তাকে সেলস ম্যানেজার থেকে ডিরেক্টর পদে পদোন্নতি করায়। কিন্তু টুটুল এই গোলমেলে বিষয়টি আঁচ করতে পারলে পদোন্নতি পাওয়া সত্ত্বেও নৈতিকভাবে হেরে যায় শ্যামল। ছবিটিতে মুখ্য চরিত্র শ্যামলের ভ‚মিকায় অভিনয় করেছেন বরুণ চন্দ ও টুটুল চরিত্রে শর্মিলা ঠাকুর। ছবিটির নাম দিয়ে সত্যজিৎ লিমিটেড (সীমাবদ্ধ) কোম্পানিকে নয়, বরং একজন ব্যক্তির কলকাতার শহুরে সমাজের উঁচু স্তরে যেতে উন্নতি মানসিকতার সীমাবদ্ধতা বা অভাবের গল্প বলেছেন।
জন-অরণ্য (১৯৭৫)

জন-অরণ্য ছবিটি শুরু হয় একটি পরীক্ষাকেন্দ্রের দৃশ্যের মাধ্যমে যেখানে চলছে নকলের মহোৎসব! শিক্ষকরা মুখ বেজার করে ভীত ভঙ্গিতে পরীক্ষা নিয়ে যাচ্ছে। সত্যজিৎ রায় এই দৃশ্যটি দিয়ে তৎকালীন ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির অনুসারী ছাত্রদের দৌরাত্ম্যকে সূক্ষভাবে ইঙ্গিত করেছেন। সীমাবদ্ধের মতো জন-অরণ্যের কাহিনিও নেয়া হয়েছে মণিশংকর মুখোপাধ্যায়ের আরেকটি উপন্যাস অবলম্বনে।
জন-অরণ্য চলচ্চিত্রের প্রধান চরিত্র সোমনাথ। গণনকলের বাজারে ভালো পরীক্ষা দিয়েও তার ভাগ্যে জোটে গড়পড়তা এক পাস মার্কস। শুরু হয় সোমনাথের হতাশা। ওদিকে প্রেমিকার বিয়ে হয়ে গেলে সেই হতাশার মাত্রা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। চাকরিপ্রার্থী হিসেবে ইন্টারভিউ বোর্ডে ‘চাঁদের ওজন কত’ এমন প্রশ্নের সম্মুখীন হয়ে শেষমেশ বুঝতে পারে তাকে দিয়ে আর চাকরি হবে না। পূর্ব পরিচিত হিরালালবাবু তাকে অনুপ্রেরণা দেয় চাকরি ছেড়ে ব্যবসার পথ বেছে নিতে। ক্যাপিটাল ছাড়া অর্ডার-সাপ্লাইয়ের ব্যবসা অর্থাৎ দালালি যাকে ইংরেজিতে বলে মিডলম্যান এর কাজে নেমে যায় সে। চলচ্চিত্রের ইংরেজি টাইটেলও তাই দ্য মিডলম্যান। জন-অরণ্যে সোমনাথের অর্ডার-সাপ্লাই বোঝার দৃশ্যগুলো ব্যবসায় শিক্ষার শিক্ষার্থীদের জন্য সত্যিকার অর্থে অনেক তথ্যবহুল।
সোমনাথের প্রথম অর্ডার-সাপ্লাই ব্যবসা শুরু হয় কোন এক অফিসে স্টেশনারি সাপ্লাইয়ের মাধ্যমে। মেধাবী হওয়ায় ব্যবসাটা অল্পদিনে ভালোই রপ্ত করে ফেলে। হাতে আসে গার্মেন্টসের বড় একটা অর্ডার পাওয়ার সুযোগ যেটি পেতে তাকে আশ্রয় নিয়ে হয় উৎকোচের। নিয়তির করুণ পরিণতিতে সেই গার্মেন্টসের বড়কর্তার হাতে সে এক রাতের জন্য তুলে দেয় তারই ঘনিষ্ঠ বন্ধুর বোনকে। সীমাবদ্ধের মতো জন-অরণ্যের প্রধান চরিত্র ছবির শেষে চূড়ান্ত সফলতা পায়। কিন্তু বিকিয়ে দিয়ে আসে নিজের নৈতিকতাকে। ছবির প্রধান চরিত্র সোমনাথ রূপে অভিনয় করেন প্রদীপ মুখোপ্যাধায় আর যার হাত ধরে তার এই দালালি ব্যবসা সেই বিশুদা চরিত্রে অভিনয় করেন উৎপল দত্ত। ছবিতে পরিচালক কলকাতা শহরকেই বর্ণনা করেছেন অরণ্য হিসেবে।
সত্যজিৎ রায়ের মতো নির্মাতা মৃণাল সেনও বানিয়েছিলেন আরেক কলকাতা ট্রিলজি। ইন্টারভিউ আর কলকাতা ৭১ চলচ্চিত্র দুটি মুক্তি পায় ১৯৭১ সালে এবং পদাতিক মুক্তি পায় ১৯৭৩ সালে।
লেখাটি ভোরের কাগজে পূর্বপ্রকাশিত
লেখকের অনুমতি ছাড়া সাইটে ব্যবহৃত সকল প্রকার লেখা পুনঃপ্রকাশ বেআইনি। জরুরী যোগাযোগে ইমেইলঃ altamishnabil@gmail.com
