বৃটিশরা এই উপমহাদেশে তথাপি ভারতবর্ষে এসেছিলো ব্যবসার উদ্দেশ্যে। ব্যবসার ছলে সময়ের সাথে সাথে তারা এ অঞ্চলের ক্ষমতা কুক্ষিগত করে নেয়। ১৭৫৭ সালে আম্রকাননে পলাশীর যুদ্ধে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলা ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে পরাজিত হলে কার্যত এই শাসনের সূচনা ঘটে। বাংলা অধিকারের পর ক্রমান্বয়ে ব্রিটিশরা পুরো ভারতবর্ষ দখল করে নেয়। ভারতবর্ষে বৃটিশ রাজ নিয়ে বহু ভাষায় সাহিত্য, চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। ব্যতিক্রম ছিলেননা সত্যজিৎ রায়ও। রবীঠাকুরের উপন্যাস থেকে নির্মিত ‘ঘরে বাইরে’ চলচ্চিত্রে তিনি তিনটি মানুষের জীবনে টানাপোড়ন – রাজনীতি ও ব্যাক্তিগত জীবনের দ্বন্দ্ব দেখিয়েছেন। অপরদিকে মুন্সী প্রেমচাঁদের ছোট গল্প অনুসারে উর্দু ভাষায় নির্মিত ছবি ‘শতরঞ্জ কি খিলাড়ি’তে তিনি দেখিয়েছেন আওয়াধ রাজ্যের শাসক ওয়াজিদ আলি শাহের চূড়ান্ত পরিনতির গল্প।
ঘরে বাইরে (১৯৮৪)
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯১৬ সালে প্রথম চলিত ভাষায় কোন বই লেখেন। স্বদেশী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে লেখা উপন্যাসটির নাম ‘ঘরে বাইরে’। উপন্যাসের প্রধান তিন চরিত্র বিমলা, নিখিলেশ চৌধুরী ও সন্দীপ মুখুজ্যে । উপন্যাসটির নামের সাথে হুবহু মিল রেখে সত্যজিৎ রায় ১৯৮৪ সালে নির্মান করেন চলচ্চিত্র ‘ঘরে বাইরে’ যেটির চিত্রনাট্য তিনি লিখে রেখেছিলেন তাঁর প্রথম ছবি পথের পাঁচালী নির্মাণেরও আগে। কিন্তু নির্মান কিংবা মুক্তির দিক দিয়ে এটি সত্যজিতের ক্যারিয়ারের শেষ দিককার ছবি। এই ছবিতে অভিনয় করেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, ভিক্টর বন্দ্যোপাধ্যায়, জেনিফার কাপুর ও স্বাতীলেখা সেনগুপ্ত। ছবিতে নারীমুক্তির বিষয়কে অন্য আঙ্গিকে দেখানো হয়েছে, সাথে দেখানো হয়েছে স্বদেশী আন্দোলনের নেতিবাচক কিছু দিক। প্রধান তিন চরিত্র বিমলা, সন্দীপ মুখুজ্যে আর নিখিলেশ চৌধুরী যেন কেবলমাত্র তিনটা চরিত্রই নয়, সময়ের বাংলার তিন ভিন্ন চিন্তাধারার মানুষের চিন্তা ও রাজনৈতিক মতাদর্শের পার্থক্য দিয়ে যেন সেই সময়ের বাংলাই প্রকাশ পেয়েছে।

ঘরের প্রতীক বিমলা (স্বাতীলেখা) ও বাইরের প্রতীক সন্দীপকে (সৌমিত্র) কেন্দ্র করেই ছবির গল্প এগিয়েছে। উদার ও আধুনিকমনস্ক জমিদার নিখিলেশের (ভিক্টর) শখ তার স্ত্রীকে আধুনিক নারী রুপে গড়ে তোলার। তাকে ইংরেজী শেখানো, পশ্চিমা সঙ্গীত-সাহিত্য চর্চা করানোর সাথে সাথে ক্রমে নিখিলেশ তার বউকে নিজের মনমত গড়ে তুলতে সক্ষম হয়। নিয়মের শেকল ভেঙ্গে তাকে অন্দরমহল থেকে বাইরে নিয়ে আসে। স্বদেশী আন্দোলনের নেতা সন্দীপ জমিদার নিখিলেশের আতিথ্য নিয়ে তার বাড়িতে থেকে সেই গ্রামে চালাতে থাকে স্বদেশি কর্মকাণ্ড। গল্পে স্বদেশী আন্দোলনের নেতা সন্দীপকে কখনো নায়ক হিসেবে দেখানো হয়নি। যে সারাদিন স্বদেশী আন্দোলনের বুলি আওড়ায়, বিদেশী জিনিস বর্জন করার ঘোষণা দেয়, দিনশেষে তারই আবার বিলিতি সিগারেট ছাড়া মুখে কিছু রোচেনা। বিমলা অন্দরমহলের চৌকাঠ পেরিয়েই সন্দীপের মেকি প্রতিভার মোহে পড়ে যায়, শুরু হয় তাদের গোপন অভিসার। শেষদিকে আবার সেই ভুল বুঝতে পেরে বিমলা ফেরে নিখিলেশের কাছে। উদার মনের মানুষ নিখিলেশ এই মানব-মনের ভুলকে সহজেই মেনে নেয়। শেষদিকে স্বদেশীদের কারনে উদ্ভুত দাঙ্গায় বিধবা হয় বিমলা।
ছবিটি একটা জিনিস ভীষণভাবে প্রকট, আর তা হলো ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে ব্যবহৃত ‘বন্দে মাতরম’ শ্লোগানটি ভারতবর্ষের সব ধর্মের মানুষ আপন করে নেয়নি যা স্বয়ং রবিঠাকুরও মেনেছেন। এছাড়া নিম্নবিত্ত, গরিব কৃষক, মজুরদেরকে এই আন্দোলনের মূলধারায় কখনো আনা যায় নি। ইতিহাস বলে স্বদেশী আন্দোলনের ভারতবর্ষের কিংবা বাঙালির জন্য না, এটা কলকাতাবাসী কোন এক গোষ্ঠীর ব্যতিগত স্বার্থেই ব্যবহার হয়েছিলো। এসব তিক্ত দিকই দেখনো হয়েছে পুরো ছবি জুড়ে। ছবিটি নির্মানকালে দুইটি বড় রকমের হার্ট অ্যাটাক হয় সত্যজিৎ রায়ের। তার পুত্র সন্দীপ রায় সত্যজিতের পরামর্শ নিয়ে ছবির বাকী থাকা কাজগুলো শেষ করেন। ছবিটিতে বাড়তি আকর্ষন ছিলো সত্যজিতের চলচ্চিত্রে প্রথমবারের মত চুম্বনদৃশ্য। উল্লেখ্য বিমলা চরিত্রের জন্য সত্যজিৎ ভেবেছিলেন সুচিত্রা সেনকে। তবে সুচিত্রা রাজি না হওয়ায় মঞ্চ অভিনেত্রী স্বাতীলেখা সেনগুপ্তকে বিমলা চরিত্রের জন্য বেছে নেয়া হয়। ছবিটি ১৯৮৪ কান চলচ্চিত্র উৎসবে পাম ডি’অর-এর জন্য প্রতিযোগিতামূলক বিভাগে দেখানো হয়।
শতরঞ্জ কি খিলাড়ি ( ১৯৭৭)

সত্যজিৎ রায় মুন্সী প্রেমচাঁদের ছোট গল্পকে বেছে নেন এই ছবির জন্য, ছবিটি নির্মান করেন উর্দু ভাষায় যেটি ছিলো তার ক্যারিয়ারের প্রথম কোন উর্দু ছবি। ১৮৫৬ সালের বৃটিশ রাজের সময়কার কাহিনীতে দুটো গল্প সমান্তরালভাবে দেখিয়েছেন পরিচালক। হালকা মেজাজের প্রথম গল্পে তৎকালীন দুজন বিত্তবানকে দেখা যায় তাদের সংসারধর্ম ছেড়ে মজে আছেন দাবা খেলায়। অন্যদিকে ভারী মেজাজের গল্পে দেখানো হয় ব্রিটিশদের আওয়াধ রাজ্য দখল করে শাসক ওয়াজিদ আলি শাহকে ক্ষমতাচ্যুত করার গল্প। ছবিটি ধারাবর্ণনায় ছিলেন বলিউড সুপারস্টার অমিতাভ বচ্চন। ছবির মূল চরিত্রে দেখা গেছে আমজাদ খান, সঞ্জীব কুমার, সাইদ জাফরি, শাবানা আজমি, রিচার্ড স্যামুয়েল অ্যাটনবারা ও ফরিদা জালালকে। ছবিটি সত্যজিতের ক্যারিয়ারের অন্যতম ব্যয়বহুল ছবিও বটে। শতরঞ্জ কি খিলাড়ি ভারত থেকে অস্কারের বিদেশী ভাষার চলচ্চিত্র হিসেবে অংশগ্রহন করে।
নবাবদের শহর লখনৌ এর তৎকালীন রাজ্য আওয়াধ এর রাজাদের সৌখিনতার কোন কমতি ছিলোনা। শোনা যায়, আওয়াধ রাজ্যের শেষ নবাব ওয়াজিদ আলী শাহ্ এর খাবার আলাদা ছয়টি রন্ধনশালা থেকে আনা হত। ‘দমপোখ্ত’ কিংবা ঢিমে আঁচে রান্না ওয়াজিদ আলীই প্রথম নিয়ে আসেন কলকাতায়, বিশেষ করে বিরিয়ানি রন্ধনশৈলীতে। বিরিয়ানিতে আলুর প্রচলনও তাঁর হাতেই কি না, তা নিয়ে কিছুটা অবশ্য বিতর্ক আছে। এই ওয়াজিদ আলী শাহ্ ছিলেন ছিলেন একজন শিল্পকলার একজন বড় পৃষ্ঠপোষক, একাধারে কবি ও নৃত্যশিল্পী অনুরাগী যিনি ভারতীয় ক্লাসিকাল নৃত্য কত্থকে অসামান্য অবদান রেখেছিলেন। কেউ কেউতো তাঁকে হিন্দুস্তানি থিয়েটারের প্রথম নাট্যকার বলে বর্ণনা করেন। সিপাহী বিদ্রোহের ঠিক এক বছর আগে ১৮৫৬ সালের ফেব্রুয়ারীতে ব্রিটিশরা আওয়াধ রাজ্যের পতন ঘটায়। লেখক মুন্সী প্রেমচাঁদ সেখান থেকে লেখেন উর্দূ গল্প ‘শতরঞ্জ কি বাজি’ যার অনুসারে ১৯৭৭ সালে সত্যজিৎ রায় ছবিটি নির্মান করেন।
ছবির একদিতে দেখা যায় এই নবাব ওয়াজিদ আলী শাহ্’কে ক্ষমতা থেকে হঠানোর ইংরেজদের পরিকল্পনা ও এতে ব্যাপারে নবাবের প্রতিক্রিয়া। অন্যদিকে দুইজন ধনী মীর্জা সাজ্জাদ আলী এবং মীর রওশন আলীর গল্প দেখানো হয়েছে যাদের একমাত্র ধ্যানজ্ঞানই হচ্ছে দাবা (শতরঞ্জ) খেলা। সেই দাবা খেলার মোহে নিজ বাসা, পরিবার ছেড়ে তারা পাড়ি জমায় অচিন এক গ্রামে। শোলে ছবিতে গাব্বার সিং করে খল চরিত্রে খ্যাত হওয়া আমজাদ খানকে এই ছবিতে পজেটিভ চরিত্রে এনেছিলেন সত্যজিৎ যা সমালোচকরা খুব ভালোভাবেই গ্রহন করেছিলো। ছবিতে দেখানো ঘুড়ি ওড়ানো, মোরগ কিংবা মেষের লড়াই যেন সেই সময়টাকেই পর্দায় ফুটিয়ে তোলে।
ছবির পেছনের এক মজার গল্প দিয়ে লেখাটা শেষ করা যাক, শাবানা আজমীকে যখন জানানো হয়েছিলো শতরঞ্জ কি খিলাড়িতে তিনি দুই কি তিন দৃশ্যে অভিনয় করবেন, শাবানা নির্দিধায় জানিয়ে দিয়েছিলেন, ‘যদি আমাকে সত্যজিত্ রায় তার ছবিতে শুধু ঝাড়ু হাতে নিয়ে একটি শট দিতে বলে আমি তাও খুশি খুশি মনে করে দেব!” এইনা হলে সত্যজিৎ রায়!
আর্টিকেলটি দৈনিক ভোরের কাগজে পূর্বপ্রকাশিত
লেখকের অনুমতি ছাড়া সাইটে ব্যবহৃত সকল প্রকার লেখা পুনঃপ্রকাশ বেআইনি। জরুরী যোগাযোগে ইমেইলঃ altamishnabil@gmail.com
