সিনেমা শুরুর গপ্পঃ একজন জর্জ মেলিয়েস

চলচ্চিত্রের প্রথম সার্থক প্রদর্শনী ও সিনেমাটোগ্রাফ যন্ত্রের আবিষ্কার দিয়ে বিখ্যাত লুমিয়ের ভ্রাতৃদ্বয় বলেছিলেন, সিনেমা এমন একটি আবিষ্কার যার কোন ভবিষ্যৎ নেই। তাইতো তারা সিনেমা ব্যবসা থেকে সরে দাঁড়িয়েছিলেন। কিন্তু সিনেমায় ভবিষ্যৎ দেখেছিলেন অনেকেই যার মধ্যে অগ্রগণ্য তারই দেশের একজন যার নাম জর্জ মেলিয়েস। সিনেমা আবিষ্কারের শুরুর পাঁচ-ছয় বছরের মধ্যেই দর্শকেরা হাঁপিয়ে উঠেছিলেন বড়পর্দায় প্রামাণ্যচিত্রধর্মী ছোট সব ক্লিপ দেখে।  জর্জ মেলিয়েঁ চলচ্চিত্রকে এরচেয়ে বড় কিছু হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলো।

জর্জ মেলিয়েস ছিলেন একজন ফরাসি ব্যবসায়ী, অভিনেতা, থিয়েটারের প্রযোজক এবং জাদুকর। ১৮৬১ সালের ৮ই ডিসেম্বর প্যারিসে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। রবার্ট হুডন বলে একটি থিয়েটার চালাতেন মেলিয়েস। লুমিয়ের ভ্রাতৃদ্বয়ের সিনেমাটোগ্রাফ মেশিন কেনার ইচ্ছে ছিল মেলিয়েসের। তবে সরাসরি লুমিয়েররা তার প্রস্তাব নাকচ করে দেয়। তাতে দমে যায়নি মেলিয়েস। নিজ চেষ্টায় নানা চড়াই উৎরাইয়ের পর ১৮৯৬ সালের এপ্রিলে তিনি তার নিজ থিয়েটারে নিজের বানানো চলচ্চিত্র প্রদর্শন করা শুরু করেন। প্রথম দিকে তার কাজগুলোতে নিজ ম্যাজিক ট্রিকসগুলোই প্রদর্শন করতেন তিনি। তবে প্যারিসের রাস্তায় কোন একদিন দৃশ্যধারনের সময় তার জীবনে ঘটে যায় একটি ঘটনা যাকে অভিহিত করা যায় ‘হ্যাপি অ্যাকসিডেন্ট’ হিসেবে। দৃশ্যধারনের মাঝে তার ক্যামেরা কাজ করা বন্ধ করে দেয়। অনেক কষ্টে ক্যামেরা ঠিক করে শেষ করা হয় বাকী অংশের দৃশ্যধারন। এটি যখন তিনি দেখতে গেলেন তখন তিনি বুঝলেন ছবির দুইটি দৃশ্যের ফ্রেম ক্যামেরার গোলযোগের কারণে একই সময়ে রেকর্ড হয়েছে যা দর্শকের চোখে আলাদা রকমের বিভ্রম সৃষ্টি করছে। এই উপলদ্ধি দ্বারা তিনি বুঝতে পারেন এডিটিং বা সম্পাদনার মাধ্যমে চলচ্চিত্রে নানা ধরনের বিভ্রম তৈরি করা সম্ভব। যেমন মানুষের মুন্ডু শূন্যে ভাসানো, কাউকে মুহুর্তে গায়েব করে দেয়া, কোন বস্তুর আকৃতি পরিবর্তন সহ নানা কিছু। এসব আবিষ্কার এরপর তার নানা চলচ্চিত্রে প্রতিফলিত হয়।

বিশেষ ধরনের দৃশ্যায়নের জন্য খ্যাতি অর্জন করেন মেলিয়েস যার মধ্যে রয়েছে হস্ত-অঙ্কিত রঙ, একাধিক আলোক সম্পাত, সময়ানুক্রমিক চিত্রধারন, হঠাৎ অদৃশ্য হওয়া আবার ফিরে আসা সহ নানা কিছু। প্রথম দিককার  চলচ্চিত্র নির্মাতাদের মধ্যে তাকেই প্রথম স্টোরি বোর্ড ব্যবহার করতে দেখা যায়। তার নির্মিত চলচ্চিত্রসমূহের মধ্যে উল্লেখযোগ্য  আ ট্রিপ টু দ্য মুন (১৯০২) এবং দ্য ইম্পসিবল ভয়েজ (১৯০৪)। দুটি চলচ্চিত্রই জুল ভার্নের কাহিনী অবলম্বনে নির্মিত হয়েছে। তিনি শুধু সুপরিচিত হয়েছিলেন চলচ্চিত্রে ট্রিকশট প্রচলনের মাধ্যমে। 

১৯০২ সালে মেলিয়েস নির্মিত আ ট্রিপ টু দ্য মুন চলচ্চিত্রটি বিশ্বের প্রথম সায়েন্স ফিকশন ছবির মর্যাদা পেয়েছে। এটি আংশিক জুল ভার্নের ফ্রম দ্য আর্থ টু দ্য মুন, অ্যারাউন্ড দ্য মুন এবং এইচ. জি. ওয়েল্‌সের দ্য ফার্স্ট মেন ইন দ্য মুন অনুপ্রেরণায় নির্মিত। ছবিতে মেলিয়েসকে অধ্যাপক বার্বেনফুইলি চরিত্রে অভিনয় করতে দেখা যায়। কিছু জ্যোতির্বিদ একসঙ্গে বসে সিদ্ধান্ত নেন তাঁরা চাঁদে যাবেন। যেই কথা সেই কাজ, চাঁদে যাওয়ার জন্য একটা স্পেসশিপও বানিয়ে ফেলা হয় চটজলদি। অক্সিজেন মাস্কের তোয়াক্কা না করে সেই বুলেটাকৃতির স্পেসশিপে চড়ে সবাই পাড়ি দেন ছাদে। পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে হাসতে থাকা চাঁদ মামার ডান চোখ ফুঁড়ে চাঁদের অভ্যন্তরে সেঁধিয়ে যায় রকেটটি। এরপর সবাই কাঁথা মুড়ি দিয়ে সে কি ঘুম। চন্দ্রাভিযানের এক পর্যায়ে তারা অদ্ভুত এক এলিয়েন প্রজাতির দেখা পায়। সেই এলিয়েন প্রজাতির তাড়া খেয়ে পড়িমড়ি করে রকেট নিয়ে পৃথিবীতে ফেরত আসেন তারা। আসার সময় স্পেসশিপে আটকা পড়ে এক এলিয়েন। শেষমেশ মানবের চন্দ্র জয়ের একটি অনুষ্ঠানের মাধ্যমেই ছবিটির যবনিকাপাত হয়। ১৪ মিনিটের ছবিটি সেসময় পর্যন্ত ছিল মেলিয়েস নির্মিত দীর্ঘতম চলচ্চিত্র ছিল। ছবিটির নির্মানব্যায় ছিল ১০,০০০ ফ্রাঙ্ক। মেলিয়েসের আরেক উল্লেখযোগ্য ছবি দ্য ইম্পসিবল ভয়েজে এবারে সবাইকে সূর্য অভিযানে যেতে দেখা যায়। 

জর্জ  মেলিয়েসকে বলা হয়ে থাকে  ‘দ্য ফাদার অব স্পেশাল ইফেক্টস’। মেলিয়েসকে চলচ্চিত্রে দুটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে দেখা যায় আর তা হলো ফিল্মে একাধিক শটের প্রচলন এবং চলচ্চিত্রের সময় বৃদ্ধি। লুমিয়েরদের ফিল্মগুলো সর্বোচ্চ ১-২ মিনিট পর্যন্ত স্থায়ী ছিল, যে সময়কে বাড়িয়ে ১৪ মিনিট পর্যন্ত নিয়েছিলেন মেলিয়েস। ১৮৯৬ থেকে শুরু হওয়া ক্যারিয়ারে তিনি নির্মান করেছিলেন প্রায় ৫২০ টি চলচ্চিত্র। তার প্রযোজনা সংস্থার নাম ছিলো স্টার ফিল্ম কোম্পানি।  

শট আর সময় বাড়ানো ছাড়াও মেলিয়েঁ ফিল্মে আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ এডিটিং কৌশল আবিষ্কার করেন। মেলিয়েসের মাধ্যমেই চলচ্চিত্রে এডিটিং বিষয়টি একটি মুখ্য স্থান নেয়া শুরু করলো। জন্ম নিলো একাধিক শটকে অর্থবহ করে সাজানোর প্রয়োজনীয়তা, যাকে আজ ফিল্ম এডিটিং বা সম্পাদনা বলে। শোনা যায় সেই যুগেই সাদাকালো ছবিকে রঙ্গিন করার পদক্ষেপ নিয়েছিলেন হাতে রঙ করার মাধ্যমে আর এ জন্য তিনি ২১ জন মহিলাকে নিয়োগ দিয়েছিলেন। ২০১৮ সালে প্রথমবারের মত গুগলে দেখা গেল ৩৬০ডিগ্রি ডুডল যা মেলিয়েসের চলচ্চিত্রের প্রতি একটি ট্রিবিউট।

তার প্রযোজনার উচ্চ খরচ, অন্যান্য প্রতিদ্বন্দ্বীদের অপদৃষ্টি, প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ইউরোপের ধ্বংসযজ্ঞের ফলে ১৯১৭ সালে চলচ্চিত্র ব্যবসা থেকে সরে আসতে হয় তাকে। তাকে নিয়ে নির্মিত ‘হিউগো’ চলচ্চিত্রে তাকে স্টেশনে বসে ক্যান্ডি ও খেলনা বিক্রি করতে দেখা গেছে। অর্থনৈতিক দৈন্যদশায় ভর করা মেলিয়েসের বাকী জীবনটা ভালো কাটেনি। ১৯৩১ সালের অক্টোবরে মেলিয়েস ফ্রান্সের সন্মানজনক নাইট অব দ্য লিজিয়ন অব হনার অ্যাওয়ার্ড পান যা তার হাতে তুলে দেন লুই লুমিয়ের। ১৯৩৮ সালের ২১শে জানুয়ারী পৃথিবী ছেড়ে বিদায় নেন এ গুণী ঐন্দ্রজালিক চলচ্চিত্রকার।

লেখাটি ভোরের কাগজে পূর্বপ্রকাশিত

লেখকের অনুমতি ছাড়া সাইটে ব্যবহৃত সকল প্রকার লেখা পুনঃপ্রকাশ বেআইনি। জরুরী যোগাযোগে ইমেইলঃ altamishnabil@gmail.com

আরো পড়ুন...