সিনেমা শুরুর গপ্প: একজন হীরালাল

ভারতবর্ষের প্রথম দিককার চিত্রনির্মাতাদের একজন তিনি, সম্ভবত প্রথমই। ভারতের সর্বপ্রথম বিজ্ঞাপনবিষয়ক চলচ্চিত্র তিনিই বানিয়েছিলেন। এ অঞ্চলের প্রথম রাজনীতিক ছবিও তারই হাতে নির্মিত। তবে পরিতাপের বিষয় এই যে, ১৯১৭ সালের এক অগ্নিকাণ্ডে নষ্ট হয়ে যায় তার তৈরি সকল চলচ্চিত্র। হীরালাল জন্ম নেন তৎকালীন ঢাকা (বর্তমান মানিকগঞ্জ) জেলার বগজুরি গ্রামে আনুমানিক ১৮৬৬ সালে (মতান্তরে ১৮৬৮) এবং মৃত্যুবরণ করেন ১৯১৭ সালের ২৬ অক্টোবর। তার প্রয়াণ দিবসের ক্ষণে জীবন ও কর্ম নিয়ে পাঠকদের জন্য বিশেষ একটি লেখা।

হীরালাল সেনের বাবার নাম চন্দ্রমোহন সেন যিনি ব্রাহ্ম সমাজের নেতা, পত্রিকা সম্পাদক ও আইনজীবি এবং মা’র নাম বিধূমুখী। তবে পরিবারের মধ্যে সবচেয়ে আলোচ্য ব্যক্তি হলেন তার দাদা গোকুলকৃষ্ণ সেন মুনশি যিনি ঢাকার জজ আদালতের নামকরা উকিল ছিলেন। গোকুল মুন্সির আভিজাত্যের বর্ণনা লোকমুখে শোনা যায়। মুন্সি সাহেবের গোঁফের যত্নের জন্য দুজন ভৃত্যকে নিয়োগ দেয়া হয়েছিলো। সেই সময়ে তিনি যে চটিজুতো পড়তেন তার দাম ছিলো তখনকার হিসেবে ৪০-৪২ টাকা! গোকুল মুন্সির বাড়িটি ছিলো প্রাসাদসম এক রাজবাড়ি যার চল্লিশ বিঘে জমিতে ৪-৫ বিঘে শুধু ফুলবাগানই ছিলো, বাড়িতে ছিলো একটি পশুশালা ও চিড়িয়াখানা। তবে এই বিত্ত বৈভবের অনেকটাই শেষ হতে থাকে হীরালাল এর পিতা চন্দ্রমোহনের বেখেয়ালী জীবনযাপনের জন্য। তবে বাবা চন্দ্রমোহন সেনও ছিলেন ঢাকা শহরের নামজাদা উকিল। বাবার দর্শন ছেলেরা তেমন পেতনা, তবে মা বিধূমুখীর ভালোবাসা ষোলআনা পেয়েছিলেন হীরালাল। ছোট বেলা থেকেই রোগা ও শান্ত স্বভাবের ছেলেটির শখ ছিলো ছবি আকার ও প্রতিমা তৈরির।

এন্ট্রান্সে প্রথমবার অকৃতকার্য হয়ে দ্বিতীয়বার পাশ করে বের হন হীরালাল। পরবর্তীকালে ডাক কলেজে ভর্তি হলে ঝোক ওঠে ছবি তোলার। বোর্ন অ্যান্ড শেফার্ডের ব্যবস্থাপনায় অনুষ্ঠিত ‘রাজ্যপাঠ থেকে হুগলিতে সূর্যাস্ত’ ফটোগ্রাফি প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান নিয়ে সোনার মেডেল জেতেন তিনি। এই স্বর্ণপদক প্রাপ্তি তার জীবনের বড় অনুপ্রেরণা হয়ে দাড়ায় এবং তিনি পেশাদার ফটোগ্রাফির ব্যবসা শুরু করে। প্রতিষ্ঠানের নাম দেন ‘এইচ এল সেন অ্যান্ড ব্রাদার্স’। ১৮৮৭ থেকে ১৮৯৮ পর্যন্ত সর্বভারতীয় প্রতিযোগিতায় সাত সাতটি বার প্রথম হয়ে স্বর্ণপদক জেতেন তিনি। ফটোগ্রাফি ছাড়াও তার ছিলো ফটোগ্রাফ থেকে পোর্ট্রেট আকার নেশা যা তার শেষ বয়সের অবলম্বন হয়েছিলো।

সে যুগে ফরাসি প্যাথে কোম্পানী ভারতবর্ষের রাজাদের হাতি, ঘোড়া, উট, বাঁদরের খেলা প্রভৃতির দৃশ্যধারন করে সেগুলো ইউরোপে প্রদর্শন করতো। সেই পাথে কোম্পানীর একজন সহযোগী হয়ে তাদের কাজগুলো পর্যবেক্ষন করতে থাকেন তিনি। ১৮৯৮ সালে পাথে স্টুডিওর সদস্য অধ্যপক স্টিভেনসনের একটি স্বল্পদৈর্ঘ ছবি কলকাতার স্টার থিয়েটারে দেখানো হয়, The Flower of Persia (পারস্যের ফুল) নামক একটি অপেরার সঙ্গে। এই স্টিভেনসনের থেকে ক্যামেরা চেয়ে নিয়ে হীরালাল নির্মান করেন তার প্রথম ছবি A Dancing Scene From the Opera, The Flower of Persia যা নির্মিত হয় ওই অপেরার একটি নাচের দৃশ্য নিয়েই সেই ১৮৯৮ সালে! উল্লেখ্য এক বিদেশী ফটোগ্রাফ পত্রিকায় বায়োস্কোপের বিজ্ঞাপন দেখে হীরালাল যন্ত্রপাতি কেনেন এবং প্রতিষ্ঠা করেন রয়্যাল বায়োস্কোপ কোম্পানী। সেসময়ের বিবাহ সহ সে সময়ের ধনীদের নানা ধুমধাম সব আয়োজনে ডাক পড়তো এই বায়োস্কোপের। বায়োস্কোপকে সেসময়ে বলা হত পৃথিবীর অষ্টম আশ্চর্য।

মঞ্চ নাটকের একজন নিয়মিত দর্শক হয়েই এই শিল্পমাধ্যমটির প্রতি তীব্র অনুরাগ জন্মে হীরালালের। তার পরিচয় ঘটে নাট্যজন অমরেন্দ্রনাথ দত্তের। এই অমরেন্দ্রনাথই প্রথম মঞ্চের স্টেজে আসল চেয়ার, টেবিল, সোফা ইত্যাদি সত্যিকারের সরঞ্জামের ব্যবহার শুরু করেন। এই দুই জুটি মিলে সৃষ্টি করেন ইতিহাসের। মঞ্চনাটক আলিবাবার চিত্রকে ভিডিও আকারে ধারণ করা হলো হীরালালেরই মাধ্যমেই। এরপর হীরালালের বায়োস্কোপ কোম্পানীতে যোগ দেন তার ভাগ্নে ভোলানাথ (যিনি চলচ্চিত্রে কুমার শংকর গুপ্ত নামে পরিচিত হয়েছিলেন) এবং তার মেঝভাই মতিলাল। তবে ভাগ্নে ভোলানাথের কুড়ি হাজার টাকা আত্মসাৎ করে চম্পট দেয়াটায় বেগতিক অবস্থায় পরেছিলেন হীরালাল। ইতিমধ্যে আলিবাবার সাফল্যের পর অনেকে ব্যবসায়ীই এই শিল্পমাধ্যমে আগ্রহী হলেন যার মধ্যে অগ্রগণ্য জাহাঙ্গির ফ্রামজি ম্যাডান।

১৯০৫ সালের ২২শে সেপ্টেম্বর বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের একটি প্রতিবাদ সভা হয়েছিল কলকাতার টাউন হলে। এ ছবিতে সেই ঘটনাকে ক্যামেরাবদ্ধ করেন হীরালাল। ছবির শেষে গাওয়া হয়েছিল স্বদেশী বন্দে মাতরম গান। হীরালালের তৈরি এ তথ্যছবি “Anti-Partition Demonstration and Swadeshi movement at the Town Hall, Calcutta on 22nd September 1905” কে ভারতের প্রথম রাজনীতিক চলচ্চিত্র বলা হয়। টকিং মেশিন দিয়ে শব্দধারন করায় এই কাজটি সে সময়ে পেয়েছিলো আলাদা শিল্পমাত্রা। এরপর তিনি চিত্রায়ন করেছিলেন কেশভ গঙ্গাধার তিলকের কোলকাতায় আগমন এর ঘটনাবলী, পঞ্চম জর্জ ও সম্রাজ্ঞী মেরীর ভারত আগমনের সংবাদচিত্র সহ নানা কিছু। জীবনের শেষদিকে ভাই হীরালালের সঙ্গে মতান্তরের ফলে ব্যবসায়ে আলাদা হয়ে গিয়ে এবং কন্ঠে ক্যান্সারের মত দুরারোগ্য ব্যাধি দ্বারা আক্রান্ত হয়ে জীবনটা কষ্টে কাটাতে হয়েছে তাকে।

পঞ্চম জর্জ ও সম্রাজ্ঞী মেরীর ভারত আগমনের সংবাদচিত্র

হীরালাল বিয়ে হয়েছিলো হেমাঙ্গিনী দেবীর সঙ্গে। তাদের ছিলো তিন মেয়ে ও এক ছেলে। তার তৃতীয় সন্তান মেয়ে প্রতিভা সেনের বিয়ে হয় নরনাথ সেনের সাথে। নরনাথ সেনের ভাইপো দিবানাথ সেনের স্ত্রী ছিলেন কিংবদন্তির নায়িকা সুচিত্রা সেন। ১৯১৭ সালে নবমীর এক সন্ধ্যায় অসুস্থ অবস্থায় তিনি জানতে পারেন তার ভাই মতিলালের বাসায় আগুন ধরে এবং তার ধারনকৃত সমস্ত উল্লেখযোগ্য কর্মগুলো আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যায়। প্রতিমা বিসর্জনের দিনে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে পরপারে পাড়ি জমান তিনি।

১৯০০ থেকে ১৯১৭ সাল পর্যন্ত তিনি আনুমানিক প্রায় ৪০ টির অধিক স্বল্পদৈর্ঘ্য ছবি বানিয়েছিলেন। অধিকাংশ ছবিতেই তিনি ক্যামেরাবদ্ধ করেন অমরেন্দ্রনাথ দত্তের কলকাতার ক্লাসিক থিয়েটারে মঞ্চস্থ বিভিন্ন মঞ্চনাটকের দৃশ্যাবলী। ১৯০১ থেকে ১৯০৪ সনের মধ্যে ক্লাসিক থিয়েটারের হয়ে তিনি বেশকিছু ছবি নির্মাণ করেন যার নাম ভ্রমর, হরিরাজ, বুদ্ধদেব ইত্যাদি। ১৯০৩ এর দিকে তৈরি আলিবাবা ও চল্লিশ চোর তার কর্মগুলোর মধ্যে অধিক জনপ্রিয়তা পেয়েছে।  ১৯০২-০৩ সালে বিদেশ থেকে উন্নত ক্যামেরা ও যন্ত্রপাতি আনানোর পর হীরালাল ভিডিওবন্দী করলেন প্রথম পূর্ণাঙ্গ নাটক ‘আলিবাবা ও চল্লিশ চোর’। ১৯০৪ সালের ২৩ জানুয়ারি ক্লাসিক থিয়েটারে তা দেখানো হল। সিনেমার ইতিহাসে শুরু হলো নতুন এক অধ্যায়ের। এছাড়া ১৯০৩ খৃষ্টাব্দে তার বায়োস্কোপ কোম্পানী থেকে প্রথম বাংলায় সিকে সেনের মাথার তেল ‘জবাকুসুম’, বটফেস্ট পালের ‘এডওয়ার্ড টনিক’ ও ডব্লিউ মেজর কোম্পানির ‘সার্সাপেরিলা’ ইত্যাদি বিজ্ঞাপনচিত্র নির্মিত হয়। প্রামাণ্যচিত্র ও সংবাদচিত্রও রয়েছে তার কর্মের ঝুলিতে। সম্প্রতি হীরালালের জীবনী নিয়ে পশ্চিমবঙ্গে চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে যেখানে জামশেদজি ফ্রেমজি ম্যাডান এবং হীরালালের চরিত্রে যথাক্রমে দেখা যাবে শাশ্বত চট্টোপাধ্যায় এবং নবাগত কিঞ্জল নন্দ। ‘হীরালাল’ শিরোনামের চলচ্চিত্রটি পরিচালনা করেছেন এগারো’, ‘চোলাই’-এর মতো নন্দিত ছবির নির্মাতা অরুণ রায়।

হীরালালের চরিত্রে নবাগত কিঞ্জল নন্দ

উপমহাদেশের প্রথম চলচ্চিত্রকার হিসেবে দাদাসাহেব ফালকের নাম আসলেও সত্যিকারের ইতিহাস বলে সেটি আর কেউ নন স্বয়ং হীরালাল সেন। এমনকি হীরালাল যখন শারীরিক অসুস্থতার জন্য কর্মজীবনের শেষদিকে পৌছে গিয়েছিলেন তখনও দাদাসাহেব ফালকে তার কাজ শুরু করেননি। শুধুমাত্র হীরালাল সেন নির্মিত কাজগুলো অগ্নিকান্ডে বিনষ্ট হয়েছে বলে তার এই অর্জন ম্লান হয়ে যাবে তা কোনভাবেই মেনে নেয়া যায়না। হীরালাল অবশ্যই থাকবেন বাঙ্গালী চলচ্চিত্রপ্রেমীদের হৃদয়ে, মননে।

লেখাটি ভোরের কাগজে পূর্বপ্রকাশিত

লেখকের অনুমতি ছাড়া সাইটে ব্যবহৃত সকল প্রকার লেখা পুনঃপ্রকাশ বেআইনি। জরুরী যোগাযোগে ইমেইলঃ altamishnabil@gmail.com

আরো পড়ুন...