Take the camera out into the street!
ক্যামেরাকে স্টুডিওর বাইরে নিয়ে গিয়ে মিথ্যে চাকচিক্যের গল্প ছেড়ে গনমানুষের গল্প বলার জন্য ইতালিতে নতুন একটি চলচ্চিত্র ধারার সৃষ্টি হয়েছিলো যাকে বলা হয় নিওরিয়ালিজম বা নয়াবাস্তববাদ। নয়াবাস্তববাদের প্রেক্ষাপট জানতে হলে সবার আগেই পাঠককে মাথায় নিয়ে হবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে ইতালির রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট। বিশের দশক থেকে ইতালিতে চরমভাবে জেকে বসে ফ্যাসিবাদ। ফ্যাসিবাদ মূলত বাম রাজনীতির উপাদান নিয়ে ডানপন্থী রাজনীতিতে অবস্থান নেয়। এটি সাম্যবাদ, সমাজতন্ত্র, উদারতাবাদ ও গণতান্ত্রিকের বিরোধী একটি রাজনৈতিক ধারা। ফ্যাসিবাদী সরকার সামরিক বাহিনীর ওপর অতিনির্ভর একটি ধারা। বেনিতো মুসোলিনি ছিলেন দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ কালে ইতালির সর্বাধিনায়ক। এই একনায়ক ১৯২২ সাল থেকে ১৯৪৩ সালে তার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পুর্ব পর্যন্ত সমগ্র রাষ্ট্রের ক্ষমতায় ছিলেন। সে সময়ে ইতালিতে ফ্যাসিবাদ রীতিতে চলচ্চিত্র বিকাশে মুসোলিনি গড়ে তোলেন একটি সংস্থা। বাস্তব গল্প নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মান তখন যেন ছিলো একদম অসম্ভব।
তিরিশ দশকে ফরাসি চলচ্চিত্র পরিচালক জ্যাঁ রেনোয়া দুবছর ইতালিতে ছিলেন। রেনোয়ার এই উপস্থিতি সেদেশের চলচ্চিত্রকারদের প্রভাবিত করে। রেনোয়ার সাহায্যপুষ্ট হয়ে হয়ে এরপর পরিচালক লুসিনো ভিসকন্তি নির্মান করেন ওসেসিওনে যেখান থেকেই নিওরিয়ালিজম যুগের সূচনা। ইতালিয় এই চলচ্চিত্রধারার মূল বৈশিষ্ট্য ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইতালির দরিদ্র এবং কর্মজীবি লোকদের জীবন কাহিনী বর্ণনা। সেসব চলচ্চিত্রগুলোর চিত্রধারণও করা হতো কর্মজীবি খেটে খাওয়া মানুষেদের কর্মস্থলে, চরিত্রগুলো রূপায়িত করতে দেখা যেতো অপেশাদার অভিনেতাগণকে। নিওরিয়ালিজম ধারাটি ১৯৪৩ সালের ওসেসিওনে ছবিটি দিয়ে আরম্ভ হয় ও ১৯৫২ সালের উম্বের্তো ডি ছবিটি দিয়ে শেষ হয়। এই চলচ্চিত্র ধারার চলচ্চিত্রকারদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য রবার্তো রোসেলিনি, ভিত্তোরিও দে সিকা, লুচিনো ভিসকন্তি, গিসেপ ডি স্যান্ডিস, লুইগি জাম্বার, সিযার যাভাত্তিনি, ফেদেরিকো ফেলিনি প্রমুখ।
নিওরিয়ালিজম চলচ্চিত্র ধারার কথা আসলে যে ছবিগুলো বেশীরভাগ উচ্চারিত হয় তার মধ্যে রবার্তো রোসেলিনির ‘রোম, ওপেন সিটি’ ও ভিত্তোরিও দে সিকার ‘বাইসাইকেল থিভস’। এ চলচ্চিত্র ধারার অন্যতম উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রগুলো হচ্ছে দে সিকার শু-শাইন (১৯৪৬), মিরাকেল ইন মিলান (১৯৫১), উম্বের্তো ডি (১৯৫২); রোসেলিনির পাইসা (১৯৪৬), জার্মান ইয়ার জিরো (১৯৪৮), স্ট্রোমবলি (১৯৫০), ইউরোম ৫১ (১৯৫২); লুচিনো ভিসকন্তির বেলিসিমা (১৯৫১); গিসেপ ডি স্যান্ডিস এর রোম ১১:০০ (১৯৫২)।
চলচ্চিত্রে নিয়রিয়ালিজম ধারার প্রভাব জ্বলন্তভাবে দেখা যায় উপমহাদেশের কিংবদন্তী চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়ের কাজের মধ্যে। শুরুর জীবনে ক্যারিয়ারে বিজ্ঞাপন সংস্থায় চাকুরে সত্যজিৎ দে সিকার বাইসাইকেল থিভস দেখে চটজলদি সিদ্ধান্ত নেন তিনি সব ছেড়েছুড়ে দিয়ে শুধু এরপর সিনেমাই বানাবেন। তারই ফলে তিনি দর্শকদের উপহার দেন পথের পাঁচালী, অপরাজিত, অপুর সংসার সহ অসাধারন সব জীবনঘনিষ্ট চলচ্চিত্র।
নিওরিয়ালিজম ধারার কিছু প্রধানতম উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রের বিস্তারিত জেনে আসা যাক।
রোম, ওপেন সিটি (১৯৪৫)
রোমা, চিত্তা আপের্তা বা রোম, ওপেন সিটি রবার্তো রোসেলিনি পরিচালিত চলচ্চিত্র যা মুক্তি পায় ১৯৪৫ সালে। ছবির প্রেক্ষাপট ১৯৪৪ সাল যখন রোম শহর নাৎসি অধিকৃত ছিলো। মিত্রবাহিনী রোম থেকে জার্মান তাড়িয়ে দেবার দুই মাসের দিকেই পরিচালক ছবির দুইজন চিত্রনাট্যকার সার্গিও এমিইদি ও ফেদরিকো ফেলিনিকে নিয়ে ছবির চিত্রনাট্য তৈরি করে ফেলেন। ছবির যখন দৃশ্যধারন করা হয় তখনও ইতালিতে যুদ্ধের ধ্বংসলীলার ছাপ রয়ে গেছে। চলচ্চিত্রটিতে অভিনয়ে ছিলেন আলডো ফ্যাবরিজি, আনা মাগনানি, মার্সেলো পাগলিরো এবং হ্যারি ফিয়েস্ট।
১৯৪৪ সালে জার্মান গেস্টাপো বাহিনী রোম শহরে ঢুকে পড়ে। ছবিতে প্রথাবিরোধী জর্জিও ম্যানফ্রেডিকে দেখা যায়। ম্যানফ্রেডিকে খুঁজতে থাকে গেস্টাপো বাহিনী, ওদিকে তাকে পালিয়ে বাঁচতে সাহায্য করে তার বন্ধু ফ্রান্সেসকো, বন্ধুর বাগদত্তা পিনা ও পাদ্রী ডন পিয়াত্রো। ম্যানফ্রেডি কি পালাতে পারে নাকি তাকে গেস্টাপো বাহিনীর হাতে করতে হয় অসহায় আত্মসমর্পণ, এই গল্পই বর্ণিত হয়েছে ছবিটিতে।
সে সময়ে ছবিটি দিয়ে কান চলচ্চিত্র উৎসবে গ্রান্ড প্রাইজ পান রোসেলিনি। ইতালিয় নিওরিয়ালিজম নামের নতুন চলচ্চিত্রধারা সারাবিশ্বের চলচ্চিত্র দর্শকদের কাছে আলোড়ন তোলে। রোম ওপেন সিটির সঙ্গে পরিচালকের পরবর্তীকালে বানানো দুটি ছবি পাইসা ও জার্মান ইয়ার জিরো এই তিনটি চলচ্চিত্রকে একসঙ্গে রোসেলিনির নিওরিয়ালিজম ট্রিলজি বলা হয়। ইতালীতে মুক্তির পূর্বে ১৯৪৬ সালের ফেব্রুয়ারীতে চলচ্চিত্রটি নিউ ইয়র্কে মুক্তি দেয়া হয়।
বাইসাইকেল থিভস (১৯৪৮)
নিওরিয়ালিজম বা নয়াবাস্তববাদ আন্দোলনের সবচেয়ে আলোচিত চলচ্চিত্র বলা হয় ভিত্তোরিও দে সিকার বাইসাইকেল থিভসকে। ছবিটির ইতালিয় নাম লাদ্রি দি বিচিক্লেত্তে। লুইজি বার্তোলিনির একই নামের উপন্যাস অবলম্বনে ছবিটির চিত্রনাট্য রচনা করেন সিসারে জাভাত্তিনি। চলচ্চিত্রটি ইতালিতে মুক্তি পায় ১৯৪৮ সালে। দে সিকা এই ছবির কাজে হাত দেওয়ার অল্প কিছুদিন পূর্বে বিতর্কিত শু শাইন (১৯৪৬) চলচ্চিত্র নির্মাণ করে। ছবিটি নির্মানের জন্য তিনি বড় কোন স্টুডিওকে প্রযোজক হিসেবে পাননি। তাই নিজের বন্ধুদের কাছ থেকে এই চলচ্চিত্র নির্মানের জন্য তহবিল সংগ্রহ করেন যার ফলে সৃষ্টি হয় সর্বকালের অন্যতম সেরা এই চলচ্চিত্রটি।
যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে ইতালির দারিদ্র ও বেকারত্ব ফুটে উঠেছে এ ছবিতে। তখনকার ইতালিতে একটি বাইসাইকেল বর্তমান সময়ের একটি মোটরগাড়ির সমান দামী ছিলো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে রোম শহরে এক দরিদ্র পিতা ও তার পুত্রের চুরি হয়ে যাওয়া সাইকেল খোঁজার প্রাণান্তকর চেষ্টার গল্প নিয়ে নির্মিত হয়েছে এ চলচ্চিত্র। ছবিটিতে বাবা আন্তোনিও রিচ্চির ভূমিকায় অভিনয় করেন লামবের্তো মাজ্জোরানি ও আন্তোনিওর পুত্র ব্রুনো রিচ্চির ভূমিকায় অভিনয় করেন এনজো স্তায়োলা। ছবিতে অভিনেতা অভিনেত্রীদের মধ্যে কেউই তেমন প্রশিক্ষিত অভিনয়শিল্পী ছিলেন না। বাবার ভূমিকায় অভিনয় করা লামবের্তো মাজ্জোরানি ছিলেন একজন ফ্যাক্টরি শ্রমিক। ছবিতে অভিনয় করা কয়েকজন অভিনয়শিল্পীর চরিত্র তাদের বাস্তব জীবনের সঙ্গে মিলে গিয়েছিলো। আর পুত্র ব্রুনোর ভূমিকায় তিনি খুঁজে নেন রাস্তায় নিজ বাবার ফুল বিক্রির কাজে সাহায্যের পাশাপাশি চলচ্চিত্রের নির্মাণ দেখতে আসা ৮ বছর বয়সী এনজো স্তায়োলাকে।
বাইসাইকেল থিভস ১৯৫০ সালে একাডেমি সম্মানসূচক পুরস্কার লাভ করে। ছবি মুক্তির চার বছরের মাথায় সাইট অ্যান্ড সাউন্ড ম্যাগাজিনের আয়োজিত ভোটে সর্বকালের সেরা চলচ্চিত্রের তকমা লাভ করে। ৫০ বছর পর একই ভোটে চলচ্চিত্রটি সর্বকালের সেরা চলচ্চিত্রের তালিকায় ষষ্ঠ স্থান ধরে রাখে।
উম্বের্তো ডি (১৯৫২)
ভিত্তোরিও দে সিকা নির্মিত অন্যতম নিওরিয়ালিষ্ট চলচ্চিত্র উম্বের্তো ডি মুক্তি পায় ১৯৫২ সালে। তার স্বভাবসূলভ পরিচালনার ছাপ এ চলচ্চিত্রেও ছিলো। ছবিতে অভিনয় করা অধিকাংশ অভিনেতা অভিনেত্রীই পেশাদার ছিলেন না। এমনকি মূখ্য চরিত্রে অভিনয় করা কার্লো বাত্তিসতি ছিলেন একজন ইতালীয় ভাষাবিদ। রোম শহরে উম্বের্তো ডোমিনিকো ফেরারি নামক এক বৃদ্ধের ভাড়া বাড়িতে তার বাড়িওয়ালীর সঙ্গে লড়াই করে নিজের টিকে থাকার গল্প বর্ণিত হয়েছে ছবিটিতে। শোনা যায়, এটি পরিচালক দে সিকার নিজের পরিচালনায় সবচেয়ে পছন্দের ছবি। টাইম ম্যাগাজিনের ২০০৫ এ করা সেরা ১০০ চলচ্চিত্রের তালিকায় স্থান করে নিয়েছে চলচ্চিত্রটি।
লেখাটি ভোরের কাগজে পূর্বপ্রকাশিত পর্ব ১ । পর্ব ২
লেখকের অনুমতি ছাড়া সাইটে ব্যবহৃত সকল প্রকার লেখা পুনঃপ্রকাশ বেআইনি। জরুরী যোগাযোগে ইমেইলঃ altamishnabil@gmail.com
