ভূতের রাজা দিলো বর, জবর জবর তিন বর! বাল্যকালে স্যাটেলাইটের কল্যানে ভারতের ডিডিবাংলা চ্যানেলে দেখা গুপী বাঘা সিরিজের ছবিগুলোতে ভূতের রাজার দেয়া বরের ফলে গুপী বাঘার দেখানো ম্যাজিকে মন্ত্রমুগ্ধ হতাম। আস্তে আস্তে যখন বড় হলাম তখন বুঝতে শুরু করলাম, আসল ম্যাজিশিয়ান আর কেউ নয় সেই ছবিগুলোর নির্মাতা স্বয়ং সত্যজিৎ রায়। গুপী-বাঘা ভূতের রাজার দেয়া বর’গুলো দিয়ে যেমন মানুষকে মোহাবিষ্ট করে রাখতে পারতো, একজন চলচ্চিত্রকারের নিজেরও তেমন দর্শকদের মোহাবিষ্ট করার ক্ষমতা আছে। সত্যজিৎ রায়ের ক্ষেত্রে সেই মোহ তৈরির বিষয়টা অনেক বেশী তড়িৎ। ইতিহাস, সাহিত্য, রম্য, রোমা , ভ্রমন, ফ্যান্টাসি.. কি নেই সত্যজিৎ রায়ের ছবিগুলোতে। কিন্তু এইচডি, ব্লুরের ফাঁক গলে সত্যজিৎ রায়ের কালজয়ী চলচ্চিত্রগুলো তরুণ প্রজন্মের কাছে কতদূর পৌঁছেছে তা নিয়ে আমার বিস্তর সন্দেহ আছে। আজ ২৩ শে এপ্রিল সত্যজিৎ রায়ের প্রয়াণ দিবসে এই লেখার মাধ্যমে লেখাটি দিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে সত্যজিৎ রায়ের যোগসূত্রগুলো খুঁজে বের করে সেগুলো নিয়ে আলোকপাত করার চেষ্টা থাকছে।
বাংলাদেশের সঙ্গে সত্যজিৎ রায়ের সম্পর্কের দিকগুলোও কম নয়। রায় বংশের আগের প্রজন্মগুলোর সম্পর্কে জানা যায়, তাদের এক পূর্বপুরুষ যার নাম শ্রী রামসুন্দর দেও (দেব) যিনি ছিলেন নদীয়া জেলার চাকদহ গ্রামের বাসিন্দা। ভাগ্যাচক্রে তিনি পূর্ববঙ্গ (বর্তমান বাংলাদেশের) শেরপুরে আসেন। শেরপুরের জমিদারের বাড়িতে বসে তার ভাগ্যক্রমে সাক্ষাৎ হয় যশোদলের জমিদার এর সঙ্গে যার নাম রাজা গুণীচন্দ্র। এই সাক্ষাৎই তার শাপে বর হয়। রামসুন্দর এর বুদ্ধিমত্তা-সৌন্দর্য রাজা গুণীচন্দ্রকে আকৃষ্ট করে এবং তাকে যশোদলে নিয়ে রাজার জামাই বানান। এরপর তার কোন এক বংশধর সেখান থেকে সরে গিয়ে ব্রহ্মপুত্র নদীর পাড়ে মসুয়া গ্রামে বসবাস করতে শুরু করেন যেটি বর্তমান বাংলাদেশের কিশোরগঞ্জ জেলার কটিয়াদী উপজেলার অন্তর্গত। সত্যজিতের দাদা (পিতামহ) উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী এবং বাবা সুকুমার রায় দুজনেরই জন্ম হয়েছিল এখানে। উপেন্দ্রকিশোরের কাকা হরি কিশোরও ছিলেন মসূয়ার বড় জমিদার। কিশোরগঞ্জে গেলে আজও সেই জীর্ণ ভিটাটি দেখতে পাওয়া যায় তবে ইতিহাস সংরক্ষণের নিমিত্তে সেটির সংস্কারকার্য অবশ্য প্রয়োজন।
বাংলাদেশের সঙ্গে সত্যজিৎ রায়ের সম্পর্কের দিকগুলোও কম নয়। রায় বংশের আগের প্রজন্মগুলোর সম্পর্কে জানা যায়, তাদের এক পূর্বপুরুষ যার নাম শ্রী রামসুন্দর দেও (দেব) যিনি ছিলেন নদীয়া জেলার চাকদহ গ্রামের বাসিন্দা। ভাগ্যাচক্রে তিনি পূর্ববঙ্গ (বর্তমান বাংলাদেশের) শেরপুরে আসেন। শেরপুরের জমিদারের বাড়িতে বসে তার ভাগ্যক্রমে সাক্ষাৎ হয় যশোদলের জমিদার এর সঙ্গে যার নাম রাজা গুণীচন্দ্র। এই সাক্ষাৎই তার শাপে বর হয়। রামসুন্দর এর বুদ্ধিমত্তা-সৌন্দর্য রাজা গুণীচন্দ্রকে আকৃষ্ট করে এবং তাকে যশোদলে নিয়ে রাজার জামাই বানান। এরপর তার কোন এক বংশধর সেখান থেকে সরে গিয়ে ব্রহ্মপুত্র নদীর পাড়ে মসুয়া গ্রামে বসবাস করতে শুরু করেন যেটি বর্তমান বাংলাদেশের কিশোরগঞ্জ জেলার কটিয়াদী উপজেলার অন্তর্গত। সত্যজিতের দাদা (পিতামহ) উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী এবং বাবা সুকুমার রায় দুজনেরই জন্ম হয়েছিল এখানে। উপেন্দ্রকিশোরের কাকা হরি কিশোরও ছিলেন মসূয়ার বড় জমিদার। কিশোরগঞ্জে গেলে আজও সেই জীর্ণ ভিটাটি দেখতে পাওয়া যায় তবে ইতিহাস সংরক্ষণের নিমিত্তে সেটির সংস্কারকার্য অবশ্য প্রয়োজন।
বাংলাদেশের সঙ্গে সত্যজিৎ রায়ের আরেক গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ বাংলাদেশী অভিনেত্রী ববিতাকে চলচ্চিত্র অশনি সংকেতে অভিনয়ের সুযোগ ঘটানো যেটি মুক্তি পায় ১৯৭৩ সালে। ১৯৪৩ সালে ব্রিটিশ শাসিত ভারতবর্ষে দুর্ভিক্ষ লাগে যা ইতিহাসে তেতালিশের মন্বন্তর নামে পরিচিত। জাপান প্রতিবেশী দেশ বার্মা (বর্তমানে মায়ানমার) দখল করার পর শুরু হয় এই দুর্ভিক্ষ। ওই সময় বার্মা ছিল এ অ লের চাল আমদানির বড় উৎস। উৎসটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ও ভারতবর্ষের তৎকালীন ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসক সেনা যুদ্ধে নিয়োজিত কর্মীদের জন্য বিপুল পরিমাণ খাদ্য মজুদ করায় এই দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। এই মন্বন্তরে বাংলাজুড়ে প্রায় ৫০ লক্ষ লোক না খেয়ে মারা যায়। এই দুর্ভিক্ষ কিভাবে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করেছিল তারই বর্ণনা রয়েছে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি অসমাপ্ত উপন্যাস অবলম্বনে সত্যজিৎ রায় নির্মিত চলচ্চিত্রে অশনি সংকেত-এ। চলচ্চিত্রটিতে অভিনয়ে ছিলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, সন্ধ্যা রায়, চিত্রা বন্দ্যোপাধ্যায়, পরিতোষ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে বাংলাদেশের চিত্রনায়িকা ববিতা।
ছবির গল্পে দেখা যায়, শিক্ষিত ব্রাহ্মণ গঙ্গাচরণ তার স্ত্রীকে নিয়ে নতুন এক গ্রামে এসে বসবাস শুরু করে। ব্রাহ্মণবিহীন এক গ্রাম পেয়ে গঙ্গাচরণ সেখানে প্রধান পুরোহিত হয়ে একটি টোল খোলার পরিকল্পনা করতে থাকেন। গ্রামবাসীরা সরল মনে নিজেদের গ্রামে ব্রাহ্মণকে পেয়ে খুশি হয়ে ওঠে। অপরদিকে গঙ্গাচরনের স্ত্রী অনঙ্গ নিজের চরিত্র ও আন্তরিকতা দিয়ে দ্রুতই গ্রাম্যবধূদের ভালবাসা অর্জন করে।
এই সময় সারা বাংলাজুড়ে দুর্ভিক্ষ লাগলে তাদের গ্রামে দেখা যায় খাদ্যের আকাল। গঙ্গাচরণ নিজের জন্য আগেভাগেই কিছু চাল সংগ্রহ করে রেখেছিলেন, কিন্তু তাতেও তাদের শেষরক্ষা হয়না। কাড়িক শ্রমের মাধ্যমে কিছু উপার্জনের কথা চিন্তা করতে হয় তার স্ত্রী অনঙ্গকেও। একদিন অনঙ্গ অন্যান্য গ্রাম্যবধূদের সঙ্গে ঝোপে আলু তুলতে গেলে একটি লোক ছুটকিকে তুলে নিয়ে যেতে চায়। তাকে বাঁধা দিয়ে আলু তোলার হাতা দিয়ে আঘাত করে অনঙ্গর এক প্রতিবেশী ছুটকি লোকটিকে খুন করে। ছবির শেষে পেটের জ্বালায় ছুটকি অপছন্দ সত্বেও এক পোড়ামুখ লোকের সঙ্গে পালিয়ে যায়। ছবির শেষে খাবারের আশায় অন্তঃসত্ত¡া স্ত্রীকে নিয়ে গঙ্গাচরণ অন্য গ্রামবাসীদের সঙ্গে গ্রামত্যাগ করে। মানুষ সৃষ্ট সেই দুর্ভিক্ষে মৃত্যুর খতিয়ান দেখিয়ে শেষ হয়।
নানা সময়ে বাংলাদেশে প্রকাশিত ববিতার বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে তার ছবিটিতে কাজ করার বিভিন্ন অভিজ্ঞতা সম্পর্কে জানা যায়। ছবিটিতে কাজ করার জন্য সত্যজিতের সাথে প্রথম যখন দেখা করতে ববিতা কলকাতা যান সেদিন তিনি কড়া মেকাপ নিয়েছিলেন। সত্যজিৎ জানান তিনি মেকাপ ছাড়া ববিতাকে দেখতে চান। তাই পরের দিন ববিতা হাজির হন কোন মেকাপ ছাড়াই এবং পেয়ে যান অনঙ্গ বউ এর কাঙ্গিত সেই চরিত্রটি। শোনা যায় চরিত্রটিতে অভিনয়ের জন্য নজর ছিলো অপর্ণা সেন, শর্মিলা ঠাকুরের মত অভিনেত্রীর। একবার শ্যুটিং স্পট থেকে ফেরার পথে ছোট্ট সেতু পার হতে যেয়ে ববিতা তাঁর পায়ের চপ্পল ফেলে দিয়েছিলেন। পরে তিনি দেখলেন স্বয়ং সত্যজিৎ রায় নিজ হাতে সেই চপ্পল তুলে এনেছেন। এতো বড় পরিচালকের এমন মহানুভবতায় মুগ্ধ হয়েছিলেন তিনি।
ছবিটি নিয়ে আরেকটি গল্প শোনা যায় । ১৯৭৩ সালে বার্লিন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে অশনি সংকেত সেরা চলচ্চিত্র ক্যাটাগরীতে গোল্ডেন বিয়ার পুরস্কার পায়। উৎসবটিতে ছবিটির পরিচালক সত্যজিৎ রায় এবং তার সাথে ছবির শিল্পীরা আমন্ত্রিত হয়েছিলেন। সেই সময়ে জার্মানী তখনও বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়নি। ছবির নায়িকা বাংলাদেশী হওয়ায় ববিতাকে আটকে দেয়া হয়েছিলো এয়ারপোর্টে। তখন ববিতা একেবারে কেঁদেকেটে অস্থির। সত্যজিৎ জানালেন, আমার নায়িকা যেতে পারবে না এটা কোনভাবেই হয় না। অবশেষে আয়োজকদের সাথে বলে দেশটিতে ঢোকার অনুমতি পান ববিতা। সত্যিকারের ক্যাপ্টেন অব দ্য শিপ একেই বলে। এছাড়াও ছবিটি শিকাগো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা চলচ্চিত্র ক্যাটাগরীতে গোল্ডেন হুগো পুরস্কার এবং ভারতের শ্রেষ্ঠ বাংলা চলচ্চিত্র ও সেরা মিউজিকে পুরস্কার লাভ করেন সত্যজিৎ রায়।
বাংলাদেশ পাকিস্থান থেকে রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অবশেষে বিজয়লাভ করে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর। এর পরের বছর ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের আমন্ত্রণে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম ও শেষবারের মতো আসেন সত্যজিৎ রায় যার উপলক্ষ ছিল একুশে ফেব্রুয়ারী শহীদ দিবস (বর্তমান আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস) স্মরণে একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে অংশগ্রহণ করা। সেদিনের পল্টন ময়দানে প্রধান অতিথি হিসেবে রাখা ভাষণে বেশ আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি। ভাষনের পুরোটা সময় তিনি বাংলাভাষা ও বাংলাদেশের প্রতি তার ভালোবাসার প্রচন্ড বহিঃপ্রকাশ ঘটান। তিনি আরও জানান তিনি এদেশে বাপ-দাদার ভিটায় নিজের পাঁচ বছর বয়সে মায়ের সাথে একবার এসেছিলেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে তিনি ব্যাখ্যা করেছিলেন নতুন একটা ইতিহাসের দরজা খুলে যাওয়া হিসেবে।
ভাষণের এক পর্যায়ে সত্যজিৎ রায় প্রতিশ্রুতি দেন যে, তিনি আবার আসবেন এই দেশে। মিশবেন দেশের জনগণের সঙ্গে। ভাষণের শেষে সত্যজিৎ রায় জয়বাংলা বলে সমাপ্তি করেন। তবে নানা পরিস্থিতিতে সে ইচ্ছে আর বাস্তবে রুপ নেয়নি। সেই সংক্ষিপ্ত বাংলাদেশ যাত্রায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গেও দেখা করেছিলেন তিনি। একই ফ্রেমবন্দী হয়েছিলেন দুই জগতের দুই মহানায়ক।
এরপর একবার, ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশি কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেনের উপন্যাস হাঙর নদী গ্রেনেড নিয়ে চলচ্চিত্র করার আগ্রহের কথা জানিয়েছিলেন সত্যজিৎ রায় তাকে পাঠানো একটি চিঠির মাধ্যমে যখন উপন্যাসটি খসড়া আকারে গল্প হিসেবে আগে ছাপা হয় কলকাতার তরুণ সাহিত্যিকদের পত্রিকা টেরোড্যাকটিলে। এই চিঠিতে জানানোর পরও আশির দশকে এক সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ওপর চলচ্চিত্র করার কথা জানিয়েছিলেন সত্যজিৎ। তবে এটিও নানা রাজনৈতিক প্রতিক‚লতায় আলোর মুখ দেখেনি।
সমগ্র কর্মজীবনের স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৯২ সালে তিনি অর্জন করেন একাডেমি সম্মানসূচক পুরস্কারটি (অস্কার) । যদিও শরীর অসুস্থ থাকায় তিনি পুরস্কার মে উপস্থিত থাকতে পারেন নি। মৃত্যুশয্যায় ধারনকৃত তার অস্কারপ্রাপ্তির অনুভূতি ধারন করে পরবর্তীকালে অস্কার অনুষ্ঠানে দেখানো হয় যেটি ঘোষণা করেছিলেন অড্রে হেপবার্ন। অস্কার পুরস্কার প্রাপ্তির মাত্র তেইশ দিন পর ১৯৯২ সালের ২৩ শে এপ্রিল চলচ্চিত্র জগতের কিংবদন্তী সত্যজিৎ রায়, সবার প্রিয় মানিক’দা পার্থিব জীবন থেকে চির বিদায় নেন। তাঁর মৃত্যুর পর কলকাতার জীবনযাত্রা থেমে পড়ে। হাজার হাজার লোক শেষ শ্রদ্ধা জানাতে তাঁর বাড়িতে আসেন। মৃত্যুর এতবছর পরও তিনি যেন আগের মতই জীবন্ত, সকল চলচ্চিত্রপ্রেমী দর্শকদের মনে, বাঙ্গালীর মনে, বাংলাদেশীদের মনে… আজও।
লেখাটি বাংলানিউজ২৪.কম এ পূর্বপ্রকাশিত
লেখকের অনুমতি ছাড়া সাইটে ব্যবহৃত সকল প্রকার লেখা পুনঃপ্রকাশ বেআইনি। জরুরী যোগাযোগে ইমেইলঃ altamishnabil@gmail.com
