প্রদোষ চন্দ্র মিত্র, প্রদোষ সি মিটার, ফেলু মিত্তির কিংবা ফেলুদা! যে নামে তাকে ডাকুননা কেন, আর পাঁচটা বাঙালী যে রহস্যের সমাধান করতে পারেন না, সেটা একমাত্র পারেন সত্যজিৎ রায়ের ফেলুদা। জনপ্রিয় কাল্পনিক গোয়েন্দা চরিত্র প্রদোষ চন্দ্র মিত্রের ওরফে ফেলুদার প্রথম আবির্ভাব হয়েছিল আজকের বছর থেকে ৫০ বছর আগে ১৯৬৫-৬৬ সালের দিকে ছোটদের পত্রিকা সন্দেশে ‘ফেলুদার গোয়েন্দাগিরি’ নামক একটি ছোট গল্পের মাধ্যমে। সেসময়ে ফেলুদার বয়স প্রায় ২৭ বছর।
সাহিত্যপ্রেমী এমন কোন বাঙ্গালী খুঁজে পাওয়া দুষ্কর যে ফেলুদায় মজেনি। কি নেই ফেলুদা সিরিজে? শুধুকি গোয়েন্দাগিরি।! না, তাতো নয়। এতে আছে ভ্রমনের মজা, সঙ্গে ইতিহাস, সাহিত্য, সাংস্কৃতি, দর্শন.. আরো কত কি। ফেলুদার গল্পগুলো পাঠক কিংবা দর্শককে যেন থ্রি মাস্কেটিয়ার্স ফেলুদা-তোপসে-জটায়ু’র এক একটা অভিযানের অংশ বানিয়ে নেয়।
১৯৬৫ থেকে ১৯৯৭ পর্যন্ত এই সিরিজের মোট ৩৫টি সম্পূর্ণ ও চারটি অসম্পূর্ণ গল্প ও উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছে। গল্পের পাশাপাশি ফেলুদা চরিত্রটিকে নিয়ে তৈরি হয়েছে অনেক সিনেমা এবং টেলিভিশন ধারাবাহিক।
ফেলুদা প্রকাশের এই হাফ সেঞ্চুরী বর্ষে আমার ব্লগের পাঠকদের জন্য রইলো সেলুলয়েডে ফেলুদার জার্নির গল্প।
সোনার কেল্লা (১৯৭৪)
ফেলুদার স্রষ্টা স্বয়ং সত্যজিত পরিচালিত রহস্য রোমাঞ্চ চলচ্চিত্র’ সোনার কেল্লা’। ১৯৭১ সালে রচিত উপন্যাস থেকে নির্মিত চলচ্চিত্রটি মুক্তি পায় ১৯৭৪ সালে। ছবিটির শুটিং হয়েছিল রাজস্থানে।
সোনার কেল্লার কাহিনী গড়ে উঠেছে মুকুল নামে একটি জাতিস্মর বালককে ঘিরে যে কিনা মাত্র ছ’বছর বয়সেই তার পূর্বজন্মের স্মৃতিচারণ করতে থাকে যেখানে ভেসে আসে একটি সোনার কেল্লা। প্যারাসাইকোলজিষ্ট ডক্টর হেমাঙ্গ হাজরা মুকুলকে পরীক্ষা করে মুকুলের সঙ্গে পশ্চিম রাজস্থানে সোনার কেল্লার খোঁজে যেতে রাজি হন। ইতোমধ্যে মুকুলের বাবার সন্দেহ হয় যে ছেলে মুকুল বিপদে পড়েছে। তিনি ফেলুদাকে কাজ দেন তার ছেলের খোঁজ করতে।

সোনার কেল্লার সন্ধানে রাজস্থানে উটের পিঠে থ্রি মাস্কিটিয়ার্স
ছবিতে ফেলুদার চরিত্রে অভিনয় করেছিলো শক্তিমান অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, তোপসে ও জটায়ুর ভুমিকায় যথাক্রমে সিদ্ধার্থ চট্টোপাধ্যায় ও সন্তোষ দত্ত। ডাঃ হেমাঙ্গ হাজরার চরিত্রে অভিনয় করেন শৈলেন মুখার্জী ও মুকুলের দুষ্ট লোক দুটি হলো অজয় ব্যানার্জী ও কামু মুখার্জী। ছবিতে আরো দেখা যায় ফেলুদার গুরু সিধু জ্যাঠাকে যার ভূমিকায় অভিনয় করেন হরীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়।

মুকুল ও জাল ডক্টর হেমাঙ্গ হাজরা
ছবিটি পশ্চিমবঙ্গ সরকার কতৃক সেরা ছবি, সেরা পরিচালনা সহ তেহরান ইন্টারন্যাশন্যাল ফেস্টিভ্যাল অফ ফিল্মস ফর চিলড্রেন অ্যান্ড ইয়ঙ অ্যাডাল্টস-এ গোল্ডেন স্ট্যাচু অ্যাওয়ার্ড লাভ করে।
জয় বাবা ফেলুনাথ (১৯৭৯)
সত্যজিৎ রায় নির্মিত দ্বিতীয় ও শেষ ফেলুদা চলচ্চিত্র ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’। ছবির নামের মধ্যেই একটা ভক্তিভাব রয়েছে, তাইতো? হ্যা, পুরো ছবিটির দৃশ্যায়ন হয়েছে গঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত ভারতের উত্তরপ্রদেশের শহর বেনারসে (কাশী)।
মহালয়ায় বের হয়েছে জটায়ুর নতুন বই “করাল কুম্ভির”। তাই পূজোর ছুটিরে ফুরফুরে মেজাজে ফেলুদা-তোপসেকে নিয়ে লালমোহন গাঙ্গুলী ওরফে জটায়ু ঘুরতে আসে বেনারসে। কিন্তু কথায় আছে ঢেকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে। ফেলুদা ছুটিতে বেড়াতে এসেও জড়িয়ে পড়ে এখানকার সম্ভ্রান্ত ঘোষাল পরিবারের একটি দামী গণেশ চুরির ঘটনায়। গল্পের অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক মগনলাল মেঘরাজের উপস্থিতি। ফেলুদা সিরিজের উল্লেখিত খল চরিত্রগুলোর মধ্যে মগনলালকেই সবচেয়ে শক্তিশালী ও বিপদজনক বলে গন্য করা হয়।

‘হয় আমি এর বদলা নেব, নাহয় গোয়েন্দাগিরি ছেড়ে দেব’, বেনারসের ঘাটে সেই বিখ্যাত দৃশ্যের দৃশ্যধারন
আগের ছবিটির মত এ ছবিতেও ফেলুদার চরিত্রে অভিনয় করেছিলো শক্তিমান অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, তোপসে ও জটায়ুর ভুমিকায় যথাক্রমে সিদ্ধার্থ চট্টোপাধ্যায় ও সন্তোষ দত্ত। চলচ্চিত্রে মগনলাল মেঘরাজের ভূমিকায় দূর্দান্ত অভিনয় করেছিলেন শক্তিমান অভিনেতা উৎপল দত্ত। উইকিপিডিয়ার ভাষ্যমতে ১১২ মিনিটের এ ছবিটির নির্মানব্যায় ছিলো তৎকালীন ৬ লক্ষ রুপী যেখান থেকে আয় হয়েছিলো ৭ লক্ষ রুপি।

মছলি বাবার আশ্রমে শেষ দৃশ্য ধারনের আগে মেকআপ রুমে মজার একটু মুহুর্ত
বাক্স রহস্য-টিভি ফিল্ম (১৯৯৬)
সত্যজিৎ রায়ের পর ফেলুদা নির্মানের দ্বায়িত্ব তুলে নেয় তারই স্নেহধন্য পূত্র সন্দীপ রায়। ‘ফেলুদা ৩০’ নামে ডিডি বাংলার জন্য টেলিফিল্ম সিরিজ নির্মান শুরু হয় যার প্রথম পর্ব ‘বাক্স রহস্য’। অবশ্য পরে এই বাক্স রহস্য নন্দন কমপ্লেক্সে ফিচার ফিল্ম হিসেবে মুক্তি পায়।
ধনী ব্যবসায়ী দিননাথা লাহিড়ীর ট্রেনের কামরায় সুটকেস অদল-বদল হয়ে যায় যার মধ্যে ছিলো প্রাচীন ভ্রমনকাহিনী লেখক শম্ভুচরন বোসের তিব্বত ভ্রমনের উপর লিখিত একটি দূর্মুল্য ম্যানুস্ক্রিপ্ট। বাক্স অদল বদলের রহস্য উন্মোচনের দ্বায়িত্ব বর্তায় ফেলুদার ঘাড়ে। ছবির গল্প আবর্তিত হয় উত্তর ভারতের শিমলায়।
ছবিতে ফেলুদার ভূমিকায় প্রথমবার দেখা যায় সব্যসাচী চক্রবর্তীকে। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের অসাধারণ ফেলুদা চিত্রায়নের পরেও তাঁকে বাঙলি দর্শক ফেলুদা হিসাবে যথেষ্ট সমাদরের সাথে গ্রহণ করে । তোপসে ও জটায়ু চরিত্রে অভিনয় করেন শাশ্বত চট্টোপাধ্যায় ও রবি ঘোষ।

একসঙ্গে বাক্স রহস্য, বোম্বাইয়ের বোম্বেটে, কৈলাসে কেলেঙ্কারি আর রয়েল বেঙ্গল রহস্যের অফিসিয়াল পোষ্টার
প্রতিবারের ফেলুদায় জটায়ুর একটি নতুন বইয়ের উল্লেখ থাকে। এবারের পর্বে জটায়ুর লেখা নতুন বইয়ের নাম ‘বিদঘুটে বদমাশ’।
বোম্বাইয়ের বোম্বেটে (২০০৩)
সরাসরি বড় পর্দায় মুক্তির জন্য সন্দীপ রায়ের প্রথম ফেলুদা চলচ্চিত্রের নাম বোম্বাইয়ের বোম্বেটে। বাক্স রহস্য টেলিফিল্ম এবং ফেলুদার উপর টেলিফিল্ম সিরিজগুলোতে অভিনয় করার পর ফেলুদার ভূমিকায় এছবিতে অভিনয় করেন সব্যসাচী চক্রবর্তী। তোপসে আর জটায়ুর চরিত্রে পরপর কয়েক ছবির জন্য পাকাপোক্তভাবে নাম লেখান পরমব্রত চ্যাটার্জী ও বিভু ভট্টাচার্য।
নাম শুনেই বোঝা যাচ্ছে এছবির মূল লোকেশন মুম্বাই শহর। লালমোহন বাবুর (জটায়ু) গল্প নিয়ে বলিউডে তৈরি হবে একটি কমার্শিয়াল ছবি আর সেই ছবির শুটিং দেখতে ফেলুদা আর তোপসেকে নিয়ে জটায়ুর মুম্বাই গমন। গল্পে ছবির প্রযোজকের বাড়ি শিবাজী ক্যাসেলের লিফটের ভিতর সংঘটিত হয় একটি খুন আর হাতবদল হল কোলকাতা থেকে আনা জটায়ুর বইয়ের প্যাকেট। এভাবে জমাট বাধতে শুরু করে রহস্য। বোম্বাইয়ের বোম্বেটে’র খল চরিত্রে আশীষ বির্দার্থীর অভিনয় ছিলো দূর্দান্ত। ছবিটি প্রযোজনা করেছিলো ঊষা কিরণ মুভিজ। উইকিপিডিয়ার তথ্য অনুয়ায়ী ৮০ লক্ষ রুপির ছবিটি ব্যবসা করেছিলো ২ কোটি রুপি।
কৈলাসে কেলেঙ্কারি (২০০৭)
একদা সত্যজিৎ রায় আওরঙ্গবাদে ইলোরা গুহায় ভ্রমন করেছিলেন। ভ্রমনকালে সেখানকার কৈলাশ মন্দিরের সৌন্দর্যে তিনি এতটাই মজেছিলেন পরবর্তীকালে এটিকে উপজীব্য করে তিনি এই ছবির উপন্যাসটি লেখেন।
ফেলুদা, ভাই তোপসে এবং লেখক জটায়ুর সাহায্যে ভারতবর্ষ জুড়ে প্রাচীন ভাস্কর্যের চোরাচালান এবং অবৈধ ব্যবসার তদন্ত করে। ‘কৈলাসে কেলেঙ্কারি’ নামক রোমাঞ্চকর এ ছবিতে কৈলাস নামক স্থানের ঐতিহাসিক মূর্তি বিষয়ক বর্ণনা আছে। ছবিটি প্রযোজনা করে টি সরকার প্রোডাকশনস এন্ড ভিথ্রিজি ফিল্মস। ছবিতে খল চরিত্রে অভিনয় করেছে দীপঙ্কর দে।

কৈলাশ মন্দিরের সৌন্দর্যে সত্যজিৎ রায় এতটাই মজেছিলেন পরবর্তীকালে এটিকে উপজীব্য করে তিনি ‘কৈলাশে কেলেঙ্কারি’ উপন্যাসটি লেখেন
টিনটোরেটোর যীশু (২০০৮)
ছবির মূল গল্প ইটালীর রেনেসার যুগে আকা যীশু খ্রীষ্টের এক পেইনন্টিংকে ঘিরে যেটি একেছিলেন জ্যাকোবো টিনটোরেটো। পশ্চিমবঙ্গের বৈকুন্ঠপুরের ঐতিয্যবাহী এক বংশ নিয়োগী পরিবারের পূর্বপুরুষ চন্দ্রশেখর নিয়োগী পেয়েছিলেন এই পেয়েন্টিংটি। বহুমূল্যবান এই চিত্রের প্রতি অনেকের লোলুপ দৃষ্টি। বিভিন্নজন চিত্রকর্মটি চুরি করতে চায়, চুরির উদ্দ্যেশ্য নিয়েই নিয়োগী পরিবারে হাজির হয় নকল চন্দ্রশেখর পুত্র। এরপর চলতে থাকে ফেলুদার চিত্রকর্মটি রক্ষা করার লড়াই।

টিনটোরেটোর যীশুর একটি দৃশ্য
ছবিটির চিত্রায়ন হয় কোলকাতা, ছত্রিশগড় সহ চীনে দেশ হংকং-এ। এটিও প্রযোজনা করে টি সরকার প্রোডাকশনস এন্ড ভিথ্রিজি ফিল্মস।
গোরস্থানে সাবধান! (২০১০)
এ-ছবিতে পরিবর্তন হলো তোপসে। পরমব্রত চ্যাটার্জী এর স্থলাভিষিক্ত হলেন সাহেব ভট্টাচার্য। সোনালী পর্দার জন্য সন্দীপ রায় পরিচালিত চতুর্থ ফেলুদা চলচ্চিত্র এটি। বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন নন-চার্চ সেমিট্রি, সাউথ পার্ক স্ট্রিট সেমিট্রি’কে আবর্ত করে রহস্যে মোড়া কিছু ঘটনা নিয়ে নির্মিত হয়েছে ‘গোরস্থানে সাবধান’। যে রহস্যটি সূচনা হয়েছিল একটি মূল্যবান ঘড়ি নিয়ে।

সাউথ পার্ক স্ট্রিট সেমিট্রি’কে আবর্ত করে গড়ে উঠেছে ‘গোরস্থানে সাবধান’
অন্যান্য গল্পের মত এবারে আর ফেলুদাকে কোলকাতার বাইরে যেতে হয়নি, পুরো গল্পটি গড়ে উঠেছে কোলকাতা শহরকে ঘিরেই। ছবিতে খল চরিত্রে অভিনয় করেছেন সত্যজিৎ রায়ের ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ খ্যাত ধৃতিমান চট্টোপাধ্যায়। ছবিতে দেখা মিলবে কিছু মজার প্লানচেট দৃশ্যের।
রয়েল বেঙ্গল রহস্য (২০১১)
‘গোরস্থানে সাবধানের’ পরের এ ছবিটির নাম রয়েল বেঙ্গল রহস্য। ফেলুদা, ভাই তোপসে এবং জটায়ুর থ্রি মাস্কেটিয়ার্স বাহিনী একটি হেঁয়ালি (ধাঁধা) সমাধানের জন্য উত্তরবঙ্গের ধনী জমিদার মহিতোষ সিংহ রায় দ্বারা আমন্ত্রিত হয়। ধাঁধাটি ছিলোঃ
মুড়ো হয় বুড়ো গাছ
হাত গোন ভাত পাঁচ
দিক পাও ঠিক ঠিক জবাবে
ফাল্গুন তাল জোড়
দুই মাঝে ভুঁই ফোড়
সন্ধানে ধান্দায় নবাবে।
রহস্যময় সেই ধাঁধাটি যেন কোন এক গুপ্তধনের সন্ধান দেয়। কিন্তু ঘটনাক্রমে মানুষখেকো বাঘের উদয়, একটি রহস্যময় মৃত্যু এবং জঙ্গলের গুজব অপ্রত্যাশিত একটি মোড় নেয় কাহিনীর।

চলছে গুপ্তধনের সেই হেঁয়ালির সমাধান
ছবিটি যৌথভাবে প্রযোজনা করে কোলকাতার স্বনামধন্য প্রযোজনা সংস্থা শ্রী ভেঙ্কটেশ ফিল্মস ও সুরিন্দর ফিল্মস। ছবিটির ডাবিং চলাকালীন অবস্থায় পরলোকগমন করেন জটায়ুর চরিত্রে অভিনয় করা বিভু ভট্টাচার্জ। এতে অবশ্য ছবি মুক্তির কাজে কোন বাধা পায়নি।
বাদশাহী আংটি (২০১৪)
২০১১ সালে বিভু ভট্টাচার্যের মৃত্যুর পর ফেলুদার পরের পর্ব নির্মানে ভাটা পরে। ঐদিকে সব্যসাচী চক্রবর্তী ঘোষনা দেন তিনি আর ফেলুদা চরিত্রে অভিনয় করবেন না। তাই সন্দীপ রায় ফেলুদা ফিল্ম সিরিজকে রিব্যুট করার সিদ্ধান্ত নেন সত্যজিত রায়ের লেখা প্রথম দিককার গল্প ‘বাদশাহী আংটি’ দিয়ে।

‘বাদশাহি আংটি’ পর্বে নতুন ফেলুদা আর তোপসে
গল্প অনুসারেই এছবিতে প্রয়োজন হয়নি কোন জটায়ুর। বড় পর্দায় এটিই জটায়ুবিহীন প্রথম ফেলুদা।
ফেলুদা সিরিজের নতুন এই পর্বে ফেলুদা চরিত্রে প্রথম অভিনয় করেন ইতিমধ্যে অঞ্জন দত্তের ব্যোমকেশ বক্সী ফিল্ম সিরিজ করে জনপ্রিয় হওয়া
অভিনেতা আবীর চট্টোপাধ্যায়। তোপসে হিসেবে দেখা যায় সৌরভ দাস নামের এক নবাগতকে। এ ছবির গুরুত্বপূর্ন চরিত্রগুলোতে অভিনয় করেন পরান বন্দোপাধ্যায়, রজতাভ দত্ত ও দীপংকর দে। লক্ষ্ণৌ শহরে গড়ে ওঠা এ ছবির কাহিনী সম্রাট আওরঙ্গজেবের একটি দুর্মুল্য আংটি চুরির ঘটনাকে ঘিরে। ছবিতে ঘুলঘুলিয়া (ভুলভুলাইয়া), রেসিডেন্সি সহ লক্ষ্ণৌ শহরের আরো বেশকিছু জিনিসের উল্লেখ রয়েছে। এ ছবিটিও যৌথভাবে প্রযোজনা করেছে শ্রী ভেঙ্কটেশ ফিল্মস ও সুরিন্দর ফিল্মস।

নির্মাতা সন্দীপ রায়
ডাবল ফেলুদা (২০১৬/১৭)
নতুন ফেলুদা আবীর চ্যাটার্জী এবারে অরিন্দম শীলের পরিচালনায় শ্রী ভেঙ্কটেশের ব্যানারে শুরু করলেন ব্যোমকেশে অভিনয়। সন্দীপ রায় আবার মুম্বাইভিত্তিক প্রযোজনা সংস্থা ‘ইরোস ইন্টারন্যাশনালের’ ব্যানারে তার নতুন ফেলুদার পর্ব শুরু করতে মনস্থির করলেন। ওদিকে চুক্তি অনুযায়ী আবীরের আবার ভেঙ্কটেশ কিংবা সুরিন্দরের বাইরে ছবি করতে মানা। সবমিলিয়ে আবারো ফেলুদা সংকটে পড়া হলো।
২০১৬ সালটা ফেলুদা সিরিজের ৫০ বছর পূর্তি। ফেলু মিত্তিরের চরিত্র থিতু হওয়া সব্যসাচী চক্রবর্তী দর্শকসারি থেকে নেমে এলেন ফেলুদা রুপে। হ্যা, ডাবল ফেলুদা নামে নির্মিতব্য নতুন ফেলুদা সিরিজের ছবিটিতে ফেলুদা তোপসে রুপে দেখা যাবে রয়েল বেঙ্গল রহস্যের সেই জুটিকেই (সব্যসাচী-সাহেব)। সৌমিত্র চাটার্জীর পর ফেলু চরিত্রে অভিনয় করে তুমুল জনপ্রিয়তা পান সব্যসাচী। কিন্তু এই বয়সে তাকে দিয়ে ফেলুদা করানো ঠিক জুতসই লাগছিল না। তাই পরিচিত-অপরিচিত অনেককেই প্রস্তাব দেওয়া হয়। এমনকী ক্রিকেট সুপারস্টার সৌরভ গাঙ্গুলীকেও দেওয়া হয়েছিল প্রস্তাব। কিন্তু কেউ এই চরিত্রের চ্যালেঞ্জ নিতে সাহস করেননি। তাই শেষ পর্যন্ত সব্যসাচী চক্রবর্তীকেই ফেলুদা হিসেবে নির্বাচিত করা হলো।

ডাবল ফেলুদা’র পোষ্টার
‘সমাদ্দারের চাবি’ আর ‘গোলকধাম রহস্য’ এই দুটি গল্পকে একসাথে করেই বানানো হবে ‘ডাবল ফেলুদা’। গত ছবি বাদশাহি আংটি বানানো হয়েছিল জটায়ুকে ছাড়া। আর এই দুই ছবিতেও জটায়ুকে এড়িয়েই চলছেন পরিচালক। একটি ছবিতে বলা হবে, জটায়ু এখন পুজোর নভেল লেখা নিয়ে খুব ব্যস্ত, তাই থ্রি মাস্কেটিয়ার্স একসঙ্গে নেই। অর্থাৎ, জটায়ুর প্রসঙ্গ আছে, তবে জটায়ু নেই। ১৬ ডিসেম্বরে ভারতজুড়ে মুক্তি পায় ছবিটি।
ছোটপর্দা ও অন্যান্য
এছাড়া বড়পর্দায় বাইরেও আমরা ফেলুদাকে দেখেছি ফেলুদা ৩০, সত্যজিতের গপ্পো কিংবা সত্যজিতের প্রিয় গল্প শিরোনামের কিছু টিভি সিরিয়ালে। ডিডি বাংলা ও ইটিভি বাংলায় এগুলো সম্প্রচারিত হয় ১৯৯৬ থেকে ২০০০ সাল এর সময়কালে। এগুলো পরিচালনা করেছেন সন্দীপ রায়। সন্দীপ রায়ের বাংলায় ফেলুদা সিরিজ শুরুর আগে ১৯৯২ সালে ডিডি বাংলার জন্য দুটি ফেলুদা টেলিফিল্ম নির্মান করেন বিভাষ চক্রবর্তী। সব্যসাচী ও শ্বাশ্বতের ফেলুদা-তোপসের ভূমিকায় অভিনয়ের পাশাপাশি সিরিজগুলোতে জটায়ুর ভূমিকায় দেখা যায় রবিঘোষ, অনুপ কুমার এবং তাদের মৃত্যুর পর বিভু ভট্টাচার্যকে।
১৯৮৬ সালে ডি ডি বাংলায় মুক্তি পায় “ যত কান্ড কাঠমুন্ডুতে” এর হিন্দী সংস্করন “কিসসা কাঠকান্ডু কা”! এতে জটায়ু হিসেবে কাজ করার জন্য ডাক্তার মোহন আগাসে কে অনুমতি দেন সত্যজিত রায়। ফেলুদা চরিত্রে অভিনয় করতে দেখা যায় বলিউডের সুপারস্টার শশী কাপুর। এছবিটিও পরিচালনা করেন সন্দীপ রায়।

কিসসা কাঠকান্ডু কা” ছবিতে ফেলুদা চরিত্রে অভিনয় করতে দেখা যায় বলিউডের সুপারস্টার শশী কাপুরকে।
২০১০ সালে ডিকিউই প্রোডাকশনস “ফেলুদা দ্য কাঠমান্ডু কেপার” নামের একটি অ্যানিমেশন ছবি তৈরি করে। এই সকল প্রকার স্বত্ত্ব ডিজনি চ্যানেল ভারতের কাছে রয়েছে। প্রায়শই ভারতীয় টেলিভিশনে ছবিটি প্রচার হয়।
এরপর ডিকিউই ডিজনি ভারত চ্যানেলের জন্য ১৩ পর্বের অ্যানিমেটেড সিরিজ নির্মান শুরু করে যার নাম দেয়া হয় ‘মিষ্ট্রিস অ্যান্ড ফেলুদা’। সিরিজটি সত্যজিৎ রায়ের মূল গল্প থেকে আলাদা ছিলো এবং এতে ফেলুদা-তোপসে-জটায়ুকে বিভিন্ন গ্যাজেট ব্যাবহার করতে দেখা গিয়েছিলো। শিল্প-সাহিত্য সমালোচকদের নিন্দার মুখে ২০১১ সালে সিরিজটি বাতিল করা হয়।

অ্যানিমেটেড ফেলুদা
শুধু কি বড় আর ছোটপর্দা, থিয়েটার পাড়ায়ও মাতিয়েছেন ফেলুদা। ‘অপ্সরা থিয়েটারের মামলা’ গল্পে মঞ্চ নাটক সংস্করনের প্রায় একশো শো হয়ে গিয়েছে যেখানে ফেলুদার চরিত্রে যথারীতি অভিনয় করেছেন সব্যসাচী চক্রবর্তী।

অপ্সরা থিয়েটার মামলা’ মঞ্চ নাটকের একটি দৃশ্যে মঞ্চের ফেলুদা, তোপসে, জটায়ু
চলতি বছরই পরিচালক সুজিত সরকার হিন্দিতে সোনার কেল্লা বানানোর ইচ্ছে প্রকাশ করেছিলেন। তবে তিনি জানিয়েছিলেন, এ সংক্রান্ত কপিরাইট তাঁর হাতে আসেনি। এর দিন দু’য়েকের মধ্যে কপিরাইট এল। কিন্তু সেটা তাঁর কাছে নয়, বলিউড ছবি পরীনিতা, মারদানির পরিচালক প্রদীপ সরকারের কাছে। হিন্দী ভাষায় সোনার কেল্লার অনুকরনে নির্মিত হবে নতুন ছবিটি যেখানে ভিন্ন নামে দেখানো হবে ফেলুদা-তোপসে-জটায়ুর এর চরিত্র।
তবে হিন্দী নয়, ফেলুদা ভক্ত হিসেবে আমি তাকিয়ে আছি ডাবল ফেলুদার দিকে প্রদোষ মিত্র রুপে মগজাস্ত্র প্রয়োগ করতে ফিরছেন সব্যসাচী চক্রবর্তী।
সাহিত্যে প্রতিটি চরিত্র সৃষ্টির পেছনে বাস্তব কিছু চরিত্রের প্রভাব থাকে। বুদ্ধিদীপ্ত চেহারা ও বুকভর্তি দুর্দান্ত সাহস নিয়ে মগজাস্ত্র চালানোয় দক্ষ ফেলুদার এ চরিত্রটি সত্যজিৎ রায় কাকে দেখে সৃষ্টি করেছিলেন। শোনা যায়, আর কেউ নয় সত্যজিৎ আয়নায় দাড়ালে যাকে দেখতে পেতেন তার থেকেই নাকি এসেছে ফেলুদার চরিত্র। ফেলুদার ৫০ বছর পূর্তিতে তাই, মহারাজা.. তোমায় সেলাম।

মহারাজা.. তোমায় সেলাম

