তোরা যে যাই বলিস ভাই, আমার সোনার হরিণ চাই।
রবীবাবুর এই গানের সাথে তো আমরা অনেকেই গলা মিলিয়েছি। আদতে সোনার হরিণের দেখা মিলেছে কি?
তবে এবারে আমি গল্প শুনাবো হরিণের অভয়ারন্য বাংলাদেশের দক্ষিণের এক নিভৃত চর ‘’নিঝুম দ্বীপ’’ অভিযানের।
ভ্রমন ওয়েবসাইট আর ব্লগের কল্যানে জানা হয়েছিলো ৩৬৯৭০.৪৫৪ হেক্টর আয়তনবিশিষ্ট নিঝুম দ্বীপে বর্তমানে হরিণের সংখ্যা প্রায় ৪০হাজার। তাই লোভ সংবরন না করতে পেরে সংকল্পচিত্তে রওনা হলাম সেই দ্বীপের উদ্দেশ্যে। আমরা দলে মোট তিনজন। আমি, ফটোগ্রাফার পাভেল আশফাক ভাই, এবং ট্যুরের যাবতীয় হিসাবরক্ষন মানি ব্যাংক ইকবাল হোসাইন। আমার ভাগে পড়লো সমস্ত প্লানিং এর কাজ।
নিঝুম দ্বীপ সম্পর্কিত আরো কিছু তথ্য জানিয়ে রাখি। এটিকে দ্বীপ বলা হলেও এটি মূলত একটি চর যার পূর্বনাম ছিলো চর-ওসমান। ওসমান নামের একজন বাথানিয়া তার মহিষের বাথান নিয়ে নিঝুম দ্বীপে বসবাস শুরু করন, চর ওসমানে নামটির উৎপত্তি এথেকেই। পরে হাতিয়ার তৎকালীন সাংসাদ আমিরুল ইসলাম কালাম এই দ্বীপের নাম বদলে নিঝুম দ্বীপ রাখেন। মূলত বল্লারচর, চর ওসমান, কামলার চর ও চর মুরি- এই চারটি চর মিলিয়ে নিঝুম দ্বীপ।
দুই উপায়েই নিঝুম দ্বীপ যাওয়া যায়। চিন্তা ছিলো আপ-ডাউনে সেই দুই পথই ব্যবহার করে দেখার। ঢাকা থেকে যাওয়ার সময় বেছে নিলাম নৌপথকে। নিঝুম দ্বীপে নৌপথে যাওয়ার উপায় জানিয়ে দেই। ঢাকার সদরঘাট থেকে প্রথমেই আপনাকে লঞ্চে যেতে হবে হাতিয়ার তমরুদি। এ পথে দুটি লঞ্চ নিয়মিত চলাচল করে। এমভি পানামা এবং এমভি টিপু । ভাড়া ডাবল বেড কেবিন ২২০০ টাকা, সিঙ্গেল বেড কেবিনে ১২০০ টাকা। রুমে বেডের অতিরিক্ত যাত্রী যেতে হলে আপনাকে জনপ্রতি ৩৫০ টাকা ডেকের ভাড়া গুনতে হবে। এসব লঞ্চ ঢাকা থেকে রওনা হয় বিকেল সাড়ে ৫ টায় আর তমরুদি থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে ছাড়ে দুপুর সাড়ে বারোটায়।
ইচ্ছাকৃতভাবেই এক বেডের রুমে তিনজন উঠেছিলাম, সারারাত ঘুম আর হলোনা। হলো শুধু আড্ডা। সকাল হতেই লঞ্চটি ‘মনপুরা’ ঘাটে ভিড়লো। গিয়াসউদ্দীন সেলিমের সেই বিখ্যাত মনপুরা। এই দ্বীপে সারলাম সকালের নাস্তা। আর পাশ্ববর্তী দোকানে মোবাইল, ক্যামেরার চার্জও করিয়ে নিলাম। কারন সকাল গড়াতেই লঞ্চের পাওয়ার কানেকশন বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয়।
এরপর আধঘন্টার মধ্যেই পৌছালাম হাতিয়ার তমরুদ্দী ঘাটে।
এখান থেকে আমাদের যেতে হবে বন্দরটিলা ঘাটের এপারে। যাওয়ার জন্য বরাদ্দ স্কুটার আর হোন্ডা (প্রতি হোন্ডায় দুইজন যাত্রী) এর মাঝে বেছে নিলাম হোন্ডাকেই। ১২০সিসির সেই হোন্ডায় করে হেলতে দুলতে কোমরের বারোটা বাজিয়ে দুই ঘন্টায় পৌছালাম বন্দরটিলা ঘাটে। নাহ, স্কুটারই বোধহয় ভালো ছিলো। শেষে খেয়া নৌকাতে ১৫ মিনিটের ছোট্ট চ্যানেল পাড়ি দিয়ে আমরা পৌছলাম বন্দরটিলা ঘাটের ওপারে। এখান থেকেই শুরু নিঝুম দ্বীপ। ঘাটের দুই পাড়েই নৌকায় চড়তে-নামতে আপনাকে কাঁদায় নামতেই হবে, এছাড়া উপায় নেই। সে এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা।
নিঝুম দ্বীপে দুটি প্রধান বাজার (নামার বাজার, বন্দরটিলা) বাজারের দুটিতেই থাকার হোটেল রয়েছে। আমরা উঠলাম বন্দরটিলা বাজারের বন্দরটিলা সাইক্লোন সেন্টার রিসোর্টে। শুক্রবার জুম্মা’র ওয়াক্ত হওয়ায় হোটেল থেকে ফ্রেশ হয়েই নামায শেষ করে হোটেলে দুপুরের খাবার খেতে চলে গেলাম। নিঝুম দ্বীপে খাবার হোটেলের মধ্যে একমাত্র মানসম্পন্ন হোটেল বলতে গেলে হোটেল সী-বার্ডই। এখানের নিঝুম দ্বীপ স্পেশাল ফিশ চেওয়া মাছের শুটকি, কড়া করে ভাজা ছোট চিংড়ি, হাসের মাংশ বেশ সুস্বাদু।
ট্যুর শিড্যিউল খুব টাইট হওয়ার দরুন আমাদের দ্বীপ ঘুরে দেখার জন্য শুধুমাত্র আজকের বিকাল আর আগামীকাল সকালই বেঁচে থাকলো। দেরী না করেই বেরিয়ে পড়লাম দ্বীপ ঘুরে দেখার উদ্দেশ্যে।
এ দ্বীপে আপনাকে নিয়ে ঘুরে বেড়ানোর জন্য সাথে পাবেন কিছু পিচ্চি গাইডকে। শখানেক টাকা বকশিশে আপনাকে তারা ঘুরে দেখাবে সারা দ্বীপ। আব্দুর রব নামের সেই পিচ্চিকে সাথে নিয়ে বউবাজারের ডানিডা এনজিওর নির্মানাধীন বানানো নতুন মাটির রাস্তা ধরে আমরা সোজা ঢুকে গেলাম কেরফা বাগানে (নিঝুম দ্বীপের কেওড়া বনকে স্থানীয়রা কেরফা বাগান বলে)।
বনের প্রধান আকর্ষন চিত্রা হরিণ দেখতে ঢুকতে লাগলাম বনের গহিনে। এ বনে বাঘ নেই। তবে একমাত্র ডেঞ্জার বন্য কুকুর থেকে বাঁচতে প্রত্যেকে একটা করে পেল্লাই সাইজের কেওড়ার শ্বাসমূল ভেঙ্গে নিলাম।
বনের ভূমি জুড়ে শুধু শ্বাসমূলের ছড়াছড়ি। তাই কেডস কিংবা কনভার্স জাতীয় কিছু পড়ে যাওয়াই উত্তম। দুই মিনিটেই নাহয় স্যান্ডেল ছিন্নভিন্ন হয়ে কই যে পড়ে থাকবে টেরই পাবেননা। বনের মাঝে থেকে থেকে চলতে লাগলো পাভেল ভাই’র ক্যামেরার ক্লিক ক্লিক। এ দ্বীপে প্রায় ৩৫ প্রজাতির পাখি রয়েছে। অন্যান্য পাখির পাশাপাশি লম্বা ঠোটের ক্ষুদ্রকায় এক অদ্ভুত প্রজাতির পাখি ইন্ডিয়ান স্কিমারের (দেশী গাঙ্গচষা) অন্যতম প্রধান বিচরনক্ষেত্র এটি।
বনের ভেতর প্রায় কিলো দশেক এগুতে পার হয়ে গেলো দুই ঘন্টা। আমাদের মন্দভাগ্য, আমাদের দলের মাঝে আরো কয়েকটা নতুন দল ঢুকে পড়ায় চিৎকার চ্যাচামেচিতে সব হরিণ গেলো ভেগে। মাটিতে হরিণের পায়ের ছাপ দেখতে পেলাম অজস্র, কিন্তু সন্ধ্যে নামার আগপর্যন্ত কেবলমাত্র খান দুয়েক হরিণের সাক্ষাতই পেলাম। তাও সেই বহুদূর থেকে। আফসোস !!
হোটেলে ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যে নামলো। সোলার-ডিজেল মিলিয়ে বড়জোর রাত ৯টা পর্যন্ত বিদ্যুত পাবেন এ দ্বীপে। রাতে কুপের বাতির আলোয় চেওয়া মাছের শুটকি দিয়ে শেয়ালের ডাক শুনতে শুনতে খাবার খাওয়া। নাহ, জীবনটা কিছুদিনের জন্য এমন ভয়ঙ্কর সুন্দর হলে মন্দ হয়না।
পরদিন সকালে ঢু মারলাম এ দ্বীপের সবচেয়ে বড় নামার বাজারে। ফিরতে ফিরতে আরেকবার কেরফা বাগানে ঢু মেরেছিলাম বটে, তবে এবারেও বিফল আমরা। সোনার হরিণ অধরাই রয়ে গেলো। নামার বাজার সংলগ্ন সি বিচটা ঘুরে দেখতে বেশ লাগলো।
ফিরতিপথে সড়কপথ ব্যবহার করে দেখার সিদ্ধান্ত হলো।
ছোট চ্যানেল পাড়ি দিয়ে ওসখালী হয়ে আমরা থামলাম নলচিড়া ঘাটে। সেখান থেকে ঘন্টা দুয়েকে সি ট্রাকে মেঘনা পাড়ি দিয়ে চলে এলাম চেয়ারম্যান ঘাটে। সি ট্রাক প্রতিদিন দু-বার ছেড়ে যায়। সেক্ষেত্রে আগে-ভাগে এর সময়সূচী জেনে যাওয়া ভালো।
চেয়ারম্যানঘাট থেকে টেম্পুতে সোনাপুর এসে ঢাকাগামী বাসে রাত ১২টায় পৌছে গেলাম রাজধানীতে।
পর্যটনে সম্ভাবনাময় এ দ্বীপ নিয়ে কিছু উপলব্ধির কথা না বললেই নয়। আপনি নিঝুম দ্বীপে যে রাস্তা দিয়ে চলাচল করে অনত্র যাবেন সেই রাস্তা একসময় বনই ছিলো। দ্বীপে ক্রমবর্ধনমান জনগোষ্ঠীর জ্বালানী চাহিদা মেটাতে আশংকাজনক হারে কেটে ফেলা হচ্ছে গাছপালা। এভাবে চলতে থাকলে বছর পাঁচেক পরে এ দ্বীপে আদৌ কোন বনাঞ্চল টিকে থাকবে কিনা মনে বিস্তর সন্দেহ জাগে। আর বন না থাকলে হরিণ বাস করবে কোথায়! শুধুমাত্র আইন প্রনয়ন নয়, প্রশাসনের উচিৎ এ অল্পশিক্ষিত জনগোষ্ঠীর জ্বালানী চাহিদা পূরণের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা বাতলে দেয়া। এদেরকে এসব ব্যাপারে সচেতন করা। আইন দিয়ে নয়, পরিপূর্ন শিক্ষা দিয়ে। নাহয় কোনদিনও বনাঞ্চল উজাড় থামবেনা। হাতিয়া কিংবা মনপুরার জাগলার চরের মত এ দ্বীপে ডাকাতের প্রকোপ নেই। এটা একদিকে স্বস্তির বিষয়।
পর্যটনশিল্প বিকাশ নিয়ে ব্লগাররা হাজারো আর্টিকেল লিখে যাচ্ছে দিনের পর দিন। অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয়রা প্রতি বছর এদেশের নতুন নতুন দর্শনীয় স্থান আবিস্কার করছে বটে কিন্তু দূর্গম যাতায়তব্যবস্থার কারনে স্থানগুলো সাধারন পর্যটকদের নাগালের বাইরেই থেকে যাচ্ছে। শুধু কক্সবাজার কিংবা সিলেট নয়, নিঝুম দ্বীপের মত এসব স্থানগুলোও সত্যিকারের পৃষ্ঠপোষকতা পেলে প্রতিবছর থাইল্যান্ডের পাতায়া কিংবা শ্রীলংকাগামী পর্যটকরা আমাদের দেশে এসে ভিড় জমাবে। গ্যারান্টি দিলাম।
ছবি কৃতজ্ঞতাঃ ট্যুরমেইট ”পাভেল আশফাক” ভাই
লেখকের অনুমতি ছাড়া সাইটে ব্যবহৃত সকল প্রকার লেখা পুনঃপ্রকাশ বেআইনি। জরুরী যোগাযোগে ইমেইলঃ altamishnabil@gmail.com












