ঈদের ছুটিতে কিছু ক্লাসিক বাংলাদেশী ছবি..

ঈদ মানেই আনন্দ, সঙ্গে কর্মব্যস্ততা থেকে কিছুটা অবসর। এই সময়টাকে বিনোদনমুখর করতে দেখে নিতে পারেন নিচের পাঁচটি বাংলাদেশী ক্লাসিক চলচ্চিত্র। ছবিগুলো সহজেই খুঁজে পাবেন ডিভিডি কিংবা ইউটিউবে। লিখেছেন মুহাম্মাদ আলতামিশ নাবিল।

১৩ নম্বর ফেকু ওস্তাগার লেন (১৯৬৬)

“এখানে খাবেদাবে আর ওদের সাথে ঝগড়া করবে”!  বলছিলাম বাংলাদেশের স্বাধীনতা পূর্ব তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে মুক্তিপ্রাপ্ত রম্য চলচ্চিত্র ১৩ নম্বর ফেকু ওস্তাগার লেনের একটি সংলাপ। সুমিতা দেবী, সিরাজুল ইসলাম, কামাল আহমেদ, আনোয়ারা, সুজাতা, ওয়াহিদা রহমান, বেবী জামান, রাজ্জাক, খান জয়নুল এর মত বাঘা সব অভিনেতাদের নিয়ে নির্মিত ছবিটি পরিচালনা করেছেন বশীর হোসেন। ছবিটিতে অভিনয়ের পাশাপাশি এর কাহিনী-সংলাপ লিখেছেন সে-সময়ের বিখ্যাত কৌতূকাভিনেতা খান জয়নুল।

ছবির কাহিনী আবর্তিত হয় দুটো পরিবারকে ঘিরে যারা বাড়িওয়ালা এবং ভাড়াটিয়া দম্পতি। নিত্যদিন একে অপরের সাথে ঝগড়া করাই যেন এই দুই পরিবারের কাজ। তার একটা উদাহরন দেয়া যাক। ছবির শুরুতে দেখা যায়, মাটির কলসিতে পানি নিয়ে ভাড়াটিয়ার কাজের ছেলে নিম্নমস্তকে বাড়িওয়ালার বাড়ির সামনে দিয়ে যাচ্ছে ওমনি বাড়িওয়ালী বলে উঠল, এই বজ্জাত দাঁড়া, আমাকে ভেঙচি কাটলি কেনো! এমন সব গায়ে পড়ে ঝগড়া-লড়াইয়ের ঘটনাই পুরো ছবি জুড়ে চলতে থাকে। আর ছবির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত যে বিবাদ কেউ মেটাতে পারেনি, ঐ দুই পরিবারের এই বাড়িতে অনুষ্ঠেয় দুটো ভিন্ন ভিন্ন বিয়েতে আসা নিমন্ত্রিত অতিথিরা এসে তা মিটিয়ে দেন।

হাস্যরস সমৃদ্ধ ছবিতে নেই কোন ভাঁড়ামি। ছবিটি দেখতে দেখতে দুই পরিবারের সব পরিবারের সদস্যদের ঝগড়াঝাঁটির মাঝে দর্শক যেন নিজেদেরকেই খুঁজে পাবে।

তিতাস একটি নদীর নাম (১৯৭৩)

ব্রিটিশ ফিল্ম ইন্সটিটিউট-এর জরিপ  করা সেরা ১০ বাংলাদেশী চলচ্চিত্রের তালিকার এক নম্বর ছবি এটি। ছবিটি পরিচালনা করেছেন ওপার বাংলার কিংবদন্তি পরিচালক ঋত্বিক ঘটক যার জন্ম পুরান ঢাকার ঋষিকেশ দাস লেনে। ১৯৪৭ এর ভারত বিভাগের পরে তাঁর পরিবার কলকাতায় চলে যায়। বাংলাদেশ ছেড়ে গেলেও দেশভাগের বেদনা কখনো ভুলতে পারেননি তিনি। তাই তার সবগুলো সৃষ্টিকর্মেই দেখা গিয়েছে এসেছে দুই বাংলা আলাদা হওয়ায় বাস্তুহারা মানুষের অসহনীয় কষ্টের দৃশ্য।

Titas ekti nodir naam

বাঙালি ঔপন্যাসিক অদ্বৈত মল্লবর্মণ রচিত বিখ্যাত উপন্যাস তিতাস একটি নদীর নাম অবলম্বনে একই নামে চলচ্চিত্র উপযোগী করে নির্মিত হয়েছে আলোচিত এ ছবিটি। এতে অভিনয় করেছেন ফকরুল হাসান বৈরাগী, নারায়ণ চক্রবর্তী, কবরী চৌধুরী, রওশন জামিল, প্রবীর মিত্র, গোলাম মুস্তাফা, রোজী সামাদ ও রানী সরকার সহ অনেকে। ছবির গল্পে দেখা যায়, কাছের একটি গ্রামে গিয়ে কিশোর নামের এক জেলের নাটকীয়ভাবে এক তরুণী মেয়ের সঙ্গে বিয়ে হয়ে যায়। বিয়ের রাতে নৌকা থেকে কিশোরের তরুণী বউকে ডাকাতরা তুলে নিয়ে যায়। কোন এক সময়ে সুযোগ বুঝে তরুণীটি ডাকাতদলের নৌকা থেকে ঝাঁপ দিয়ে নিজেকে বাঁচায় এবং কাছের একটি গ্রামে গিয়ে আশ্রয় নেয়। তবে স্বামীর সম্পর্কে কিছুই না জানা তরুণীটি কেবলমাত্র তার স্বামীর গ্রামের নাম বলতে পারে। পরের বছর কিশোরীটির গর্ভে জন্ম নেয় তাদের সন্তান। বছর দশেক পর স্বামী সন্ধানে মেয়েটি তার সন্তানকে নিয়ে তার স্বামীর গ্রামে পাড়ি জমায় তাকে খুঁজতে। সেখানে মেয়েটির সাথে পরিচয় হয় বাসন্তী নামে এক বিধবার সাথে। এভাবেই গল্প এগিয়ে যায়। ছবিতে পরিচালক ঋত্বিক ঘটককেও মাঝি চরিত্রে অভিনয় করতে দেখা যায়। বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসের সাক্ষী হতে হলে আপনাকে অবশ্যই দেখতে হবে হাবিবুর রহমান খান প্রযোজিত এই ছবিটি।

সীমানা পেরিয়ে (১৯৭৭)

বিখ্যাত চলচ্চিত্রকার আলমগীর কবিরের নাম আপনারা অনেকেই শুনে থাকবেন । প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণের মাধ্যমে যার পরিচালক হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু। স্বাধীনতার পরে তিনি পূর্র্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরু করেন। ১৯৭৭ সালে নির্মিত ‘সীমানা পেরিয়ে’ আলমগীর কবির নির্মিত অন্যতম সেরা চলচ্চিত্র। ১৯৭০ সালে এদেশে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ জলোচ্ছাসের পর বরিশালের একটি চরে একজোড়া মানব মানবীকে আদিম পরিস্থিতিতে কোন রকমে বেঁচে থাকতে দেখা গিয়েছিলো। এ ঘটনাটি উক্ত চলচ্চিত্রের উপজীব্য বিষয়। তবে আর্ট ঘরানার সফল এ পরিচালক নিজেই ছবিটি সর্ম্পকে জানিয়েছেন, ব্যবসায়ী পুঁজির চাপে ছবিটির বক্তব্য ও গতি কিছুটা ছিন্নভিন্ন। ছবিটির মূল ভূমিকায় অভিনয় করেছেন বুলবুল আহমেদ ও জয়শ্রী কবির। ছবিটির সাথে সম্বন্ধযুক্ত একটি তথ্য দিয়ে রাখি।

shimana-periye

সত্যজিত রায়ের ছবি প্রতিদ্বন্দ্বী দিয়ে ক্যারিয়ার শুরু করা অভিনেত্রী জয়শ্রী রায় (পূর্বতন নাম) সূর্যকন্যা নামের ছবিতে অভিনয়ের জন্য এদেশে আসেন এবং পরে পরিচালক আলমগীর কবিরের সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধে এদেশে থেকে যান। ভূপেন হাজারিকা এবং আবিদা সুলতানার কন্ঠে গাওয়া ছবিটির গান বিমূর্ত এই রাত্রি আমার কিংবা মেঘ থম থম করে গানগুলো এখনো আগের মতই জনপ্রিয়। ব্রিটিশ ফিল্ম ইন্সটিটিউট-এর ‘বাংলাদেশের সেরা ১০ চলচ্চিত্র’ তালিকায় স্থান পেয়েছে ‘সীমানা পেরিয়ে’।

গোলাপী এখন ট্রেনে (১৯৭৮)

আমজাদ হোসেনের নিজের লেখা উপন্যাস ‘দ্রোপদী এখন ট্রেনে’র চলচ্চিত্ররূপ গোলাপী এখন ট্রেনে। ববিতা, ফারুক, রোজী সামাদ, আনোয়ার হোসেন, আনোয়ারা, এ. টি. এম. শামসুজ্জামান, রওশন জামিল, টেলি সামাদ, তারানা হালিম, আব্দুল্লাহ আল মামুন প্রমুখ অভিনয় করেছে এই ছবিটিতে। ছবির গল্পে তাকালে দেখা যায়, গাঁয়ের প্রভাবশালী ব্যক্তি মণ্ডলের ছেলে মিলন পছন্দ করে দরিদ্র গায়েনের মেয়ে গোলাপীকে। একদিন মণ্ডলই গোলাপীর বিয়ের জন্য খোঁজ দেয় এক পাত্রের। কিন্তু বিয়েতে সাইকেল দিতে হবে। নিজের মনকে বশ করে গোপনে সাইকেলের টাকাটা দেয় মিলন। তবে শেষ পর্যন্ত ভেঙে যায় বিয়েটা। এ কারণে আত্মহত্যা করে গোলাপীর বাবা। দারুণ অভাবের মধ্যে পড়ে সংসার। এর হাল ধরতেই ট্রেনে চড়ে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে ঘুরে কাজ করে গোলাপী।

Golapi Ekhon Train E

গাঁয়ের মোড়লরা ভালো চোখে দেখে না গোলাপীর এ কাজ। যারা ট্রেনে কাজ করে গ্রাম থেকে তাদের বের করে দেওয়ার জন্য বসে সালিস। ১৯৭৮ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ছবিটিতে দর্শক ও বোদ্ধামহল উভয়েরই সুনাম কুড়িয়েছে। আলাউদ্দিন আলীর সঙ্গীত পরিচালনায় আছেন আমার মোক্তার এবং হায়রে কপাল মন্দ গানদুটো দর্শক-শ্রোতাদের মনে এখনো গেঁথে আছে।

চিত্রা নদীর পাড়ে (১৯৯৯)

চিত্রা নদীর পাড়ে চলচ্চিত্রের প্রেক্ষাপট ১৯৪৭ সাল, স্থান তৎকালীন পূর্ব পাকিস্থানের ছোট্ট জেলা নড়াইল। শশীভূষণ সেনগুপ্ত নামের এক উকিল (মমতাজউদ্দিন আহমেদ) থাকতেন তার বিধবা বোন অনুপ্রভা (রওশন জামিল) এবং দুটি ছোট ছেলে-মেয়ে মিনতি ও বিদ্যুৎকে নিয়ে। বাড়ির পাশেই বয়ে চলা নদী চিত্রা। সময়টাতে পূর্ব পাকিস্থান থেকে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন দেশ ত্যাগ করে চলে যাচ্ছে পশ্চিমবঙ্গে। এ অবস্থায় শশীভূষণের উপরেও দেশত্যাগের চাপ আসতে শুরু করে, কিন্তু তিনি বাপ-দাদার ভিটা ছেড়ে পরদেশে পাড়ি না জমানোর সিন্ধান্তে অনড়। হিন্দু মুসলিমের দাঙ্গায় অবশেষে কে জয়ী হয়, উত্তর মিলবে এই ছবিতে। বাংলাদেশর অন্যতম শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র পরিচালক তানভীর মোকাম্মেল তার সুনিপুন হাতে নির্মাণ করেছেন এ ছবিটি।

MV5BNWYyMmJmZTQtYzE4Yi00M2E3LWE5MmEtMjViMTMxYzU1NWJjL2ltYWdlXkEyXkFqcGdeQXVyNDI3NjcxMDA@._V1_

প্রতিমা বিসর্জন, মুড়ির টিন বাস, মার্শাল’ল বিরোধী  আন্দোলনের প্ল্যাকার্ড, উত্তম-সুচিত্রার ছবির রিকশাযোগে প্রচারণা, চিত্রা নদীর বুকে পালতোলা নৌকা এসব কিছুই আমাদেরকে দেশ বিভাগের পরের তৎকালীন পূর্ব পাকিস্থানের সেই সময়ের কথা মনে করিয়ে দেয়। প্রধান চরিত্র সমূহে স্বভাবজাত পাগলাটে ধাঁচের মঞ্চ কাঁপানো অভিনেতা মমতাজউদ্দিন আহমেদের নির্লিপ্ত অভিনয় ছিল দেখার মত। সাথে এক পশলা বৃষ্টির মত ছবিতে স্নিগ্ধতা ছড়াবে তৌকীর আহমেদ এবং বিশেষত আফসানা মিমি। ছবিটি নিশ্চিতভাবে আপনাকে ঘুরিয়ে আনবে দেশভাগের সময়কালের তৎকালীন বাংলাদেশ থেকে। উল্লেখ্য এ ছবিটিও ব্রিটিশ ফিল্ম ইন্সটিটিউট-এর সেরা ১০ বাংলাদেশী চলচ্চিত্রের তালিকায় স্থান পেয়েছে।

লেখকের অনুমতি ছাড়া সাইটে ব্যবহৃত সকল প্রকার লেখা পুনঃপ্রকাশ বেআইনি। জরুরী যোগাযোগে ইমেইলঃ altamishnabil@gmail.com

আরো পড়ুন...