ইংরেজীতে ‘থাগ’, কিংবা বাংলায় ‘ঠগি’! শব্দটির সাথে এ যুগের মানুষের তেমন পরিচয় থাকার কথা নয়। ঠগি শব্দটি মূলত ঠগ শব্দ থেকে এসেছে যার মানে প্রতারক, প্রবঞ্চক। আনুমানিক ১৩ থেকে ১৯ শতকে উত্তর ভারত ও বাংলার ত্রাস হয়ে উঠেছিলো এই ঠগিরা। সাধারণত এই দস্যুদল দূরযাত্রার পথিকদের সাথে দলগতভাবে ব্যবসায়ী, সৈন্য অথবা তীর্থযাত্রীর ছদ্মবেশে ভ্রমন করতো। এরপর সুযোগ বুঝে কোন যাত্রাবিরতিতে পথিকদের আচমক আক্রমন করে গলায় হলুদ রং এর রুমাল পেঁচিয়ে তাদেরকে হত্যা করতো। মজার ব্যাপার হলো তাদের হাতে নিহতদের মৃতদেহগুলো যাতে তাড়াতাড়ি পঁচে এজন্য তারা দেহগুলোকে হাড় ভেঙ্গে একসাথে কবর দিয়ে রাখতো। ঐতিহাসিকদের মতে, ষোড়শ-সপ্তদশ শতাব্দী জুড়ে ঠগিদের হাতে প্রায় বিশ লক্ষাধিক নিরিহ পথচারী মারা পড়েছিলো।
ঠগিদের এই নৃশংশতার কাহিনী বিভিন্ন গল্প, উপন্যাসে বর্ণিত হয়েছে। এরই একটি হলো উপন্যাস ‘কনফেশন অব এ থাগ’ যেটি ফিলিপ মিডোস টেলর নামক এক মার্কিন প্রশাসক ও লেখক ১৮৩৯ সালে লিখেছিলেন। আরও মজার বিষয় হলো এই উপন্যাস অবলম্বনে বলিউডের যশ রাজ ফিল্মস একটি চলচ্চিত্র নির্মান করতে যাচ্ছেন যার নাম দেয়া হয়েছে ‘থাগস অব হিন্দুস্থান’। অমিতাভ বচ্চন, আমির খানের মত তারকা সম্বলিত ছবিটি পরিচালনা করেছেন ধুম-৩ এর পরিচালক বিজয় কৃষ্ণ আচার্য্য।
পাঠান বংশে জন্ম নেয়া অনাথ আমির আলিকে দত্তক নিয়ে ঠগি হিসেবে বড় করে তোলেন এদের সর্দার ইসমাইল। বড় হয়ে আমির আলি তৎকালীন বৃটিশ অধ্যুষিত ভারতবর্ষে একটা গুরুতর প্রতিযোগিতা শুরু করে। নিজ নামে ছবির প্রধান চরিত্র আমির আলির ভূমিকায় চলচ্চিত্রটিতে দেখা যাবে আমির খানকে এবং ইসমাইলের ভূমিকায় পর্দায় অবতীর্ণ হবেন অমিতাভ বচ্চন। ১৭৯০ থেকে ১৮০৫ সালে হওয়া একটি কাল্পনিক গল্পের ছবিটিতে আরো অভিনয় করছেন ক্যাটরিনা কাইফ, দঙ্গল খ্যাত ফাতিমা সানা শেখ, জ্যাকি শ্রফ, শশাঙ্ক অরোরা সহ আরো একঝাক শিল্পী।
ছবি নির্মানের সময় যাতে করে ছবির সেট, প্রপস কিংবা কষ্টিউম কোনোভাবে মিডিয়াতে প্রকাশ না পায় এজন্য কলাকুশলীরা অতিমাত্রায় সতর্কতা অবলম্বন করেছিলো। তাইতো এখন পর্যন্ত ছবির সেটে দূর থেকে তোলা হাতেগোনা কিছু ছবি ছাড়া চলচ্চিত্রটির আর কোন স্থিরচিত্র পাওয়া যায়নি। এই মার্চেই রাজস্থানে ছবিটির ক্লাইমেক্স দৃশ্যধারনের মাধ্যমে এর শ্যুটিং শেষ হবে। আর চলতি বছরের নভেম্বরে দীপাবলিতে ছবিটি মুক্তির কথা রয়েছে। বিগত বছরগুলোতে ছবির প্রয়োজনে আমির খানকে ওজন বাড়ানো থেকে শুরু করে বিভিন্ন কিছু করতে দেখা গেছে। এবারে আমির চরিত্রের প্রয়োজনে তার কান ও নাক ফুড়েছেন।
ঠগি সম্বন্ধে আরো মজার তথ্যাদি জানাই। একজন ঠগিকে তাদের পেশায় নেমে মানুষ মারতে হলে অন্তত ১৮ বছর হতে হতো। বছরের এক সময় সংসারধর্ম পালন করা ঠগিরা প্রতি শরৎে দলগতভাবে কর্মের তথা মানুষ মারার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করতো। অনেক ঠগি দ্বৈত জীবনযাপন করতেন, মানে অনেকের পরিবার তাদের পেশা সম্বন্ধে জানতোনা। হত্যাকাণ্ডের জন্য ব্যবহৃত হলুদ রঙের রুমালটি ভাঁজ করে তার দুমাথায় দুটি রুপার মুদ্রা বেঁধে দেয়া হতো। পথচারীদের হত্যার সময় এক ঠগি ভিক্টিমের মাথা, আরেকজন পা ধরে থাকতো আর শেষের জন রুমালটি দিয়ে তাদের উদ্দ্যেশ্য হাসিল করতো। তবে ঠগিরা যে সবাইকে মারতো তা নয়। সাধারণত ভিক্ষুক, সঙ্গীতজ্ঞ, নৃত্যশিল্পী, ঝাড়ুদার, তৈল বিক্রেতা, কাঠমিস্ত্রি, কামার, বিকলঙ্গ, গঙ্গাজলবাহক ও নারীরা বেঁচে যেতো ঠগিদের হাত থেকে। ধর্মবিশ্বাসে ঠগিরা হিন্দু, মুসলিম কিংবা শিখধর্মের হলেও এরা প্রত্যেকেই কালী দেবীর উপাসক ছিলো। বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের গঙ্গার ধারে কালীঘাট মন্দিরটি ছিলো ঠগিদের প্রধান ব্যবসার কেন্দ্র। ১৮০০ এর পরদিকে ভারতের তৎকালীন ব্রিটিশ প্রশাসক উইলিয়াম হেনরি শীম্যান এদেরকে মৃত্যুদন্ড, যাবজ্জীবন কিংবা দীপান্তর করিয়ে ভারতবর্ষকে ঠগিমুক্ত করেন। এখনো রাজস্থানে ঠগিদের বংশধরদের দেখা যায়, তবে তারা বর্তমানে স্বাভাবিক জীবন যাপন করছে।
এতসব ঐতিহাসিক বিষয়বস্তু নিয়ে নির্মিত ছবি থাগস অব হিন্দুস্থান-কে নিয়ে দর্শকমহলের প্রত্যাশার পারদ তাই তুঙ্গে। ছবিটি নিয়ে অভিনেতা, কলাকুশলী, পরিচালক আপাতত মুখে একরকম কুলূপ এটে রয়েছেন বিধায় ছবিটি সম্পর্কে এরচেয়ে বিস্তারিত কিছু জানানো যাচ্ছেনা। তবে কিছুদিনের মধ্যেই একে একে ফাষ্ট লুক, ট্রেলার, টিজারের মাধ্যমে আরো জানা যাবে ছবিটি সম্পর্কে। বছর শেষে আমির খানের ছবি মানেই বক্সের বাইরে ভিন্নধারার কিছু, সেই সূত্রমতে ২০১৮ বছর শেষের অন্যতম চমক হতে যাচ্ছে যশ রাজের প্রযোজনার ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যয়বহুল (২২০ কোটি রুপী) এই ছবিটি।
আর্টিকেলটি দৈনিক ভোরের কাগজে পূর্বপ্রকাশিত
লেখকের অনুমতি ছাড়া সাইটে ব্যবহৃত সকল প্রকার লেখা পুনঃপ্রকাশ বেআইনি। জরুরী যোগাযোগে ইমেইলঃ altamishnabil@gmail.com
