অ্যাডগুরু, সরকারী কবি নাকি চারণকবি! রূপচাঁদ সেনকে যেই নামে ডাকা হোক না কেন তাতেই ফিট তিনি। প্রথমে কপিরাইটার, এরপর বিয়ের কিংবা বাচ্চার মুখে ভাতের অনুষ্ঠানের কার্ডের ভাষা চয়নকারী, এরপর রাজনৈতিক দলের স্লোগান লেখক, সবশেষ সরকারী দলের কবি। পেশা বদলালেও রূপচাঁদকে সবসময় বাংলা শব্দ নিয়ে খেলতে দেখা গেছে।
বলছিলাম টালিগঞ্জের পরিচালক রঙ্গন চক্রবর্তীর ছবি “বাড়ি তার বাংলা”র প্রধান চরিত্রকে নিয়ে যাতে অভিনয় করেছেন শাশ্বত চট্টোপাধ্যায়। ছবিটি পশ্চিমবঙ্গে সেই ২০১৪ সালে মুক্তি পেলেও অনলাইনের কল্যানে বাংলাদেশের মানুষের হাতে এসেছে এই কিছুদিন আগে।
আদ্যোপান্ত বাঙালিয়ানায় ঠাসা বছর চল্লিশের রূপচাঁদ সেন (শাশ্বত) একটা অদ্ভুত সমস্যা নিয়ে মনোবিদের শরণাপন্ন হয়। সমস্যাটা হলো, হঠাৎ একদিন রূপচাঁদ আবিষ্কার করে সে বাংলা ভাষায় আর কিছুই লিখতে পারছে না! সব রকম ডাক্তারী পরীক্ষার পর বের হয় তার সমস্যাটা শারীরিক নয়, এটা সম্পূর্ণভাবে মানসিক। সাইক্যায়াট্রিস্টের (রাইমা সেন) নির্দেশে রূপচাঁদ নিজের মজাদার জীবন-বৃতান্ত বলতে শুরু করে।
মায়ের আঁচলে বড় হওয়া রূপচাঁদ ছোটবেলা থেকে ইংরেজি আর বাংলা মিডিয়ামের হাত ঘুরে শেষমেশ একজন অ্যাড গুরুতে পরিণত হন। ছেলে ভালো ছড়া বলতে পারতো দেখে তাকে ছোটবেলা ভর্তি করানো হয় ইংরেজী মাধ্যমের স্কুলে। সেখানে বিলেতি গালাগাল শিখে তার ছেলে একাকার করে ফেলছিলো বিধায় রূপচাঁদকে এবারে ভর্তি করা হয় বাংলা মিডিয়াম স্কুলে। স্কুলে ঢুকে বাংলা ভাষাকে সে এমনভাবে রপ্ত করে, তার মুখ থেকে যেন লাইনের পর লাইন কবিতা বেরোয় ফুলঝুড়ির মতো। বড় হয়ে প্রথমে নামী একটা বিজ্ঞাপনী সংস্থায় কপিরাইটারের কাজ জোটায় সে। পণ্যের একের পর এক অসাধারন সব কপিরাইট লিখে খুব অল্পদিনেই সে হয়ে যায় অ্যাড গুরু। তবে ইন্ডাস্ট্রির খারাপ অবস্থার জন্য চাকরি হারায় সে। শোকে-দুঃখে পরপারবাসী হন রূপচাঁদের মা। শব্দের জাদুকর রূপচাঁদের এরপরের পেশা হিসেবে জোটে বিয়ের-অন্নপ্রাশন অনুষ্ঠানের কার্ডের ভাষা লেখকের। তবে ভাগ্যে যেন এরচেয়ে আরো অনেক বড় কিছুর অপেক্ষা করছিলো তার জন্য। তার বাম দলের সমর্থক বাবা তাকে আমন্ত্রন জানায় পরবর্তী নির্বাচনে তাদের দল মেরুন পার্টির হয়ে ডায়লগ, বক্তৃতা লেখার কাজে। কাজটা হাতে নিলে সাপে বর হয় মেরুন পার্টির। মেরুন পার্টির জন্য তিনি লেখেন শক্তিশালী স্লোগান “হয় মেরুন, নয় মরুন”! অপেক্ষকৃত দূর্বল হয় হয়েও নির্বাচনে জিতে যায় সেই স্লোগানের জোরেই। দল রূপচাঁদের প্রয়োজনীয়তা বুঝতে পেরে তাকে সরকারী কবি হিসেবে নিয়োগ দেয়।
সরকারী দলের শৌচাগার প্রকল্পের জন্য তিনি লেখেন মজাদার সরকারী গান “মাদল বাজে ধিমি ধিমি, আর হবেনা ফিতাকৃমি “ কিংবা সাক্ষরতা অভিযানে তার কলমে উঠে আসে “ওলো সই, ওলো সই…আমার ইচ্ছা করে তোদের মতো খাতায় করি সই”। ধীরে ধীরে শুরু হয় দ্বন্দ্ব, শাসক মেরুন পার্টি রুপ নেয় খুনোখুনি-মারামারির দলে। তাদের আর রূপচাঁদকে প্রয়োজন হয়না। তাই সে এবারে কাজে লেগে পড়ে মেরুন পার্টির বিরোধীদল হলুদ পার্টির হয়ে। ‘আজ বাংলার গায়ে হলুদ’, এই স্লোগান বিজ্ঞাপনের সবগুলো মাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে এবারে তার নতুন দলকে জেতায়।
ভোটের আগে মাংশ পোলাও, ভোট ফুরোলেই উচ্ছে-দে। তাইতো ভোট জেতার পরেরদিকে হলুদ পার্টির সাথেও বিবাদে জড়িয়ে এবারে সোজা কলমে লেখার ভাষা হারিয়ে ফেলে রূপচাঁদ। ছবির শেষদিকে রয়েছে রূপচাঁদের কলমের ভাষা খুঁজে পাওয়ার গল্প।
বলে রাখা ভালো ছবিটির সবচেয়ে শক্তিশালী দিক ছবিটির সংলাপ যা এই রিভিউ লিখতে অনেকটাই বাধ্য করেছে। বাংলা ভাষা নিয়ে এমন অদ্ভুত রকমের খেলা সবশেষ সেই ভূতের ভবিষ্যৎ-এ দেখেছিলাম বলে মনে পড়ে। ছবির গান কিংবা কারিগরি দিক তথৈবচ হলেও পুরো ছবি জুড়ে রূপচাঁদের একের পর এক অসাধারন হাস্যরসাত্মক সংলাপ আপনাকে পুরোটা সময় মাতিয়ে রাখতে যথেষ্ট। ছবি দেখতে দেখতে আপনার কখনো কখনো ভ্রম হতে পারে, আমি কি ছবি দেখছি না বিজ্ঞাপন দেখছি। তবে সেটি আপনাকে ছবি দেখার মজা থেকে বঞ্চিত করবেনা। ছবিতে মেরুন এবং হলুদ পার্টি দিয়ে পরিচালক আদতে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে স্যাটায়ারের ভঙ্গিতে ব্যাখ্যা করেছেন।
পরিচালক রঙ্গন এর আগে নির্মান করেছিলেন কোয়েল-যীশু জুটির “বর আসবে এখুনি”। তার পরের ছবি বাড়ি তার বাংলা নিঃসন্দেহে অনেক বেশি শিল্পসমৃদ্ধ। ব্যঙ্গ-রসাত্মক ছবিটি দেখে আর যাই হোক, আপনাকে কেউ শাশ্বত চট্টোপাধ্যায়ের অভিনয়ের ভক্ত হওয়া থেকে আটকাতে পারবেনা। যারা খুব বেছে বেছে ওপার বাংলার ছবি দেখেন তার নিদ্বিধায় দেখতে পারেন ছবিটি।
আর্টিকেলটি দৈনিক ভোরের কাগজে পূর্বপ্রকাশিত
লেখকের অনুমতি ছাড়া সাইটে ব্যবহৃত সকল প্রকার লেখা পুনঃপ্রকাশ বেআইনি। জরুরী যোগাযোগে ইমেইলঃ altamishnabil@gmail.com
