অরণ্যের দিনরাত্রি ও কাঞ্চনজঙ্ঘা

পরিব্রাজক ইবনে বতুতা একদা বলেছিলেন, ভ্রমন প্রথমে তোমাকে নির্বাক করে দেবে, তারপর তোমাকে গল্প বলতে বাধ্য করবে। ভ্রমনের মাঝে অনিন্দ্যসুন্দর সব গল্প খুঁজেছেন অনেকে। সত্যজিৎ রায়ও তার ব্যতিক্রম হননি। তার চলচ্চিত্রের চরিত্রগুলোকে কখনো ফেলেছেন বিহারের পালামৌতে বনের ধারে কোন এক ডাক বাংলোতে কিংবা কাঞ্চনজঙ্ঘার পাহাড় আর লেপচাদের মাঝে দারুন কোন পরিবেশে। কখনো বন্ধুদের সাথে আবার কখনো পারিবারিক সফরের গল্পকে তিনি সুনিপুণভাবে তুলে এনেছেন পর্দায়। ভ্রমনকে উপজীব্য করে নির্মিত অরণ্যের দিনরাত্রি চলচ্চিত্রটি মুক্তি পায় ১৯৭০ সালে, তারও আগে ১৯৬২ তে মুক্তি পায় কাঞ্চনজঙ্ঘা।

অরণ্যের দিনরাত্রি (১৯৭০)

বঙ্গবাসীদের কেবল মাঠ দেখা অভ্যাস, মৃত্তিকার সামান্য স্তূপ দেখিলেই তাহাদের আনন্দ হয়। অতএব সেই ক্ষুদ্র পাহাড়গুলি দেখিয়া যে তৎকালে আমার যথেষ্ট আনন্দ হইবে ইহা আর আশ্চর্য কী? সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় রচিত অরণ্যের দিনরাত্রি উপন্যাস অবলম্বনে সত্যজিৎ রায় নির্মান করেন একই নামের একটি চলচ্চিত্র। শোনা যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় যৌবন বয়সে তার কয়েক বন্ধু নিয়ে মাঝেমধ্যেই কোন প্লান-পরিকল্পনা ছাড়াই বেড়িয়ে পড়তেন। অরণ্যের দিনরাত্রি উপন্যাসটি তিনি লেখেন তার এই ভ্রমন অভিজ্ঞতা থেকে, তবে এরমধ্যে বাস্তব ঘটনার সাথে সাথে কল্পনাপ্রসূত অংশও বিদ্যমান।

তবে উপন্যাসের সঙ্গে চলচ্চিত্রের কাহিনীর অনেক অংশেই পাথক্য বিদ্যমান। গল্পের মুখ্য চরিত্রগুলোকে তবে চিনে নেয়া যাক। চার বন্ধু অসীম, শেখর, হরি ও সঞ্জয়। বন্ধু হলেও সামাজিক অবস্থানের দিক দিয়ে চারজনের অবস্থান যেন চার মেরুতে। অসীম উচ্চাভিলাষী টগবগে যুবক, বড় কোম্পানীর এক্সিকিউটিভ। চাপা স্বভাবের সঞ্জয় সরকারী চাকুরে। সুঠামদেহী হরি একজন স্পোর্টসম্যান কিন্তু সদ্য প্রেমে বিফল হয়ে দুমড়ে মুচড়ে গিয়েছে। এদের সঙ্গে চতুর্থ শেখর, বর্তমানে বেকার হলেও সে রসবোধে টইটম্বুর। পুরো সিনেমায় হাস্যরসের উৎপাদক তিনি নিজে। নাগরিক জীবন থেকে হাফ ছেড়ে বাঁচতে তারা বিহারের একটা ছোট গ্রাম পালামৌ’র জঙ্গলে এসে হাজির হয় কোন রকমের হোটেল কিংবা রিজার্ভেশন ছাড়াই। সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের উপন্যাস ‘পালামৌ’ পড়তে পড়তে তাদের যাত্রা শুরু হয়। ভাগ্যক্রমে তারা জুটিয়ে ফেলে একটি ডাক বাংলো। এছাড়াও গল্পে আছে আরো তিন প্রধান নারী চরিত্র। সম্পর্কে বৌদি ও ননদ, জয়া ও অপর্ণার নিজেদের বাড়ি রয়েছে সেখানে প্রতি বছরের মত এবারো বেড়াতে এসেছেন। সবশেষ আলোচ্য অন্যতম প্রধান চরিত্র স্থানীয় সাওতাঁল যুবতী যার নাম দুলি যে হরির বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষন করতে সমর্থ হয়।

অরণ্যের দিনরাত্রির চার বন্ধু অসীম, শেখর, হরি ও সঞ্জয়

ছবিটির ঘরটার মধ্যে রিমার্কেবল কোন ফ্যাক্টর নেই, কাহিনীতে দেখানো সমস্ত ঘটনাই গৌণ। পর্যটকরা নতুন পরিবেশে গিয়ে গণ্ডির বাইরে যা যা করতে পারে ঠিক সেসবেরই বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে এতে। তারপরও প্রত্যেকটি ঘটনা চিত্রনাট্য ও চিত্রায়নের মুন্সিয়ানায় আমাদের কাছে অর্থবহ হয়ে ওঠে।

ছবিটি নিয়ে বিখ্যাত বায়োগ্রাফি লেখক মেরী সিটনের কাছে সত্যজিৎ রায় এক চিঠিতে অরণ্যের দিনরাত্রি নিয়ে লিখেছেন। পরিচালকের নিজের মতে ছবির প্রথম অর্ধাংশে চার বন্ধুর খুনসুটির সুরে মৃদু রসবোদের উপস্থিতি রয়েছে যেটি ছবির শেষদিকে ক্রমে ভাবগম্ভীরতা দিয়ে শেষ হয়। চলচ্চিত্রটির মেমরী গেম দৃশ্যটি চরিত্রগুলোর পরিণতিগঠনে বিশেষ ভূমিকা রাখে।

ছবিতে চার বন্ধুর চরিত্রে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, শুভেন্দু চট্টোপাধ্যায়, সমিত ভঞ্জ ও রবি ঘোষের অভিনয় ছবিটিকে অর্থপূর্ন পরিপূর্নতা দেয়। ননদ ও বৌদি চরিত্রে  শর্মিলা ঠাকুর ও কাবেরি বসু ( সম্ভাবনাময় অভিনেত্রী যিনি মাত্র ৩৯ বছর বয়সে দার্জিলিং থেকে ফেরার পথে দুর্ঘটনায় মারা যান।) ও সাঁওতাল নারীর চরিত্রে সিমি গারেওয়াল প্রত্যেকেই প্রশংসার দাবিদার।

ছবিটির বন্ধুদের প্রবীণ বয়সের গল্প নিয়ে ২০০৩ সালে গৌতম ঘোষ বানিয়েছিলেন “আবার অরণ্যে”। এছাড়া ২০০৮ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত অঞ্জন দত্ত পরিচালিত চলো লেটস গো ছবির চরিত্রগুলো এসেছে এই ছবিটি থেকেই। এসবই বলে দেয় বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে অরণ্যের দিনরাত্রি কতটা প্রভাববিস্তারকারী চলচ্চিত্র।

কাঞ্চনজঙ্ঘা (১৯৬২)

দেয়ালের কান থাকতে পারে, পাহাড়ের তো নেই! আর তাইতো পরিবারের সমস্ত সদস্যরা কাঞ্চনজঙ্ঘায় বেড়াতে এসে নিজেদের সমস্যাগুলো নিয়ে খোলাখুলি আলোচনা করে তা নিরসনের চেষ্টা চালায় সত্যজিৎ রায়ের মৌলিক চিত্রনাট্যের প্রথম ছবি কাঞ্চনজঙ্ঘায়। ছবিটি কাঞ্চনজঙ্ঘা পর্বতের কাছে অবস্থিত জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র দার্জিলিং-এ স্বপরিবারে ছুটি কাটাতে যাওয়া একট উচ্চবিত্ত বাঙালি পরিবারের গল্প। মৌলিক চিত্রনাট্যের পাশাপাশি এটি সত্যজিৎ রায়ের প্রথম রঙিন চলচ্চিত্রও বটে।

শিল্পপতি ইন্দ্রনাথ রায় পুরো বাড়ি শাসন করেন। তার কথার একচুল নাড়ানোর জো নেই। তাইতো দার্জিলিং বেড়াতে এসেও তার দ্বিতীয় কন্যা মনীষাকে নিজ পছন্দের পাত্রের সাথে বিয়ে দিতে তাদেরকে এক করে। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে বাবার পছন্দের প্রতিষ্ঠিত পাত্রকে পছন্দ না করে মনীষার কোলকাতার চালচুলোহীন এক যুবক অশোককে ভালো লেগে যায়। ওদিকে ইন্দ্রনাথ রায়ের অসুখী প্রথম কন্যা অনিমা ও তার স্বামী বহু বছরের সাংসারিক দ্বন্দ মিটে যায় এই সফরকে ভিত্তি করেই। ছবির কাহিনীতে হিমালয়ের বিশালতাকে পশ্চাৎপটে রেখে পরিচালক মানব সম্পর্কের জটিলতার সমস্ত উত্তরগুলো খুঁজেছেন। দার্জিলিংয়ে বেড়াতে আসা ইন্দ্রনাথ-পরিবারের ছুটির শেষ এক দিনকে কাজে লাগিয়ে একদিনে তিনি বর্ননা করেছেন পুরো গল্প। ওদিকে ব্রিটিশপ্রেমী ইন্দ্রনাথ রায়ের মুখের উপর চাকরির আশায় থাকা যুবক অশোকের চাকরির প্রস্তাব প্রত্যাখান তৎকালীন যুবকসমাজে দেশপ্রেমের মাত্রাকে সুনিপুণভাবে ফুটিয়ে তোলে। চিত্রায়নের দিক দিয়ে এটিই সম্ভবত বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসের প্রথম হাইপারলিংক ছবি যার একটি যোগসূত্র থাকে যা ধীরে ধীরে দর্শকের কাছে প্রকাশ পায়। পাহাড়ের বিশলতায় মনের অজান্তে ‘এ পরবাসে রবে কে’ নামের যে রবীন্দ্র সংগীত গেয়ে ফেলেন ইন্দ্রনাথ রায়ের স্ত্রী লাবণ্য সেটি অমিয়া ঠাকুরের গাওয়া যিনি রবীঠাকুর পরিবারের একজন সদস্য। কাঞ্চনজঙ্ঘা চলচ্চিত্রটিতে আরেকটি ভালোলাগার বিষয় ইন্দ্রনাথ রায় চরিত্রে ছবি বিশ্বাস এর অভিনয়। শুরুর মত ছবির শেষটাও হয় শিশু কন্ঠে লেপচা ভাষার গানের সুরে সুরে পাহাড়ের দৃশ্য দেখানোর মাধ্যমে।

আর্টিকেলটি দৈনিক ভোরের কাগজে পূর্বপ্রকাশিত

লেখকের অনুমতি ছাড়া সাইটে ব্যবহৃত সকল প্রকার লেখা পুনঃপ্রকাশ বেআইনি। জরুরী যোগাযোগে ইমেইলঃ altamishnabil@gmail.com

আরো পড়ুন...