শতবর্ষে মহারাজাঃ আমার প্রিয় ৫

“সত্যজিতের চলচ্চিত্র না দেখা আর পৃথিবীতে বাস করে চন্দ্র-সূর্য না দেখা একই কথা!”
সত্যজিৎ রায় সম্পর্কে বরেণ্য বিশ্বখ্যাত জাপানি নির্মাতা আকিরা কুরোসাওয়া এমন মন্তব্য করেছিলেন। সত্যজিৎ রায়ের পিতা সুকুমার রায় জন্মেছিলেন আমাদের বাংলাদেশের বর্তমান কিশোরগঞ্জ জেলার কটিয়াদী উপজেলার মসূয়া গ্রামে। তাই পৈতৃক সূত্রে বাংলাদেশি এই মানুষটির মহৎ সৃষ্টিগুলো নিয়ে আমাদের জানার আগ্রহ বিপুল। ১৯২১ সালে দোসরা মে উত্তর কলকাতার গড়পাড় রোডে বিখ্যাত ও ঐতিহ্যমন্ডিত রায় পরিবারে জন্ম হয় সত্যজিৎ রায়ের। ২০২১ সালের এই মে মাসেই শতবর্ষে পা দিয়েছেন গুণী এ নির্মাতা। জন্মশতবার্ষিকীর এ লগ্নে পাঠকদের জন্য রইলো সত্যজিৎ রায় নির্মিত আমার পছন্দের ৫ টি চলচ্চিত্র নিয়ে আলোচনা।

নায়ক (১৯৬৬)

ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে সত্যজিৎ বেছে নিয়েছিলেন বিভূতিভূষণ, তারাশংকর, রবিঠাকুর কিংবা পরশুরামের বিভিন্ন গল্প-উপন্যাসকে। তবে ১৯৬৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত নায়ক গল্পের রচয়িতা সত্যজিৎ নিজেই। লোকমুখে জানা যায়, এই কিংবদন্তি পরিচালকের সাথে সর্বাধিক কাজ করা অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় এসে একদিন সত্যজিৎকে জিজ্ঞাসা করলেন, নায়ক সিনেমাতে আমাকে নিলেন না কেন? সত্যজিৎ সৌমিত্রের দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলেছিলেন- তুমি কি উত্তম!
নায়ক ছবির প্রধান চরিত্র বাংলা চলচ্চিত্রের সুপারস্টার অরিন্দম মুখোপাধ্যায় (উত্তম কুমার) যে কিনা একটি জাতীয় পুরস্কার প্রাপ্তির পর তা গ্রহণের জন্য রেলপথে কলকাতা থেকে দিল্লির উদ্দেশ্যে যাচ্ছিলেন। ট্রেনের রেস্তোরাঁ কারে অরিন্দমের সঙ্গে অদিতি সেনগুপ্ত (শর্মিলা ঠাকুর) নামের এক নারী সাংবাদিকের পরিচয় হয় যিনি আধুনিকা নামে মেয়েদের একটি পত্রিকা সম্পাদনা করতেন। অদিতির কাছে অরিন্দমের ক্যারিয়ারের আগে ও পরের জীবনের গল্পগুলো জানানোর মাধ্যমে ছবির গল্প এগোয়। ছবিটিতে সাতটি ফ্ল্যাশব্যাক এবং দুটি স্বপ্নের দৃশ্য দিয়ে অরিন্দমের জীবনের গল্পগুলো একে একে তুলে ধরা হয়।

অরণ্যের দিনরাত্রি (১৯৭০)

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় রচিত অরণ্যের দিনরাত্রি উপন্যাস অবলম্বনে সত্যজিৎ রায় নির্মাণ করেন একই নামের একটি চলচ্চিত্র। শোনা যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় যৌবন বয়সে তার কয়েক বন্ধু নিয়ে মাঝেমধ্যেই কোন প্লান-পরিকল্পনা ছাড়াই বেড়িয়ে পড়তেন। অরণ্যের দিনরাত্রি উপন্যাসটি তিনি লেখেন তার এই ভ্রমণ অভিজ্ঞতা থেকে, তবে এরমধ্যে বাস্তব ঘটনার সাথে সাথে কল্পনাপ্রসূত অংশও বিদ্যমান। তবে উপন্যাসের সঙ্গে চলচ্চিত্রের কাহিনির অনেক অংশেই পার্থক্য বিদ্যমান। সিনেমার চার বন্ধু অসীম, শেখর, হরি ও সঞ্জয়। বন্ধু হলেও সামাজিক অবস্থানের দিক দিয়ে চারজনের অবস্থান যেন চার মেরুতে। নাগরিক জীবন থেকে হাফ ছেড়ে বাঁচতে তারা বিহারের একটা ছোট গ্রাম পালামৌ’র জঙ্গলে এসে হাজির হয় কোন রকমের হোটেল কিংবা রিজার্ভেশন ছাড়াই। এছাড়াও গল্পে আছে আরো তিন প্রধান নারী চরিত্র। ছবিতে চার বন্ধুর চরিত্রে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, শুভেন্দু চট্টোপাধ্যায়, সুমিত ভঞ্জ ও রবি ঘোষের অভিনয় ছবিটিকে অর্থপূর্ণ পরিপূর্ণতা দেয়। ননদ ও বৌদি চরিত্রে শর্মিলা ঠাকুর ও কাবেরি বসু ও সাঁওতাল নারীর চরিত্রে সিমি গারেওয়াল প্রত্যেকেই প্রশংসার দাবিদার।

জয় বাবা ফেলুনাথ (১৯৭৯)


সত্যজিৎ রায় নির্মিত দ্বিতীয় ও শেষ ফেলুদা চলচ্চিত্র ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’ ছবির নামের মধ্যেই একটা ভক্তিভাব রয়েছে, তাইতো? হ্যাঁ, পুরো ছবিটির দৃশ্যায়ন হয়েছে গঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত ভারতের উত্তরপ্রদেশের শহর বেনারসে (কাশী)।
মহালয়ায় বের হয়েছে জটায়ুর নতুন বই ‘করাল কুম্ভির’। তাই পুজোর ছুটিতে ফুরফুরে মেজাজে ফেলুদা-তোপসেকে নিয়ে লালমোহন গাক্সগুলী ওরফে জটায়ু ঘুরতে আসে বেনারসে। কিন্তু কথায় আছে ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে। ফেলুদা ছুটিতে বেড়াতে এসেও জড়িয়ে পড়ে এখানকার সম্ভ্রান্ত ঘোষাল পরিবারের একটি দামি গণেশ চুরির ঘটনায়। গল্পের অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক মগনলাল মেঘরাজের উপস্থিতি। ফেলুদা সিরিজের উল্লিখিত খল চরিত্রগুলোর মধ্যে মগনলালকেই সবচেয়ে শক্তিশালী ও বিপজ্জনক বলে গন্য করা হয়। আগের ছবিটির মতো এ ছবিতেও ফেলুদার চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন শক্তিমান অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, তোপসে ও জটায়ুর ভূমিকায় যথাক্রমে সিদ্ধার্থ চট্টোপাধ্যায় ও সন্তোষ দত্ত। চলচ্চিত্রে মগনলাল মেঘরাজের ভূমিকায় দূর্দান্ত অভিনয় করেছিলেন শক্তিমান অভিনেতা উৎপল দত্ত।

হীরক রাজার দেশে (১৯৮০)


‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’ মুক্তি পাওয়ার ১১ বছর পর মুক্তি পায় এর সিক্যুয়াল ‘হীরক রাজার দেশে’। ছবির সবচেয়ে বিশেষ দিক মূল শিল্পীদের সমস্ত সংলাপ ছড়া কিংবা মন্ত্রের আকারে কথা বলা। কেবলমাত্র হীরক রাজ্যের একমাত্র শিক্ষক ছড়ার ভাষায় কিছু বলেনি। রাজ্যে একমাত্র তিনিই মুক্তচিন্তার অধিকারী, বাদবাকি সবাই নির্দিষ্ট চিন্তার পরিসরে সীমিত। ছবিতে ব্যবহৃত রূপকের আড়ালে এই চলচ্চিত্রে কিছু ধ্রুব সত্য চোখে আঙুল দিয়ে দেখানো হয়েছে।
প্রজানিপীড়ক এক শাসক হীরক রাজার (উৎপল দত্ত) রাজ্যে হীরকজয়ন্তীর বর্ষপূর্তি উপলক্ষে অনুষ্ঠিত বিশেষ অনুষ্ঠানের সময়কালের নানা ঘটনাকে উপজীব্য করে চলচ্চিত্রটি নির্মিত। ছবিতে গুপী আর বাঘা চরিত্রে যথারীতি ছিলেন তপেন চট্টোপাধ্যায় ও রবি ঘোষ। ছবির অন্যতম শক্তিশালী দিক হীরক রাজার চরিত্রে উৎপল দত্তের অনবদ্য অভিনয়। ছবিতে উদয়ন পন্ডিতের ভূমিকায় ছিলেন সত্যজিৎ রায়ের অধিকাংশ ছবিগুলোর অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। আর শুন্ডির রাজার সাথে সাথে গবেষকের চরিত্রটিও করেছিলেন সন্তোষ দত্ত।

আগন্তুক (১৯৯১)


জার্মান ভাষায় সুন্দর একটা শব্দ আছে, ‘Wanderlust’, যার মানে ভ্রমণের নেশা। সেই নেশায় মত্ত হয়ে নিজ ঘর ছেড়ে দেশ থেকে দেশান্তরে পাড়ি জমিয়েছিলেন ইবনে বতুতা, কলম্বাস কিংবা হিউয়েন সাঙ্গ। এমনই আরেক ভ্রমণপাগল মানুষ মনমোহন মিত্র (উৎপল দত্ত)। নিজ দেশ ভারত ছেড়েছেন প্রায় ৩৫ বছর। পশ্চিমের বিভিন্ন দেশে ভ্রমণের পাট চুকিয়ে এবারে ফিরবেন পূর্বে। তারই বিরতিতে দিল্লি এসে হঠাৎ কলকাতায় থাকা একমাত্র রক্তের সম্পর্কের আত্মীয় ভাগ্নি অনীলা ও তার পরিবারকে দেখার ইচ্ছে পোষণ করে একটা চিঠি দিয়ে বসেন। ১৯৫৫ এর দিকে মনমোহন যখন দেশ ছাড়েন অনীলা তখন কেবল দুই বছরের খুকি। রক্তের সম্পর্কের কোন আত্মীয়ই এখন আর বেঁচে নেই দেখে, তাই অনীলার হাতে উপায়ও নেই বেড়াতে আসতে চাওয়া মামাটি তার জাল নাকি সত্যিকারের মামা তা বের করার। ছবির গল্পটা শুরু হয় এই রহস্য থেকেই।

লেখাটি ভোরের কাগজে পূর্বপ্রকাশিত

লেখকের অনুমতি ছাড়া সাইটে ব্যবহৃত সকল প্রকার লেখা পুনঃপ্রকাশ বেআইনি। জরুরী যোগাযোগে ইমেইলঃ altamishnabil@gmail.com

আরো পড়ুন...