হলিউড! বিশ্ব চলচ্চিত্রের সবচেয়ে বড় ইন্ড্রাষ্ট্রির নাম। চলচ্চিত্রের বিকাশের সাথে সাথেই মার্কিন চলচ্চিত্র প্রভাব বিস্তার শুরু করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রতি বছর গড়ে ৭০০-এর অধিক ইংরেজি ভাষার চলচ্চিত্র মুক্তি দিয়ে থাকে, যা কোন একক ভাষার জাতীয় চলচ্চিত্র নির্মাণের দিক থেকে সর্বোচ্চ।
১৯২৯ সালে আমেরিকান স্টক মার্কেটে ধস নামে, এরপর শুরু হয় দেশের অর্থনৈতিক অবনমন। ইতিহাসে একে মহামন্দা বা দ্য গ্রেট ডিপ্রেশন বলা হয়ে থাকে। ১৯৩৩ সালে আনুমানিক এক-চতুর্থাংশ আমেরিকান এই মহামন্দার ফলে বেকার হয়ে পড়ে। নিজেদের সঞ্চিত অর্থ দিয়ে বিনোদনের একমাত্র সস্তা মাধ্যম হিসেবে তারা চলচ্চিত্র দর্শনকেই বেঁছে নেয়। এই মহামন্দাই আমেরিকার চলচ্চিত্র বিকাশে বড় এক ভূমিকা পালন করেছিলো। এর প্রভাব স্পষ্টত দৃশ্যমান হয় যখন জানা যায় ১৯২০-৩০ এর দশকে বছরে গড়ে ৮০০ এর মত ছবি নির্মান হতো যা বর্তমান সময়ে গড়ে প্রায় ৫০০। সে সময়ে জেনার চলচ্চিত্র খুব জনপ্রিয় হতে থাকে। গ্যাংস্টার, মিউজিকাল, ওয়েষ্টার্ন, স্ক্রুবল কমেডি সহ নানা ধাঁচের চলচ্চিত্র নির্মানের হিড়িক পড়ে সে সময়।
আনুমানিক ১৯১৫-১৭ থেকে শুরু করে ১৯৬০-৬৯ এর সময়কালকে হলিউডের ক্লাসিক যুগ বা স্বর্ণযুগ বলে অভিহিত করেন চলচ্চিত্র বিশ্লেষকেরা। আর এ সময়ের বর্ণনা আসলেই স্মরন করা হয় ৫ চলচ্চিত্র নির্মাতা সংস্থার কথা যারা সে সময়ে পুরো হলিউড জুড়ে রাজত্ব করেছেন। এরমধ্যে সবচেয়ে বড় ছিলো মেট্রো-গোল্ডউইন-মেয়ার (এমজিএম)। ছিলো ইউরোপিয়ান নির্মাতা, অভিনেতাদের নিয়ে কাজ করা প্যারামাউন্ট পিকচারস, কর্মজীবি মানুষদের জন্য ছবি বানানো ওয়ার্নার ব্রস, সর্বকালের সেরা ছবি খ্যাত সিটিজেন কেন এর নির্মাতা প্রতিষ্ঠান আরকেও রেডিও পিকচার্স। এছাড়াও একজন নির্মাতা যে একটি প্রযোজনা সংস্থাকে তুলে ধরতে পারে তার প্রমান টুয়েন্টিথ সেঞ্চুরী ফক্স। নির্মাতা জন ফোর্ড এই ব্যানারে নিয়মিত কাজ করতেন এবং এখান থেকে নির্মিত গ্রেপস অব রেথ এবং হাউ গ্রিন ওয়াজ মাই ভ্যালি এর জন্য তিনি সেরা পরিচালকের অস্কার জেতেন। সে সময়ে এই পঞ্চপান্ডব নিয়ন্ত্রণ করতেন চলচ্চিত্রের নির্মান, পরিবেশন, প্রদর্শন সমস্তকিছু। তবে সুপ্রিম কোর্টের এক আদেশে তাদেরকে শুধুমাত্র নির্মান ও পরিবেশনে মননিবেশ করতে বলা হয় এবং এদের ক্ষমতা কিছুটা কমে আসে। চলচ্চিত্র শব্দ সংযোজন, রঙ্গিন চলচ্চিত্র নির্মান শুরু এবং অ্যাসপেক্ট রেশিও সহ চলচ্চিত্রের নানা কারিগরী উন্নতিসাধন হয় এই ক্লাসিক যুগে।
বিশ্বব্যাপী প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শুরুতেও ফরাসী ও ইতালীয় ছবিগুলির বিশ্বব্যাপী তুমুল জনপ্রিয় ছিল, তবে যুদ্ধশেষে এসব বিশ্ববাজারে অঞ্চলের ধস নামে ইউরোপের চলচ্চিত্রের। মার্কিন চলচ্চিত্র ততদিনে নিজস্ব আকার ধারণ করে ক্যালিফোর্নিয়ায় যার নাম দেয়া হয় হলিউড। ১৯১৫ সালের এ বার্থ অব এ নেশন থেকে শুরু করে, ১৯২৭ সালে বিশ্বের প্রথম সবাক সঙ্গীতধর্মী চলচ্চিত্র দ্য জ্যাজ সিঙ্গার, ১৯৬৩ সালে নির্মিত উচ্চ বাজেটের ক্লিওপেট্রার মত অসংখ্য চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে এ যুগে। তন্মধ্যে স্বল্পসংখ্যক কিছু উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র নিয়ে আর্টিকেলটিতে আলোচনা করা হলো।
দ্য জ্যাজ সিঙ্গার (১৯২৭)
নির্মাতা অ্যালান ক্রসল্যান্ড পরিচালিত মার্কিন সঙ্গীতধর্মী নাট্য চলচ্চিত্র দ্য জ্যাজ সিঙ্গার সিনেমার ইতিহাসের একটি বড় মাইলফলক। একে বিশ্বের প্রথম সার্থক পূর্ণদৈর্ঘ্য সবাক চলচ্চিত্র হিসেবে অভিহিত করা হয়। এ ছবির মাধ্যমেই চলচ্চিত্র দর্শকেরা একই সাথে সংলাপ ও সুরের মূর্ছনা উপভোগ করতে সমর্থ হয়। ভিটাফোন সাউন্ড-অন-ডিস্ক পদ্ধতিতে শব্দধারন সম্বলিত এ ছবিটি প্রযোজনা করে ওয়ার্নার ব্রস। জ্যাজ সঙ্গীতপ্রেমী জ্যাকির সঙ্গীতের মোহে বাড়ি ছাড়া এবং সংগ্রামের গল্প উঠে এঠেছে এ ছবিতে। এই চলচ্চিত্র নির্মাণে ব্যয় হয়েছিলো প্রায় পাঁচ লক্ষ মার্কিন ডলার, আর আয় করেছিলো আনুমানিক ৩০ লক্ষ ডলার। ছবিটিতে মোট ২৮১টি মৌখিক শব্দ প্রয়োগ করা হয়। চলচ্চিত্রটি মুক্তির পর এর দুইবার পূননির্মান হয়েছিলো।
চলবে…
লেখাটি ভোরের কাগজে পূর্বপ্রকাশিত
লেখকের অনুমতি ছাড়া সাইটে ব্যবহৃত সকল প্রকার লেখা পুনঃপ্রকাশ বেআইনি। জরুরী যোগাযোগে ইমেইলঃ altamishnabil@gmail.com
