ঈদ মানেই আনন্দ, সঙ্গে কর্মব্যস্ততা থেকে কিছুটা অবসর। এই সময়টাকে বিনোদনমুখর করতে দেখে নিতে পারেন নিচের পাঁচটি বাংলাদেশী চলচ্চিত্রঃ
সীমানা পেরিয়ে
বিখ্যাত চলচ্চিত্রকার আলমগীর কবিরের নাম আপনারা অনেকেই শুনে থাকবেন । প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণের মাধ্যমে যার পরিচালক হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু। স্বাধীনতার পরে তিনি পূর্র্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরু করেন। ১৯৭৭ সালে নির্মিত সীমানা পেরিয়ে আলমগীর কবির নির্মিত অন্যতম সেরা চলচ্চিত্র। ১৯৭০ সালে এদেশে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ জলোচ্ছাসের পর বরিশালের একটি চরে একজোড়া মানব মানবীকে আদিম পরিস্থিতিতে কোন রকমে বেঁচে থাকতে দেখা গিয়েছিলো। এ ঘটনাটি উক্ত চলচ্চিত্রের উপজীব্য বিষয়। তবে আর্ট ঘরানার সফল এ পরিচালক নিজেই ছবিটি সর্ম্পকে বলেছেন, ব্যবসায়ী পুঁজির চাপে ছবিটির বক্তব্য ও গতি কিঞ্চিত ছিন্নভিন্ন। ছবিটির মূল ভূমিকায় অভিনয় করেছেন বুলবুল আহমেদ ও জয়শ্রী কবির। ছবিটির সাথে সম্বন্ধযুক্ত একটি তথ্য দিয়ে রাখি। সত্যজিত রায়ের ছবি প্রতিদ্বন্দ্বী দিয়ে ক্যারিয়ার শুরু করা অভিনেত্রী জয়শ্রী রায় (পূর্বতন নাম) সূর্যকন্যা নামের ছবিতে অভিনয়ের জন্য এদেশে আসেন এবং পরে পরিচালক আলমগীর কবিরের সাথে বিয়ে করে এদেশে থেকে যান। ভূপেন হাজারিকা এবং আবিদা সুলতানার কন্ঠে গাওয়া ছবিটির গান বিমূর্ত এই রাত্রি আমার কিংবা মেঘ থম থম করে গানগুলো এখনো আগের মতই জনপ্রিয়। ও জানিয়ে রাখা ভালো , ব্রিটিশ ফিল্ম ইন্সটিটিউট-এর ‘বাংলাদেশের সেরা ১০ চলচ্চিত্র’ তালিকায় স্থান পেয়েছে ‘সীমানা পেরিয়ে’।
দারুচিনি দ্বীপ
মন চায় মন চায়, যেখানে চোখ যায়…সেখানে যাবো হারিয়ে! হ্যা, হুমায়ুন আহমেদের বিখ্যাত উপন্যাস থেকে নির্মিত দারুচিনি দ্বীপ চলচ্চিত্রটি কয়েকজন মধ্যবিত্ত তরুণ-তরুনীর দারুচিনি দ্বীপে হারানোর স্বপ্নে বিভোর থাকার গল্প। ছবিটিতে দেখা যায় কানাবাবা নামে খ্যাত হুমায়ুন আহমেদ সৃষ্ট বিখ্যাত চরিত্র শুভ্র এবং তার বন্ধু-বান্ধবদের প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিনে যাওয়ার আয়োজন। পুরো ছবিটিতে শুধু তাদের গন্তব্যে পৌঁছাতে ! সেটা পরবর্তী পর্ব রুপালী দ্বীপ নির্মিত হলেই জানা যাবে যথেষ্ট। জয়যাত্রাখ্যাত পরিচালক তৌকির আহমেদ এ ছবিটি দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছেন অভিনয়ের পাশাপাশি পরিচালনাতেও তিনি কতটা দক্ষ। ছবিটিতে ফুটে উঠেছে একদল স্বপ্নবাজ তরুণের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, ভালোবাসার গল্প। পাশাপাশি দেখা গিয়েছে উচ্চবিত্ত পরিবারের অনায়াস জীবনযাপন, অপনপাশে নি¤œœ মধ্যবিত্তের স্বল্প আয়ে জীবনের কষাঘাত। ছবিটিতে শুভ্ররুপে দেখতে পাওয়া রিয়াজকে নিশ্চিতভাবে লুফে নেবেন তার যেকোনো ভক্ত অনুরাগী।
উধাও
লাইক তানান্তিনো মেট সত্যজিত ইন ঢাকা অ্যান্ড মেইড অ্যা মুভি। উধাও চলচ্চিত্রের ফেসবুক পেজের প্লট আউটলাইনে পরিচালক তার চলচ্চিত্রকে এভাবেই বর্ণনা করেছেন। দর্শক হিসেবে ছবিটি দেখার পর হারে হারে টের পেতে হয়, ছবিটি আদতেই তাই। তরুণ চলচ্চিত্রকার অমিত আশরাফের এটিই প্রথম ফিচার ফিল্ম। ভুল-ত্রুটির ঊর্ধ্বে স্বয়ং হিচকক-কুবরিকরাও ছিলেন না। তবে প্রথম ছবিতেই নির্মাণের এমন পরিপক্কতা সত্যিই অবাক করার মতো। সিনেমাটির কাহিনী গড়ে উঠেছে বাবু (শাহেদ আলী) নামের একজন স্কুল ভ্যানওয়ালাকে কেন্দ্র করে। আপাতদৃষ্টিতে তার জীবনযাপন স্বাভাবিক মনে হলেও তার মধ্যে আছে গোপন কোন বিষয়। যেমনটা আমেরিকার বিখ্যাত সিরিয়ালের চরিত্র ডেক্সটার মর্গানের ছিলো। দিনের বেলা সাধারণ জীবনযাপনকারী বাবুকে রাত হলেই দেখা যায় ভিন্নরুপে। যেসব মানুষ তাদের পরিবারের দ্বায়িত্ব থেকে পালিয়ে করে উধাও হয়ে আছে, বাবু তাদের খুঁজে বের করে। ফিরিয়ে দেয় তাদের পরিবারের কাছে। শিকারের সন্ধানে সর্বদা অবিচল বাবু এভাবে একদিন খুঁজে পায় তার জীবনের সবচেয়ে বড় শিকার, আকবার রহমানকে (শাকিল আহমেদ)। আকবর একজন প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ, কিন্তু আদতে একজন গডফাদার। নিরাপত্তার নানা ফাক-ফোকর গলে বাবু কিডন্যাপ করে আকবরকে। ছবি শেষ হয় একটি বড় আকারের টুইষ্ট দিয়ে। ছবিটির সবচেয়ে শক্তিশালী দিক এ নন-লিনিয়ার স্টোরিটেলিং। ক্যামেরায় কাইল হেসলপের কাজ ছিলো এক কথায় অনবদ্য। বাবু চরিত্র শাহেদ আলীর নির্লিপ্ত অভিনয় সত্যিই প্রশংসনীয়। উধাও ছবির সাউন্ড এডিটর কেনেথ এল জনসন তিনবার এমি অ্যাওয়ার্ড জিতেছেন। লাস্ট সামুরাই, ইটালিয়ান জব, মিশন ইম্পসিবল-৩ এসব ছবিতে কাজ করেছেন কেনেথ এল জনসন। থ্রিলার অনুরাগীদের জন্য উধাও চলচ্চিত্রটি অবশ্য দর্শনীয়।
কিস্তিমাত
এবারে একটি পুরোদস্তুর বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রে আসি। আরিফিন শুভ, আঁচল ও মিশা সওদাগর অভিনীত ছবির নাম কিস্তিমাত। ছবির কাহিনীতে আলোকপাত করা যাক। দূর্জয় (শুভ) একজন খামখেয়ালী পুলিশ কর্মকর্তা। সত্যিকারের অপরাধীর সাথে মারপিট করাই যার একমাত্র প্যাশন। প্রতিবেশী প্রিয়া’র (আঁচল) সাথে বিভিন্ন ঘটন-অঘটনে মন দেয়া-নেয়া হয়ে যায় দুজনের মধ্যে। ঘটনাচক্র দূর্জয় মাদক স¤্রাট লায়ন রবির সঙ্গে বিবাদে জড়িয়ে পড়ে এবং একসময় সে আবিস্কার করে এই লায়ন রবির সথে তার পূর্ব জীবনের এক বিশেষ সম্বন্ধ আছে।‘‘এরপর তুই বাজী , আমি সোলজার….”, দূর্জয়ের এই ডায়লগের মাধ্যমে শুরু হয় একে অপরকে কিস্তিমাত করার খেলা। বাকিটা ছবি দেখার পরই জানতে পারবেন। এমনই একটি চলচ্চিত্র কিস্তিমাত। এ ছবির সবচেয়ে শক্তিশালী দিক হচ্ছে ছবিটির চিত্রগ্রহণ। ছবিটির স্টাইলিশ এবং মিনিংফুল চিত্রগ্রহণ ছবিটির মান ধরে রেখেছে। এজন্য চিত্রগ্রাহক ও পরিচালক আশিকুর রহমানকে বিশেষ ধন্যবাদ দিতে হয়। পুরো ছবিতে মিশা সওদাগরের দাপুটে অসাধারণ অভিনয় দেশীয় চলচ্চিত্রের দর্শকদের মনে বহুদিন দাগ কেটে থাকবে। ছবিটির ডায়লগে কাব্যিকতার বিষয়গুলোও বেশ উপভোগ্য। ‘আমি কবিতা লেখা কবি না, আমি ওয়ান অ্যান্ড অনলি লায়ন রবি…’- খলনায়কের এই ডায়লগটি যে কারো বহুদিন কানে বেঁধে থাকবে।
চিত্রা নদীর পাড়ে
চিত্রা নদীর পাড়ে চলচ্চিত্রের প্রেক্ষাপট ১৯৪৭ সাল, স্থান তৎকালীন পূর্ব পাকিস্থানের ছোট্ট জেলা নড়াইল। শশীভূষণ সেনগুপ্ত নামের এক উকিল (মমতাজউদ্দিন আহমেদ) থাকতেন তার বিধবা বোন অনুপ্রভা (রওশন জামিল) এবং দু’টি ছোট ছেলে-মেয়ে মিনতি ও বিদ্যুৎকে নিয়ে। বাড়ির পাশেই বয়ে চলা নদী চিত্রা। সময়টাতে পূর্ব পাকিস্থান থেকে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন দেশ ত্যাগ করে চলে যাচ্ছে পশ্চিমবঙ্গে। এ অবস্থায় শশীভূষণের উপরেও দেশত্যাগের চাপ আসতে শুরু করে, কিন্তু তিনি বাপ-দাদার ভিটা ছেড়ে পরদেশে পাড়ি না জমানোর সিন্ধান্তে অনড়। হিন্দু মুসলিমের দাঙ্গায় অবশেষে কে জয়ী হয়, উত্তর মিলবে এই ছবিতে। বাংলাদেশর অন্যতম শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র পরিচালক তানভীর মোকাম্মেল তার সুনিপুন হাতে নির্মাণ করেছেন এ ছবিটি। প্রতিমা বিসর্জন, মুড়ির টিন বাস, মার্শাল ’ল বিরোধী আন্দোলনের প্ল্যাকার্ড, উত্তম-সুচিত্রার ছবির রিকশাযোগে প্রচারণা, চিত্রা নদীর বুকে পালতোলা নৌকা এসব কিছুই আমাদেরকে দেশ বিভাগের পরের তৎকালীন পূর্ব পাকিস্থানের সেই সময়ের কথা মনে করিয়ে দেয়। প্রধান চরিত্র সমূহে স্বভাবজাত পাগলাটে ধাঁচের মঞ্চ কাঁপানো অভিনেতা মমতাজউদ্দিন আহমেদের নির্লিপ্ত অভিনয় ছিল দেখার মত। সাথে এক পশলা বৃষ্টির মত ছবিতে স্নিগ্ধতা ছড়াবে তৌকীর আহমেদ এবং বিশেষত আফসানা মিমি। ছবিটি নিশ্চিতভাবে আপনাকে ঘুুরিয়ে আনবে দেশভাগের সময়কালের তৎকালীন বাংলাদেশ।






