পরশ পাথর একটি কল্পিত রাসায়নিক বস্তু যার স্পর্শে ধাতব সোনা কিংবা রূপায় পরিণত হয়! একে বাংলায় দার্শনিকের পাথর নামেও অভিহিত করা হয়। কয়েক শতাব্দী ধরে এই পরশ পাথর আবিষ্কারের প্রচেষ্টাকে বলা হতো ম্যাগনাম ওপাস (মহান কর্ম)। ওদিকে ১৭ শতকে লেখা বিজ্ঞানী আইজ্যাক নিউটনের রসায়ন সংক্রান্ত একটি পাণ্ডুলিপি থেকে জানা যায় তিনি পরশপাথর বানানোর নানাভাবে চেষ্টা করেছিলেন। এটি বানাতে রাসায়নিক প্রক্রিয়া তথা রেসিপিও তৈরি করেছিলেন তিনি। একটি পরশ পাথর একজন সাধারন নিম্ন মধ্যবিত্ত বাঙালির জীবনে কেমনভাবে প্রভাব ফেলে, সেমন এক গল্প ফেঁদেছিলেন পরশুরাম! বিশিষ্ট ভারতীয় বাঙালি সাহিত্যিক রাজশেখর বসু পরশুরাম ছদ্মনামে তাঁর ব্যঙ্গকৌতুক ও বিদ্রুপাত্মক কথাসাহিত্যের জন্য প্রসিদ্ধ। সত্যজিৎ রায় এই পরশুরামের রচিত পরশ পাথর নামক ছোটগল্প থেকে তৈরি করেন একই নামের একটি রম্য চলচ্চিত্র। পরে পরশুরামের আরেক গল্প কিরিঞ্চিবাবা অবলম্বনে সত্যজিৎ রায় নির্মান করেন “মহাপুরুষ”।
ডালহৌসি স্কোয়ার অফিস পারার একজন সাধারণ নিম্ন মধ্যবিত্ত কেরানী পরেশ দত্ত (তুলসী চক্রবর্তী) এক বৃষ্টির দিনে অফিস থেকে ফেরার পথে কার্জন পার্কে কুড়িয়ে পান একটি গোলাকৃতির পাথর। পাথরটি বাসায় এনে সে তার পাড়ার ভাইপো পল্টুকে খেলার জন্যে দিয়ে দেন। কিন্তু হঠাৎই জানা যায় যেকোন লোহা ওই পাথরে ছোয়ালেই করলেই তা নিমেষেই সোনা বনে যাচ্ছে। পরশবাবু ঠিকই বুঝে ফেলেন এ পাথর যেন-তেন পাথর নয়, এটি পরশ পাথর। বুদ্ধির জোরে তিনি প্রচুর লোহা কিনে তা সোনা করতে থাকেন। দিনকে দিন রাজনীতি ও ব্যবসার জোরে হয়ে ওঠেন শহরের কেউকেটা। কাজের জন্য তার পাশে রাখেন তার বিশ্বস্ত সেক্রেটারী প্রিয়তোষ হেনরী বিশ্বাস (কালী বন্দ্যোপাধ্যায়) নামের এক তরুনকে। একদিন কোন এক অনুষ্ঠানে গিয়ে মদ্যপ অবস্থায় সবাইকে দেখিয়ে ফেলেন তার টাকা কামানোর ফন্দি আর তাতেই ফাঁস হয়ে যায় পরেশবাবুর এত সম্পত্তির রহস্য। গোলমাল দেখে সেক্রেটারী প্রিততোষকে পাথরটি আর যাবতীয় সম্পত্তি দান করে পরেশবাবু স্ত্রীকে নিয়ে তীর্থ দর্শনের বেরুনোর পথে পুলিশ তাদের আটকায় ও হাজতে নিয়ে আসে। ওদিকে যুবক সেই সেক্রেটারী প্রিয়তোষ প্রেমে বিফল হয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করে আস্ত পাথরটিই খেয়ে নিয়ে। হাসপাতালে নেয়ার পর এক্স-রে রিপোর্টে দেখা যায় প্রিয়তোষের পেটে পাথড়টা ক্রমশ হজম হয়ে যাচ্ছে। পাথরটি সম্পুর্ন হজম হয়ে গেলে এযাবৎকালের যত লোহা সোনায় পরিনত হয়েছিলো পুরোটাই সাবেক অবস্থায় ফিরে আসে। থানা থেকে মুক্তি পেয়ে পরেশবাবু তার স্ত্রী, সেক্রেটারি ও চাকরকে নিয়ে বেরিয়ে পড়েন আনন্দভ্রমনে।
পরশ পাথর অপু সিরিজের পরে সত্যজিৎ রায়ের প্রথম পরিচালিত চলচ্চিত্র যেটি মুক্তি পায় ১৯৫৮ সালে। সত্যজিৎ চলচ্চিত্র নির্মানের সাথে সিনেমার শিরোনামের টাইপোগ্রাফিও করেছেন। ছবিতে তুলসী চক্রবর্তীর দূর্দান্ত অভিনয় ছিলো দেখার মতো। কম জাননি স্ত্রীর চরিত্রে অভিনয় করা রানীবালা দেবী। ছবির অন্যতম উল্লেখযোগ্য বিষয় রবিশঙ্করের সঙ্গীতায়োজন। ছবিটি সে বছরে কান চলচ্চিত্র উৎসবের সেরা ছবির লড়াইয়ে অংশ নেয়।
দিনশেষে পরিশ্রমের ফলে কষ্টার্জিত সম্পদে যে শান্তি, সেটা পরশ পাথরের ছোয়ায় সহস্র ভরি সোনাতে নেই। ছবিটির প্রধান চরিত্র পরেশ দত্তকে দেখার পর যে কারো এমন উপলব্ধি হতে বাধ্য।
আর্টিকেলটি দৈনিক ভোরের কাগজে পূর্বপ্রকাশিত
লেখকের অনুমতি ছাড়া সাইটে ব্যবহৃত সকল প্রকার লেখা পুনঃপ্রকাশ বেআইনি। জরুরী যোগাযোগে ইমেইলঃ altamishnabil@gmail.com
