সিনেমা শুরুর গপ্পঃ আভা গার্দ, এক্সপেরিমেন্টাল ও প্রামাণ্যচিত্র

আভা গার্দ (avant-garde) ফরাসী একটি শব্দ যা দিয়ে শিল্প, সংস্কৃতি অঙ্গনে পরীক্ষামূলকভাবে কিছু করাকে বোঝায়। ১৯২৪ থেকে তিরিশ দশকের শুরুর দিকের কিছু চলচ্চিত্রকাররাও পরীক্ষামূলকভাবে গতানুগতিক ধারার বাইরে কিছু দেখানোর জন্য চলচ্চিত্র নির্মানে উদ্ধুদ্ধ হন এবং সৃষ্টি হয় এই ঘরানার।  মূর্ত থেকে নিমেষেই বিমূর্তে প্রত্যাবর্তন, মানুষের মনের অবচেতন সব অনুভূতি, মনোবাস্তবতা, যৌনতা এ সমস্ত কিছুই আলোচিত হয় আভা গার্দ চলচ্চিত্রগুলোতে। চলচ্চিত্র যে গৎবাঁধা দেড়-দু ঘন্টা নয়, যে কোন দৈর্ঘ্যেরই হতে পারে তা প্রথম প্রতিষ্ঠা করে দেখান আভা গার্দ কিংবা এক্সপেরিমেন্টাল চলচ্চিত্রকারেরা। এই ধারার স্রষ্টাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন লুই বুনুয়েল, রেনে ক্লেয়ার ও জ্যাঁ রেনোয়া। 

সুরিয়ালিজম বা পরাবাস্তবতা, এক্সপ্রেসনিজম, দাদাইজম সহ নানাবিধ ইজম এর উৎপত্তি হয়েছে এ সময়টাতেই।

দর্শকদের সাধারণ ভাবনাকে ধাক্কা দিয়ে নতুন কিছু দেখানোর প্রবণতা লক্ষ করা যায় এই চলচ্চিত্র ধারাতে। নির্মাতা রেনে ক্লেয়ার ‘প্যারি কি দর্ত’ (১৯২৮), ‘আর্ত্রাকৎ’ (১৯২৪), ‘অ্যান ইটালিয়ান স্ট্র হ্যাট’ (১৯২৭), ‘আন্ডার দ্য রুফস ইন প্যারিস’ (১৯৩০) সহ নানা চলচ্চিত্রের এর মাধ্যমে তিনি তৈরি করেছেন চলচ্চিত্রের নতুন এক আঙ্গিক যাকে ‘সুররিয়ালিষ্ট কমেডি’ বলা হয়। তবে আরেক নির্মাতা লুই বুনুয়েল কিংবদন্তী চিত্রকর সালভাদর দালির লেখনীতে যে চলচ্চিত্রটি নির্মান করলেন তাকে আভা গার্দ চলচ্চিত্র ঘরানার শ্রেষ্ট বিজ্ঞাপন হিসেবে ধরা হয়। ‘অ্যান আন্দালুসিয়ান ডগ’ বা ‘আ শিয়েঁ আন্দালু’ (১৯২৮) চলচ্চিত্রে ক্ষুর দিয়ে চোখ কেটে ফেলার দৃশ্য দর্শকমনকে চমকে দিতে যথেষ্ট। ওদিকে চলচ্চিত্রকার জ্যাঁ রেনোয়া তার ‘দ্য গ্রান্ড ইলিউশন’ (১৯৩৭) এবং ‘দি রুলস অব দি গেম’ (১৯৩৯) এর মাধ্যমে আভা গার্দ ধারায় নতুন একটি মাত্রা যুক্ত করেছেন। অন্য একটি প্রসঙ্গে বলে রাখা ভালো, এই রেনোয়ার দ্য রিভার চলচ্চিত্রে এক সময়ে সহকারী হিসেবে কাজ করেন এ উপমহাদেশের কিংবদন্তী চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়, সত্যজিতের প্রথম দিককার চলচ্চিত্রভাবনায় রেনোয়ার যথেষ্ট প্রভাব বিদ্যমান ছিলো। রেনোয়ার একটি বিশেষ দিক হচ্ছে মঞ্চ নাটকের বহুল ব্যবহৃত অনুসঙ্গ Mise-en-scène জিনিসটি তিনি চলচ্চিত্রে ব্যবহারে সার্থকতা আনেন। Mise-en-scène হচ্ছে ব্লকিং বা দৃশ্যকে এর মাধ্যমে খন্ড খন্ড ভাগ করার মাধ্যমে ক্যামেরায় দৃশ্যটি সাজানো। টানা লম্বা শট দিয়ে গোটা দৃশ্যকে একযোগে দেখানোও এই অনুসঙ্গের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত।

অন্যদিকে প্রামাণ্যচিত্র চলচ্চিত্র শিল্পমাধ্যমের এমন এক ধারা যেটি বরাবরই কল্পিত গল্পকথনের চেয়ে বাস্তবতা নিরীক্ষণকেই বেশী প্রাধান্য দিয়েছে। লুমিয়ের ভ্রাতাদ্বয়ের ধারনকৃত সেই চলচ্চিত্রগুলোই বিশ্বে প্রামাণ্যচিত্র নির্মানের পথিকৃৎ হিসেবে কাজ করেছে। প্রামাণ্যচিত্র বা ডকুমেন্টারী শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন জন গিয়ারসন, ১৯২৬ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি নিউইয়র্ক সান পত্রিকায়। তিনি দি মুভিগোয়ার ছদ্মনামে রবার্ট ফ্ল্যাহার্টির চলচ্চিত্র ‘মোয়ানা’ (১৯২৬) সম্পর্কে আলোচনা প্রসঙ্গে এই শব্দটির ব্যবহার করেন। উল্লেখ্য প্রামাণ্যচিত্রে রবার্ট ফ্ল্যাহার্টির অবদান অসামান্য। ১৯২২ সালে তার নির্মিত নানুক অব দ্য নর্থ একটি প্রথম দিককার আদর্শ প্রামাণ্যচিত্র হিসেবে গন্য করা হয়। এছাড়াও ফ্লাহার্টি নির্মিত ‘মোয়ানা’ (১৯২৬), ‘ম্যান অব আরান’ (১৯৩৪) আলাদা গুরুত্ব বহন করে। এই উপমহাদেশে বিশ শতকের প্রথম দশকে অবিভক্ত বাংলার প্রথম প্রামাণ্যচিত্রগুলো নির্মান করেন হীরালাল সেন। অবশ্য সেগুলো অগ্নিকান্ডে বিনষ্ট হয়ে যায়। 

চলুন আভা গার্দ ঘরানা কিছু উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র ও একটি বিশেষ প্রামাণ্যচিত্র নিয়ে বিস্তারিত জেনে আসা যাকঃ

অ্যান আন্দালুসিয়ান ডগ (১৯২৯)

আক্ষরিক অর্থে এ চলচ্চিত্রের কোন ধারাবাহিক অর্থ নেই। পরিচালক লুই বুনয়েলের উপস্থিতি দিয়ে চলচ্চিত্রটি শুরু হয় এবং কিছুক্ষণ পরই ছবির গল্প একলাফে আট বছর এগিয়ে যায়। ক্ষুর দিয়ে এক নারীর চোখ কাটা, হাতের তালুর গর্তে পিপড়ের আস্তানা, বগলের লোম থেকে সমুদ্র সৈকত, পিয়ানোর মধ্যে মৃত পঁচা গাধার শরীর সহ নানা বিমূর্ত সব দৃশ্যসম্বলিত চলচ্চিত্র অ্যান আন্দালুসিয়ান ডগ। চিত্রকর সালভাদর দালি ও পরিচালক লুই বুনিয়েল একদিন এক রেস্তোরায় বসে নিজেদের কিছু অদ্ভুত স্বপ্ন ও ভাবনার কথা বলছিলেন। বুনুয়েল স্বপ্নে দেখে মেঘ চাঁদকে টুকরো করছে, বিষয়টা যেন রেজার ব্লেড দিয়ে চোখকে টুকরো করার মতন। জবাবে দালিও জানায় পিপড়ের হাতের মধ্য থেকে হেটে যাওয়ার গল্প। দুজনের এসব ভাবনাকে এক করে তারা নির্মান করেন চলচ্চিত্রটি যা আভা গার্দ আন্দোলনের সেরা সুরিয়ালিষ্ট চলচ্চিত্র হিসেবে স্থান করে নিয়েছে। চলচ্চিত্রটির আইকনিক শট নারীর চোখ কাটা দৃশ্যতে মূলত নারীর বদলে এক বাছুরের চোখ কাটা হয়েছিলো, তবে হাই এক্সপোজার ব্যবহার করায় এবং চলচ্চিত্রদৃশ্যে টানটান উত্তেজনার জন্য এটি দর্শকরা ধরতেই পারেনি। মজার ব্যাপার হলো চলচ্চিত্রটি যেদিন ফ্রান্সে মুক্তি পায় সেদিন দালি ও বুনুয়েল পকেট ভর্তি রেখেছিলেন পাথরে যাতে দর্শকরা ক্ষেপে গেলে তারা এগুলো দিয়ে তাদের আত্মরক্ষা করতে পারেন। তবে দর্শকরা যখন ছবিটি উপভোগ করা শুরু করলো তখন কিছুটা মর্মহতই হলেন তারা, সেই বিকেলটাই যেন উত্তেজনাহীন হলো তাদের মতে। চলচ্চিত্রটি প্যারিসে মুক্তির পর টানা আট মাস প্রেক্ষাগৃহে চলেছিলো।

দ্য গ্রান্ড ইলিউশন (১৯৩৭)

চলচ্চিত্রকার জ্যাঁ রেনোয়া পরিচালিত দ্য গ্রান্ড ইলিউশন মূলত প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে গড়ে উঠেছে। ব্রিটিশ সাংবাদিক নর্মান এঙ্গেলের একই নামের বই থেকে এ চলচ্চিত্রটির নামকরন করা হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে একদম ফরাসী যোদ্ধা যুদ্ধবন্দী হয়। তবে তারা পালাতে চাইলে তখন নিজেদের মধ্যেই শুরু হয় দ্বন্দ্বযুদ্ধ। দ্য গ্রান্ড ইলিউশন চলচ্চিত্রটিকে একটি মানবতার দলিল বলে গণ্য করা হয়। ছবিটি ১৯৩৮ সালে শ্রেষ্ঠ বিদেশী ভাষার চলচ্চিত্র হিসেবে অস্কারে প্রথমবারের মত মনোনয়ন পায়। তবে নাৎসি সরকার তার এই চলচ্চিত্রটির প্রিন্ট ধ্বংসের আদেশ জানিয়েছিলো। তবে ভাগ্যক্রমে ১৯৫৮ সালে এই চলচ্চিত্রের একটি প্রিন্ট খুঁজে পাওয়া যায়। মজার ব্যাপার হলো পরিচালক রেনোয়া প্রথম বিশ্বযুদ্ধে বৈমানিক থাকার দরুন তার ব্যবহৃত উর্দিটিই ছবির এক অভিনেতা পরেছিলেন। বিখ্যাত পরিচালক উডি অ্যালেনের মতে, এটি সর্বকালের সেরা একটি চলচ্চিত্র।

দি রুলস অব দি গেম (১৯৩৯)

দি রুলস অব দি গেম মূলত সমাজের নানা স্তরের রুলস বা নিয়ম। যদি আপনি এই নিয়মের ব্যত্যয় ঘটান তবে আপনার উপর ঘনিয়ে আসা সকল অশান্তির দায়িত্ব আপনার। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধপূর্ব ফরাসী উচ্চবিত্ত জীবনের গল্প নিয়ে গড়ে উঠেছে জ্যাঁ রেনোয়ার বিখ্যাত এই অন্য চলচ্চিত্রটির। চলচ্চিত্রটির মূল উপন্যাস রম্য হলেও ছবিটি রেনোয়া বানিয়েছেন ট্রাজিক স্যাটায়ার ধাঁচে। প্রেম-বঞ্চনা, বাস্তবতা-কাব্যিকতা, আনন্দ-বেদনা সবই দেখানো হয়েছে প্রায় ১১০ মিনিট দৈর্ঘ্যের এই ছবিটিতে।  আর এ ছবির কারিগরি দিক থেকেই সুনির্মিত চলচ্চিত্র। এতে ব্যবহৃত ডিপ ফোকাস চলচ্চিত্রের বিদ্যালয়গুলোতে গুরুত্ব সহকারে পড়ানো হয়। চলচ্চিত্রের ফ্রেমের ফোরগ্রাউন্ডের সাথে ব্যাকগ্রাউন্ডও যে সমান গুরুত্বপূর্ণ তা এই চলচ্চিত্রের মাধ্যমে প্রতীয়মান হয়। চলচ্চিত্রটিতে সেদেশের সমাজের উচ্চবিত্তদের জীবনাচারনে অঙ্গুলিনির্দেশের জন্য ফরাসী সরকার দীর্ঘদিন ছবিটি নিষিদ্ধ করে রেখেছিলেন।

নানুক অব দ্য নর্থ (১৯২২)

মার্কিন নির্মাতা রবার্ট ফ্ল্যাহার্টি পরিচালিত নানুক অব দ্য নর্থ চলচ্চিত্রটি একটি নির্বাক প্রামাণ্যচিত্র। দক্ষিন মেরুতে তীব্র শীতে সেখানকার বসবাসকারীদের টিকে থাকার লড়াই ছবির মূল উপজীব্য। চলচ্চিত্রটির প্রধান চরিত্র নানুক মূলত ইউনুক জাতিগোষ্টির সদস্য। ছবিতে দেখানো হয়েছে নানুকদের ঐতিহ্যবাহী বরফের ঘর ঈগলু বানানোর পদ্ধতি, মাছ ধরার আদি কৌশল, সঙ্গে শিল ও সিন্ধুঘটক শিকার। তবে ফ্ল্যাহার্টির মতে প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতাকে সত্যি তুলে ধরতে নানা কৌশলের পথ অবলম্বন করতে হয়। তাইতো তিনি কৃত্রিমভাবে চলচ্চিত্রটির কিছু দৃশ্যধারন করেছিলেন। যদিও এই পন্থা অবলম্বনের জন্য তাকে সমালোচিতও হতে হয়। পরিচালকের মতে এই ছবির প্রধান খলনায়ক বৈরি আবহাওয়া যা তাকে চলচ্চিত্রের দৃশ্যধারনে অনেকখানি বাধাগ্রস্থ করেছিলো। এই প্রামাণ্যচিত্রের চিত্রায়ন নিয়ে পরবর্তীকালে আবার ‘কাবলোনাক’ (১৯৯৪) নামে একটি চলচ্চিত্র নির্মিত হয় যেখানে পরিচালক ফ্লাহার্টির ভূমিকায় অভিনয় করেছে চার্লস ডান্স ও নানকের ভূমিকায় তারই এক আত্মীয় যার নাম কুইসিয়াক ইনুকপুক।
লেখাটি ভোরের কাগজে পূর্বপ্রকাশিত

লেখকের অনুমতি ছাড়া সাইটে ব্যবহৃত সকল প্রকার লেখা পুনঃপ্রকাশ বেআইনি। জরুরী যোগাযোগে ইমেইলঃ altamishnabil@gmail.com

আরো পড়ুন...