সিনেমা শুরুর গপ্পঃ জার্মান এক্সপ্রেশনিজম-২

সারাবিশ্বে যখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধের দামামা তুঙ্গে, তার কিছুটা আগেই আনুমানিক ১৯১০ এর দিকে জার্মানে একটি সৃজনশীল আন্দোলন শুরু হয় যাকে জার্মান এক্সপ্রেশনিজম বলে অভিহিত করা হয়। শিল্পকলার বিভিন্ন দিক যেমন স্থাপত্য, নাচ, চিত্রকলা, মঞ্চ, ভাস্কর্য এবং চলচ্চিত্রে এই মুভমেন্ট বা আন্দোলনটি সংঘটিত হতে দেখা যায়। চলচ্চিত্রে এই মুভমেন্ট এর প্রভাব মূলত ১৯১৯ থেকে ১৯২৪ সাল পর্যন্ত চলে, এরপর আস্তে আস্তে ধারাটি বিনষ্ট হতে থাকে। তৎকালীন জার্মানের ভেঙ্গে পড়া অর্থনীতি, রাজনৈতিক নৈরাজ্য, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানদের পরাজয়ের গ্লানি এই ধারা সৃষ্টিতে সাহায্য করে। অবশ্য ১৯২৬ সালে জার্মান সরকার কর্তৃক বিদেশী চলচ্চিত্র নিষিদ্ধকরণ এই চলচ্চিত্র ধারা সৃষ্টির অন্যতম প্রধান প্রভাবক হিসেবে কাজ করছে।
এক্সপ্রেশনিষ্ট এই চলচ্চিত্রগুলোতে ব্যবহৃত হতো সম্পুর্ন অন্য ধাঁচের বাস্তবতা বিবর্জিত লাইটিং, অপ্রতিসম ক্যামেরা অ্যাঙ্গেল, আলো ছায়ার উচ্চ বৈসাদৃশ্য। সর্বোপরি এমন এক দুনিয়া যার সঙ্গে বাস্তবের আদতে কোন মিল নেই।

দ্য লাষ্ট লাফ (১৯২৪)

উইলিয়াম মুরনাউ পরিচালিত জার্মান এক্সপ্রেশনিজম যুগের আরেকটি উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র দ্য লাষ্ট লাফ। হোটেলের এক সাধারণ দ্বাররক্ষক এর কাহিনী নিয়ে নির্মিত চলচ্চিত্রটি কারিগরি দিক দিয়ে নতুন কিছু মাত্রা যুক্ত করেছে। ছবিতে প্রথমবারের মত ব্যবহৃত হয়েছে ট্রাকিং শট অর্থাৎ ক্যামেরায় প্লাটফর্ম লাগিয়ে ক্যামেরাটিকে সামনে যুক্ত করা, এছাড়া হ্যান্ডহেল্ড শট সহ আধুনিক চলচ্চিত্রধারনের নানা সব কৌশল। ছবিটির জার্মান টাইটেলটির অর্থ হচ্ছে ‘শেষ ব্যক্তি বা লাষ্ট ম্যান’। লেখক, চলচ্চিত্র গবেষক স্টিফেন ব্রোকম্যান ছবিটির প্লটকে এক লাইনে ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে, “একজন নামহীন হোটেল দ্বাররক্ষক চাকরি হারায়।” ১৯২৪ সালে মুক্তি পাওয়া চলচ্চিত্রটি আবার ১৯৫৫ সালে পূননির্মিত হয়।

মেট্রোপলিস (১৯২৬)

এক্সপ্রেশনিষ্ট চলচ্চিত্র ধারার সফল রুপকার ফ্রিজ ল্যাঙ্গ পরিচালিত মেট্রোপলিস মূলত একটি সায়েন্স ফিকশন চলচ্চিত্র। সেই সময়ের সবচেয়ে ব্যয়বহুল এই ছবিটি নির্মান করতে সে সময়ে খরচ হয়েছিলো প্রায় ৫.৩ মিলিয়ন রেইচমার্ক যা ছবিটির প্রযোজনা সংস্থা ইউনিভার্সাল ফিল্মকে দেউলিয়া বানিয়ে দিয়েছিলো। ছবিটিতে প্রায় ৩৭ হাজার সহশিল্পী ব্যবহার করা হয়েছে। ছবিতে আলোচিত হয়েছে শ্রমিক ও মালিক পক্ষের দ্বন্দ্ব এবং পুজিবাদী সমাজ ব্যবস্থা। ছবির কাল্পনিক মেগা সিটি মেট্রোপলিসে দুই শ্রেণীর লোককে বাস করতে দেখা যায় যার একদম আকাশছোয়া অট্টালিকায় বসে শাসনকার্য চালায়, আরেকটি দল মাটির নিচে দিনরাত রোবটের মত খেটে মরে। ছবিটি ভবিষ্যতের আদলে করা যার মূলভাবনা পরিচালক ল্যাঙ্গ এর মাথায় তখনই আসে যখন তিনি সমুদ্রের ডেক থেকে আলোকসজ্জিত নিউইয়র্ক শহর দেখছিলেন। শোনা যায় এটি হিটলারের একটি ব্যক্তিগত পছন্দের চলচ্চিত্র ছিলো।

এম (১৯৩১)

১৯৩১ সালে মুক্তি পাওয়া এম চলচ্চিত্রটি আদতে এক্সপ্রেশনিষ্ট ছবি কিনা তা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও ফ্রিজ ল্যাঙ্গের অনবদ্য এ ছবিটি পরবর্তী প্রজন্মের সিরিয়াল কিলার ঘরানার চলচ্চিত্রগুলোকে যথেষ্ট প্রভাবিত করেছে। জনপ্রিয় পরিচালক আলফ্রেড হিচকক তার বিখ্যাত ছবি সাইকো, বার্ডস এই ছবিটি দেখে নির্মান করতে অনুপ্রাণিত হন। এটিই ল্যাঙ্গের পরিচালিত প্রথম সবাক চলচ্চিত্র। ছবিতে সিরিয়াল কিলার হ্যান্স বেকার্টের ভূমিকায় অভিনয় করেন পেটার লরে। হ্যান্স শহরের শিশুদের প্রথম মাত্রারিক্ত পরিমানে আসক্ত এবং এই আসক্তি থেকেই তিনি একের পর এক শিশু খুন করে। তবে পরিচালকের কারিশমায় দর্শক শুরুর দিকে খুনির মুখ দেখতে পায়না, দেখানো হয় তার ছায়া কিংবা শরীরের অন্যান্য অংশকে। ধারণা করা হয় এটি ১৯২০ এর দিকে ঘটে যাওয়া এক সিরিয়াল কিলার এর সত্য ঘটনা অবলম্বনে তৈরি হয়েছে, যদিও পরিচালক ব্যাপারটিকে স্বীকার করেননি।

লেখাটি ভোরের কাগজে পূর্বপ্রকাশিত

লেখকের অনুমতি ছাড়া সাইটে ব্যবহৃত সকল প্রকার লেখা পুনঃপ্রকাশ বেআইনি। জরুরী যোগাযোগে ইমেইলঃ altamishnabil@gmail.com

আরো পড়ুন...