লেখক ফ্রান্ৎস কাফকার উপন্যাস দ্য মেটামরফোসিস কিংবা চিত্রকর এডভার্ড মুঙ্খ এর কালজয়ী চিত্রকর্ম দ্য স্ক্রিম এর সঙ্গে আমরা সবাই কমবেশী পরিচিত। সারাবিশ্বে যখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধের দামামা তুঙ্গে, তার কিছুটা আগেই আনুমানিক ১৯১০ এর দিকে জার্মানে একটি সৃজনশীল আন্দোলন শুরু হয় যাকে জার্মান এক্সপ্রেশনিজম বলে অভিহিত করা হয়। শিল্পকলার বিভিন্ন দিক যেমন স্থাপত্য, নাচ, চিত্রকলা, মঞ্চ, ভাস্কর্য এবং চলচ্চিত্রে এই মুভমেন্ট বা আন্দোলনটি সংঘটিত হতে দেখা যায়। চলচ্চিত্রে এই মুভমেন্ট এর প্রভাব মূলত ১৯১৯ থেকে ১৯২৪ সাল পর্যন্ত চলে, এরপর আস্তে আস্তে ধারাটি বিনষ্ট হতে থাকে। তৎকালীন জার্মানের ভেঙ্গে পড়া অর্থনীতি, রাজনৈতিক নৈরাজ্য, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানদের পরাজয়ের গ্লানি এই ধারা সৃষ্টিতে সাহায্য করে। অবশ্য ১৯২৬ সালে জার্মান সরকার কর্তৃক বিদেশী চলচ্চিত্র নিষিদ্ধকরণ এই চলচ্চিত্র ধারা সৃষ্টির অন্যতম প্রধান প্রভাবক হিসেবে কাজ করছে।
এক্সপ্রেশনিষ্ট এই চলচ্চিত্রগুলোতে ব্যবহৃত হতো সম্পুর্ন অন্য ধাঁচের বাস্তবতা বিবর্জিত লাইটিং, অপ্রতিসম ক্যামেরা অ্যাঙ্গেল, আলো ছায়ার উচ্চ বৈসাদৃশ্য। সর্বোপরি এমন এক দুনিয়া যার সঙ্গে বাস্তবের আদতে কোন মিল নেই। আর চলচ্চিত্রগুলোতে মূলত মানুষের পাগলামি, বাতুলতা সহ মনের কালো দিকগুলো নিয়ে আলোচনা করা হতো। নির্মিত চলচ্চিত্রগুলোর চিত্রনাট্য, সেট ডিজাইনে এই মুভমেন্টের আর্টগুলোও আলাদা করে গুরুত্ব পেতো।
এই যুগের প্রধান চলচ্চিত্র নির্মাতারা হলেন ফ্রিজ ল্যাঙ্গ, রবার্ট ওয়াইন, উইলিয়াম পাবষ্ট ও উইলিয়াম মুরনাউ। এরমধ্যে ফ্রিজ ল্যাঙ্গকে ব্রিটিশ ফিল্ম ইনষ্টিটিউট ‘মাষ্টার অব ডার্কনেস’ নামে অভিহিত করেছেন। ল্যাঙ্গের ছবিগুলোতে সর্বদা সমাজে ক্ষয়ের দিকগুলো নিয়ে আলোচনা করা হয়। ডাঃ মাবুজে (১৯২২) ছবি দিয়ে তার এই এক্সপ্রেশনিষ্ট ধারায় প্রবেশ। পরবর্তীকালে তিনি নির্মান করেছেন মেট্রোলপিস (১৯২৬), ডাঃ মাবুজের পরের দুইটি পর্ব, এম (১৯৩১)। এছাড়াও নির্মাতা রবার্ট ওয়াইন নির্মিত দি ক্যাবিনেট অব ডঃ ক্যালিগরী (১৯২০) এক্সপ্রেশনিষ্ট চলচ্চিত্র ইতিহাসের অন্যতম আইকনিক চলচ্চিত্র হিসেবে ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নিয়েছে। এই চলচ্চিত্র ধারা বিনষ্ট হয়ে যাওয়ার পরও এর প্রভাব লক্ষ করা গিয়েছে নানা সময়ে। আলফ্রেড হিচকক, টিম বার্টনের চলচ্চিত্রগুলো তারই প্রমাণ।
চলুন জেনে নেয়া যাক কয়েকটি উল্লেখযোগ্য জার্মান এক্সপ্রেশনিষ্ট চলচ্চিত্রের বিস্তারিত।
দি ক্যাবিনেট অব ডঃ ক্যালিগরী (১৯২০)

জার্মান এক্সপ্রেশনিষ্ট চলচ্চিত্রের নাম আসলে সবার আগেই যে ছবিটি বারবার উচ্চারিত হয় তার নাম দি ক্যাবিনেট অব ড. ক্যালিগরী। নির্বাক ভৌতিক ধাঁচের এ ছবিটি পরিচালনা করেছেন রবার্ট ওয়াইন ও লিখেছেন হ্যান্স জানোভিজ ও কার্ল মায়ার। ছবিতে ডঃ ক্যালিগরীর ভূমিকায় অভিনয় করেছেন ভার্নার ক্রুস। ছবির গল্পে দেখা যায় ডাঃ ক্যালিগরি নামের এক পাগলাগারদের ডাক্তার ঘুমন্ত অবস্থায় হাটতে পারা এক যুবক সিজারকে দিয়ে শহরে হত্যাকান্ড চালায়। তবে ছবির শেষেই আবার আবিস্কার হয় এসব মূলত গল্পকথকেরই ভ্রম। বিকৃত মানসিকতার ক্যালিগরি ও সিজারের দৃশ্যগুলোকে ফুটিয়ে তুলতে এর চিত্রায়ন ও দৃশ্য সজ্জায় ইচ্ছাকৃত বিকৃতি লক্ষ করা যায়। ছবিটির প্রযোজক প্রথমে ছবিটি ফ্রিজ ল্যাঙ্গকে নির্মানের আহ্বান জানালে তিনি ব্যস্ত থাকায় এটি নির্মানের দ্বায়িত্ব পান রবার্ট ওয়াইন।
নোসফেরাতু (১৯২২)

উইলিয়াম মুরনাউ পরিচালিত নোসফেরাতু একটি ভৌতিকধর্মী চলচ্চিত্র যা মুক্তি পায় ১৯২২ সালে। আইরিশ লেখক ব্রাম স্টোকারের গোথিক হরর উপন্যাস ড্রাকুলা অবলম্বনে নির্মিত হয়েছিলো এই চলচ্চিত্রটি। যদিও ছবিটি নির্মানের সময় কাউন্ট ড্রাকুলা চরিত্রটির নাম পরিবর্তন করে কাউন্ট অরলক করেন, কারণ ছবিটির প্রযোজনা সংস্থা ড্রাকুলার কপিরাইট নিতে ব্যর্থ হন। মজার বিষয় হলো এ বিষয় নিয়ে মামলা মোকাদ্দমার পর অবশেষে আদালতের নির্দেশে ছবিটির সকল কপি নষ্ট করে দিতে বলা হয়। তবে বেঁচে যায় একটি কপি, যার বদৌলতে আজকের দর্শক দেখতে পারছে ছবিটি। ছবির গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্যে ছায়ার ব্যবহার ছবিতে আলাদা মাত্রা যোগ করেছে।
চলবে…
লেখাটি ভোরের কাগজে পূর্বপ্রকাশিত
লেখকের অনুমতি ছাড়া সাইটে ব্যবহৃত সকল প্রকার লেখা পুনঃপ্রকাশ বেআইনি। জরুরী যোগাযোগে ইমেইলঃ altamishnabil@gmail.com
