সিনেমা শুরুর গপ্পঃ হলিউড ক্লাসিক (পর্ব ১)
আনুমানিক ১৯১৫-১৭ থেকে শুরু করে ১৯৬০-৬৯ এর সময়কালকে হলিউডের ক্লাসিক যুগ বা স্বর্ণযুগ বলে অভিহিত করেন চলচ্চিত্র বিশ্লেষকেরা। এ সময়ের উল্লেখযোগ্য কিছু ক্লাসিক চলচ্চিত্র নিয়ে আলোচনা করা হলো।
গন উইথ দ্য উইন্ড (১৯৩৯)
আমেরিকান মহাকাব্যিক ঐতিহাসিক রোমান্টিক চলচ্চিত্র গন উইথ দ্য উইন্ড মার্গারেট মিচেলের পুলিৎজার-বিজয়ী ১৯৩৬ সালের একই নামের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত। ছবিটির চিত্রনাট্য রচনা করেছেন সিডনি হাওয়ার্ড এবং চলচ্চিত্রটি পরিচালনা করেছেন ভিক্টর ফ্লেমিং। মার্কিন গৃহযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে জর্জিয়ার এক তুলা বাগানের প্রেক্ষাপটে উক্ত চলচ্চিত্রটি নির্মিত। মজার বিষয় হচ্ছে ছবি মুক্তির তিন বছর আগে থেকেই ছবিটি নিয়ে প্রচারণা চলে। ছবির প্রধান চরিত্রে ক্লার্ক গেবল ও ভিভিয়ান লের অসাধারণ অভিনয় নজর কাড়ে দর্শক সমালোচকদের। অস্কার পুরস্কারে ১৩ টি মনোনয়ন পেয়ে ১০ টি থেকেই পুরস্কার জিতে নেয় ২৩০ মিনিট দৈর্ঘ্যের গন উইথ দ্য উইন্ড যার মধ্যে ছিলো সেরা পরিচালকের পুরস্কার। হলিউড ইতিহাসে প্রথম এ ছবিতেই নারী চরিত্র প্রাধান্য পেয়েছে, ভিভিয়ান লের দৃষ্টিকোণ থেকে ফুটে উঠেছে গৃহযুদ্ধের আগের ও পরের অবস্থাগুলো।
উইজার্ড অব ওজ (১৯৩৯)
তালিকার পরবর্তী ছবিটিও পরিচালনা করেছেন নির্মাতা ভিক্টর ফ্লেমিং। একই বছর ফ্লেমিং এর দুটি ছবি মুক্তি পায় এবং অস্কারে সেরা পরিচালক হিসেবে তিনি দুটি ছবির জন্যই মনোনয়ন পান। অবশ্য নিজের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হয় গন উইথ দ্য উইন্ড এবং পরিচালক হিসেবে একটি মজবুত আসনে বসেন তিনি। ফ্র্যাঙ্ক বাউমের ১৯০০ সালে রচিত শিশুতোষ দ্য ওয়ান্ডারফুল উইজার্ড অব অজ বই অবলম্বনে নির্মিত এই চলচ্চিত্রে টর্নেডোতে ছোট্ট মেয়ে ডরোথির বাড়ি হারানো, ঝড়ে উড়ে গিয়ে অচেনা দেশে হারিয়ে যাওয়া এবং বাড়ি ফেরার প্রাণান্তকর চেষ্টার গল্প ফুটে উঠেছে এ চলচ্চিত্রে। ফ্যান্টাসী ঘরানার ছবি হিসেবে এর পোষাক পরিকল্পনা, সাজসজ্জা, সেট ডিজাইন প্রভৃতি বিষয়গুলো ছিলো অনবদ্য। প্রখ্যাত লেখক সালমান রুশদী তার ১০ বছর বয়সে ছবিটি দেখেন এবং জানান তার লেখক হওয়ার পেছনে মূল প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে চলচ্চিত্রটি।
সিটিজেন কেইন (১৯৪১)
সাইট অ্যান্ড সাউন্ড ম্যাগাজিন এবং আমেরিকান ফিল্ম ইনিষ্টিটিউটের তালিকায় বিশ্বের এক নম্বর শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র তালিকায় নাম রয়েছে সিটিজেন কেইন ছবিটি। আজও বিশ্বের বিভিন্ন কোনায় সর্বকালের সেরা চলচ্চিত্রের তালিকা করলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই চলচ্চিত্রটি শীর্ষস্থান দখল করে নেয়। চলচ্চিত্রটি মূলত তার উদ্ভাবনী চিত্রগ্রহণ, সঙ্গীত এবং ন্যারেটিভ কাঠামোর জন্য প্রশংসিত। ছবিতে বর্নিত হয় চার্লস ফস্টার কেইন নামের এক সংবাদপত্র জগতের মুকুটহীন সম্রাটের গল্প নিয়ে নির্মিত। তবে এই কেইন চরিত্রটি আদতে মার্কিন সংবাদপত্র মালিক ও ব্যবসায়ী উইলিয়াম র্যানডল্ফ হার্স্ট, শিকাগোর ধনকুবের স্যামুয়েল ইনসাল ও হ্যারল্ড ম্যাকরমিক এবং কিছুটা ওয়েলসের নিজের জীবনী অবলম্বনে নির্মিত। ছবিতে দেখা যায় মৃত্যুর সময়ে শুধু একটি শব্দই উচ্চারন করে কেইন যা হলো রোজবাড (গোলাপ কুড়ি)। তার মৃত্যুর পর কৌতূহলী সাংবাদিক জেরি টমসন কেইনের এই উত্থানের রহস্যগুলো বের করতে থাকে এবং কাহিনী আগায় অনেকটা ন্যারেটিভ ভঙ্গিতে। ছবিতে প্রচুর পরিমানে লো অ্যাঙ্গেল শট ব্যবহার করা হয়েছে। এর প্রতিটি দৃশ্যেই ব্যবহার করা হয়েছে ডিপ ফোকাস লেন্সের যাতে একটি দৃশ্যের সব চরিত্র- উপকরণগুলো এক ফ্রেমেই ধরা পড়ে। সিটিজেন কেইন ছবির সর্বেসর্বা বলতে আসে অরসন ওয়েলস এর নাম যিনি একাধারে ছবিতে মূখ্য চরিত্রে অভিনয়, পরিচালনা, প্রযোজনা ও চিত্রনাট্য করেছেন। প্রাথমিকভাবে মুক্তির পর বক্স অফিসে ভীষণভাবে ব্যর্থ হয় ছবিটি। তত্সত্ত্বেত্ত ৫টি বিভাগে অস্কার জিতে নেয় ছবিটি।
চলবে…
লেখাটি ভোরের কাগজে পূর্বপ্রকাশিত

