সেলুলয়েডে কাকাবাবু

ভারত সরকারের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের একজন প্রাক্তন কর্মকর্তা রাজা রায়চৌধুরী। কিছুদিন সেন্ট্রাল ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশনের (সি.বি.আই) এর উপদেষ্টা হিসেবেও কাজ করেছেন। একবার আফগানিস্তানের এক অভিযানে তার কোন এক বন্ধুকে দুর্ঘটনার কবল থেকে বাঁচানোর চেষ্টায় পঙ্গু হন, তখন থেকে ক্রাচই কাকাবাবুর সবসময়ের সাথী। ভাইপো সন্তু ওরফে সুনন্দ রায়চৌধুরী তার স্যাটেলাইট অর্থাৎ অ্যাসিস্টেন্ট। ভাইপোকে সঙ্গে নিয়ে অসম্ভব সাহসী কাকাবাবু রাজা রায়চৌধুরীকে বিভিন্ন সময়েই দুঃসাহসিক সব অ্যাডভেঞ্চারে জড়িয়ে পড়তে দেখা গেছে। প্রখ্যাত সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় রচিত এই চরিত্রদুটি হয়তো ডিটেকটিভ কিংবা রহস্য রোমাঞ্চ পিপাসু সকল বাঙ্গালীর চেনা। কাকাবাবুকে নিয়ে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় লিখেছেন মোট ৩৬টি উপন্যাস ও ৬টি গল্প। শুধু তাই নয়, নানান সময়ে কয়েকজন নির্মাতা কাকাবাবুকে তুলে এনেছেন সেলুলয়েডে। এ বছরের পুঁজোতেও মুক্তি পাচ্ছে কাকাবাবু সিরিজের নতুন ছবি কাকাবাবুর প্রত্যাবর্তন। পাঠকদের জন্য তাই আজ রইলো সেলুলয়েডে মুক্তিপ্রাপ্ত কাকাবাবুর গল্প।

সবুজ দ্বীপের রাজা (১৯৭৯)

তপন সিংহ দুই বাংলার গুরুত্বপূর্ণ পরিচালকদের মধ্যে অন্যতম। কালজয়ী চলচ্চিত্র কাবুলিওয়ালা, ঝিন্দের বন্দী, গল্প হলেও সত্যি ছাড়াও তার পরিচালনার ক্যারিয়ারে রয়েছে কাকাবাবুকে নিয়ে প্রথম চলচ্চিত্র পরিচালনার অভিজ্ঞতা। ১৯৭৯ সালে তপন সিংহ চলচ্চিত্রায়িত করেন কাকাবাবু সিরিজের দ্বিতীয় উপন্যাস থেকে একই নামের চলচ্চিত্র সবুজ দ্বীপের রাজা। ছবিতে কাকাবাবু চরিত্র দেখা গেছে সত্যজিতের অরণ্যের দিনরাত্রিতে হরির ভূমিকায় অভিনয় করা সমিত ভঞ্জকে। সন্তু চরিত্রে দেখা গিয়েছিলো অরুনাভ অধিকারীকে।

ছবির কাহিনীটি আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের আন্দামানি জাতি জারোয়া অধ্যুষিত অঞ্চলের পটভূমিকায় নির্মিত হয়েছে। কাকাবাবু ও সন্তুকে আন্দামানে একটি গোপন মিশনে অংশ নিতে দেখা যায়। তাদের সঙ্গে একই জাহাজে আন্দামান আসে কুখ্যাত অপরাধী পাঞ্জা তার আরো তিন শাগরেদ। ছবি শেষ হয় জারোয়ার দূর্ভেদ্য দ্বীপের রহস্যভেদের মাধ্যমে।

কাকাবাবু হেরে গেলেন? (১৯৯৫)

কাকাবাবুকে নিয়ে প্রথম চলচ্চিত্র নির্মানের পরে প্রায় ষোল বছরের বিরতি। গোয়েন্দা এই চরিত্রকে নিয়ে পরের দুটো চলচ্চিত্র বানিয়েছেন পিনাকী চৌধুরী। ১৯৯৫ সালে কাকাবাবু হেরে গেলেন থেকে একই নামের চলচ্চিত্র বানালেন পিনাকী। কাকাবাবুর চরিত্রে অভিনয় করতে দেখা গেলো সব্যসাচী চক্রবর্তীকে। আর ছবিটির অন্যতম একটি প্রধান অসীত ধর চরিত্রে দেখা গেলো সৌমিত্র চক্রবর্তীকে। চলচ্চিত্রের শুরুতেই দেখা যায় গোয়ার গির্জার একজন পুরোহিতকে একটি বহুমূল্য জিনিস লুকিয়ে নিয়ে পালাতে। এর বহু বছর পরে কাকাবাবুর এক পরিচিত যার নাম বিমান, তিনি এবং তার ভাইয়েরা তাদের মামাদের বড় পুরোনো বাড়ি সংরক্ষণ করতে না পেরে তা বিক্রি করে দেয়ার পরিকল্পনা করে। তবে বাড়িটি ভেঙ্গে ফেলার আগে বিমান চায় সেখানে অন্তত কাকাবাবুকে ঘুরিয়ে আনতে, যদি ঐতিহাসিক কোন দূর্লভ বস্তু পাওয়া যায় সে আশায়। তাদের সঙ্গে যোগ দেয় অসিত ধর নামের এক পুরোনো জিনিষ সংগ্রাহকের। ছবি জুড়ে চলতে থাকে কাকাবাবু ও অসিত ধরের স্নায়ুযুদ্ধ। কাকাবাবু কে শেষমেশ হেরে গিয়েছিলেন, তার উত্তর রয়েছে ছবিটিতে। ছবিতে সন্তু চরিত্র দেখা গেছে অর্ঘ্য রায়চৌধুরীকে।

এক টুকরো চাঁদ (২০০১)

ছয় বছর বাদে আবারো পিনাকী চৌধুরী নির্মান করলেন নতুন কাকাবাবু এক টুকরো চাঁদ। কাকাবাবু চরিত্র সব্যসাচী থাকলেও বদল হলো সন্তু। চরিত্রটিতে দেখা গেলো বর্তমান সময়ের জনপ্রিয় টলিউড নায়ক সোহম চক্রবর্তীকে। সঙ্গে ছবিতে জোজো চরিত্রের অন্তর্ভুক্তি সিরিজটির এই পর্বে আলাদা হাস্যরসের যোগান দিলো। গল্প হিসেবে বাছা হলো সন্তু ও এক টুকরো চাঁদকে। ছবিতে কাকাবাবুকে আফ্রিকার মুরুন্ডি নামের এক দেশের প্রেসিডেন্টের ভাই সাইমন বুগুম্বার ভারতে এসে নিখোঁজ হবার রহস্যের কিনারা করতে দেখা যায়।

মিশর রহস্য (২০১৩)

পিনাকী চৌধুরীর পর কাকাবাবু নির্মানের দ্বায়িত্ব নিলো সৃজিৎ মুখার্জি। এক টুকরো চাঁদ নির্মানের ঠিক এক যুগ বাদে আবারো রূপালি পর্দায় কাকাবাবুকে ফেরানো হলো প্রযোজনা সংস্থা শ্রী ভেঙ্কেটেশের হাত ধরে। বিশাল আয়োজন ও বাজেট নিয়ে নির্মিত সিরিজটিতে কাকাবাবু চরিত্রে বাছা হলো কলকাতার সুপারস্টার প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়কে। আর সন্তু চরিত্রে দেখা মিললো আরিয়ান ভৌমিকের। মিশর রহস্য উপন্যাসটি থেকে ২০১৩ সালে মুক্তি দেয়া হলো একই নামের চলচ্চিত্রটি। কাকাবাবু এবারে ছুটলেন মিশরের পিরামিডের নিচের হায়ারোগ্লিফিক ভাষার উপর ভিত্তি করে শুরু হওয়া এক রহস্য-রোমাঞ্চকর যাত্রায়। সন্তু চরিত্রে তাকে সঙ্গ দিলো আরিয়ান ভৌমিক। চলচ্চিত্রটির শ্যুটিং হয়েছিলো কায়রো ও দিল্লিতে। হানি আল-কাদি চরিত্রে ইন্দ্রনীল সেনগুপ্তের অনবদ্য অভিনয় ছবিতে আলাদা মাত্রা যোগ করেছে।

ইয়েতি অভিযান (২০১৭)

কাকাবাবুকে নিয়ে মুক্তিপ্রাপ্ত সর্বশেষ চলচ্চিত্র ইয়েতি অভিযান যা ২০১৭ সালে মুক্তি পায়। ছবির কাহিনী হিসেবে বাছা হয়েছে কাকাবাবুর তৃতীয় উপন্যাস পাহাড়চূড়ায় আতঙ্ককে। ছবিটিতে গতবারের মতই প্রসেনজিৎ, আরিয়ান কাকাবাবু ও সন্তুর চরিত্র অভিনয় করে। এছাড়াও বাংলাদেশের মিম ও ফেরদৌসকে ছবিটির দুইটি গুরুত্বপূর্ন চরিত্রে অভিনয় করতে দেখা যায়। ভারতের পাশাপাশি জাজ মাল্টিমিডিয়ার উদ্যোগে ছবিটি বাংলাদেশেও আলাদাভাবে মুক্তি পায়। ছবিতে কাকাবাবু ও সন্তুকে হিমালয়ের কিংবদন্তি ইয়েতি রহস্য উন্মোচন করার অভিযানে নামতে দেখা যায়। ছবির গল্পে কাকাবাবুর সংগ্রহে একটি দাঁত আসে যেটি বিশেষজ্ঞদের মতে হিমালয়ের বহুল প্রচলিত গল্পকথার চরিত্র ইয়েতি’র দাঁত! তারই রহস্য উন্মোচনের নেশায় হিমালয় অভিযানে নেমে পড়ে এই কাকা ভাইপো। ভারত ও সুইজারল্যান্ডে চলচ্চিত্রটির দৃশ্যায়ণ হয় চলচ্চিত্রটির।

বড়পর্দা ছাড়াও ছোটপর্দার জন্য টেলিফিল্ম আকারে নির্মিত হয়েছে কাকাবাবু। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য খালি জাহাজের রহস্য, কাকাবাবু ফিরে এলেন, কাকাবাবু ও ছদ্মবেশী, রাজবাড়ির রহস্য ও কলকাতার জঙ্গলে।

আর্টিকেলটি দৈনিক ভোরের কাগজে পূর্বপ্রকাশিত

লেখকের অনুমতি ছাড়া সাইটে ব্যবহৃত সকল প্রকার লেখা পুনঃপ্রকাশ বেআইনি। জরুরী যোগাযোগে ইমেইলঃ altamishnabil@gmail.com

আরো পড়ুন...