জার্মান ভাষায় সুন্দর একটা শব্দ আছে, ‘Wanderlust’, যার মানে ভ্রমনের নেশা। সেই নেশায় মত্ত হয়ে নিজ ঘর ছেড়ে দেশ থেকে দেশান্তরে পাড়ি জমিয়েছিলেন ইবনে বতুতা, কলম্বাস কিংবা হিউয়েন সাঙ্গ। এমনই আরেক ভ্রমনপাগল মানুষ মনোমোহন মিত্র। নিজ দেশ ভারত ছেড়েছেন প্রায় ৩৫ বছর। পশ্চিমের বিভিন্ন দেশে ভ্রমনের পাট চুকিয়ে এবারে ফিরবেন পূর্বে। তারই বিরতিতে দিল্লী এসে হঠাৎ কলকাতায় থাকা একমাত্র রক্তের সম্পর্কের আত্নীয় ভাগ্নী অনীলা ও তার পরিবারকে দেখার ইচ্ছেপোষন করে একটা চিঠি দিয়ে বসেন। ১৯৫৫ এর দিকে মনোমোহন যখন দেশ ছাড়েন অনীলা তখন কেবল দুই বছরের খুকি। রক্তের সম্পর্কের কোন আত্মীয়ই এখন আর বেঁচে নেই দেখে অনীলার হাতে উপায় নেই বেড়াতে আসতে চাওয়া মামাটি তার জাল নাকি সত্যিকারের মামা তা বের করার। ছবির গল্পটা এখান থেকেই শুরু।
বলছিলাম ১৯৯১ সালে ভারতবর্ষে মুক্তিপ্রাপ্ত সত্যজিৎ রায়ের ক্যারিয়ারের সর্বশেষ ছবি ‘আগন্তুকের’ কথা। সেলুলয়েডের জাদুকর সত্যজিৎ জীবন সায়াহ্নে এসে নির্মান করেছিলেন কতকটা হালকা মেজাজের চলচ্চিত্র। সংলাপনির্ভর এই নাট্য চলচ্চিত্রটিতে মূল চরিত্রে অভিনয় করেছেন উৎপল দত্ত। ছবিতে আরো ছিলেন দীপঙ্কর দে, মমতা শঙ্কর, ধৃতিমান চট্টোপাধ্যায়, রবি ঘোষ। ছবিটি সত্যজিৎ রায় নির্মান করেন তার ছোটগল্প ‘অতিথি’ থেকে। ইন্দো-ফ্রেঞ্চ যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত ছবিটি ১৯৯২ সালে ভারতের সেরা ছবি ও সেরা পরিচালনার জাতীয় পুরস্কার জেতে।
জাপানের বিখ্যাত পরিচালক আকিরা কুরোসাওয়া সত্যজিৎ রায় সম্পর্কে মন্তব্য করেছিলেন, রায়ের সিনেমা না দেখা মানে যেন চাঁদ ও সূর্য্য ছাড়া পৃথিবীকে দেখা! উপমহাদেশের গুণী পরিচালক সত্যজিৎ তার একেক ছবিতে দেখিয়েছেন রহস্য রোমাঞ্চ, ব্যক্তিগত জীবনের ঘাত প্রতিঘাত, রম্যরস, দারিদ্রের কষাঘাত, ভ্রমন ও ইতিহাস হাতরানোর আনন্দ, সমানভাবে শহর ও গ্রামীন জীবন, ব্রিটিশ শাসন, ফ্যান্টাসি এবং জীবনের নানান দিক। আগন্তুকের গল্পে তিনি জীবনবোধের একটা নতুন মাত্রাকে সূক্ষ্মতার সাথে দেখিয়েছেন। যেখানে সভ্যতার সংজ্ঞাকে তিনি দারুনভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন।
ফিরিয়ে দাও এ অরণ্য, লও এ নগর! ছবির প্রধান চরিত্র মনোমোহন মিত্র বিশ্ব চষে বেরিয়েছেন, থেকেছেন আধুনিক সব দেশে! কিন্তু তার বরাবরই পছন্দসই বন্য জীবন। হাইপোডার্মিক সিরিঞ্জ দিয়ে নিজের দেহে ভয়ঙ্কর মাদকরস চালান দিয়ে সমনকে সমন জারি করছে বিশ্বের লক্ষ্য তরুণ, বোতামে টিপ দিয়ে হাজার হাজার মানুষ মারা হচ্ছে, নিশ্চিন্ন হচ্ছে শহর, এগুলোকে সভ্যতা বলে মানেননা তিনি। তিনি মনে করেন নগরকেন্দ্রিক সভ্যতা হচ্ছে বিরাট এক ভাওতা, বন্য সভ্যতাই আসল সভ্যতা। সাওতাল, কোল, নাগা, মুন্ডা, ওরাও সহ নানা উপজাতীদের সাথে কাটিয়েছেন মনোমোহন। বন্য জীবনই তার কাছে আসল জীবন। মানুষে মানুষে বিভেদ সৃষ্টি করে দেখে ধর্ম, জাত মানেননা তিনি। স্ট্রাগলকে তিনি স্ট্রাগল বলেননা, বলেন মগজ-মাংশপেশীর পুষ্টি আর মানুষ চেনার প্রথম পদক্ষেপ। ফেলুদা সিরিজের লালমোহন বাবুর ভাষায় বলা যায়, মনোমোহন মিত্র চরিত্রটা এমন মজার চরিত্র যার সাথে দু-মিনিট মিশলেই মুখ থেকে বেরিয়ে আসে, আপনাকে তো কালটিভেট করতে হচ্ছে মশাই! ছবির সবচেয়ে আকর্ষনীয় অংশ মনোমোহন মিত্রের সাথে অনীলার বরের বন্ধু পৃথ্বীশ সেনগুপ্তের তর্কযুদ্ধ। বৈঠকখানায় চলা সেই চায়ের কাপে ঝড়ের সংলাপগুলো দর্শকরা অবাক বিস্ময়ে মন্ত্রমুগ্ধের মত আজো দেখে! আর সংলাপে হেরে গিয়ে পৃথ্বীশের মনোমোহনকে অপমানের অংশটায় দর্শকমনে মন খারাপের কালো মেঘ নেমে আসে।

১৯৮৩ সালে ঘরে বাইরে ছবিটি নির্মানকালীন সময়ে হঠাৎই হার্ট অ্যাটাক হয় সত্যজিৎ রায়ের। তাইতো তার জীবনের শেষ সিনেমাগুলো তিনি বানিয়েছিলেন ইনডোর গল্পে। গনশত্রু ও শাখা প্রশাখার মত তার আগন্তুক ছবিটিও তাই ইনডোর নির্ভর গল্প দিয়ে নির্মিত। আগন্তুকের গল্প এগিয়ে নিয়ে ২০১৫ সালের দিকে এটির একটি সিক্যুয়েল নির্মানের ঘোষনা দিয়েছিলেন পশ্চিমবঙ্গের নির্মাতা অর্ক সিনহা। ছবির নাম দেয়া হয়েছিলো ‘আগন্তুকের পরে’। আগের ছবিতে অনীলার বাচ্চা সেই ছেলেটি যার নাম ছিলো সাত্যকি, সেই চরিত্রে অভিনয়ের কথা ছিলো আবির চট্টোপাধ্যায়ের। আগের ছবির মত এই ছবিতেও মমতা শঙ্কর, দীপঙ্কর দে ও ধৃতিমান চট্টোপাধ্যায়কে দেখা যাওয়ার কথা ছিলো। কিন্তু বছর কয়েক কেটে গেলেও ছবিটি আলোর মুখ দেখেনি।
আর যা-ই হও, কখনো কূপমন্ডূক হয়ো না! অনীলার ছেলে সাত্যকিকে এই উপদেশ দিয়ে ছবির শেষে তার ভ্রমনপাগল জাল কিংবা আসল দাদু বেরিয়ে পড়েন পৃথিবীর পূর্বদিকটায়। আর তাদের জন্য ফেলে যান একটা খামে মোড়ানো চিঠি। কি ছিলো চিঠিতে, আর লোকটা কি আসলেই অনীলার মামা নাকি জাল কেউ, উত্তর মিলবে ক্লাসিক এই ছবিটিতে।
আর্টিকেলটি দৈনিক ভোরের কাগজে পূর্বপ্রকাশিত
লেখকের অনুমতি ছাড়া সাইটে ব্যবহৃত সকল প্রকার লেখা পুনঃপ্রকাশ বেআইনি। জরুরী যোগাযোগে ইমেইলঃ altamishnabil@gmail.com
