হামি, বাংলাদেশের ভাষায় যা গালে আদরের চুমু। বাল্যকালের সময়ে এটি সত্যিই এক নিষ্পাপ অনুভূতি। কিন্তু সরল, নিষ্পাপ কর্মকান্ডকে যখন আমরা জটিল বানিয়ে ফেলি তখন তারচেয়ে রূঢ়, অসুন্দর বিষয় আর হয়না। এমনই এক বিষয় নিয়ে গেলো বছর ভারতবর্ষে মুক্তি পেয়েছে আলোচিত শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও নন্দিতা রায় পরিচালক জুটির দুষ্টু মিষ্টি বাংলা ছবি ‘হামি’। পশ্চিমবঙ্গের বানিজ্যিক বাংলা চলচ্চিত্রকে গল্পনির্ভর এক নতুন রুপ দেয়া শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও নন্দিতা রায় পরিচালক জুটি বেলাশেষে ও প্রাক্তনে দেখিয়েছিলেন দুই বয়সের দাম্পত্য জীবনের গল্প। পোস্ত ও হামিতে তিনি কাজ করেছেন শিশুদের মনস্তত্ত্ব নিয়ে। হামিতে সাম্প্রতিককালের বেশ কিছু চেনা ঘটনা ফুটে উঠেছে গল্পে-গল্পে।
চলচ্চিত্রটিতে পরিচালকদ্বয় এই সময়ের এক কঠিন সংকটকে তুলে ধরেছেন যেটা এ যুগের প্রত্যেক ছোট সন্তানের বাবা, মা-রা খুব ভালোভাবেই অনুধাবন করবেন। একসময়ে স্কুলের জীবন ছিলো সহজ সরল। সরকারী স্কুলে সন্তানকে পাঠিয়ে বাবা মা-রা নিশ্চিন্তে থাকতেন। শিক্ষকরা পড়াতেন, আদর, শাসন করতেন। সময়ের প্রেক্ষাপটে গুরু-শিষ্যের সম্পর্কটা অনেকটাই বদলে গেছে। বাবা-মা এখন সন্তানকে স্কুলে পাঠিয়ে চিন্তায় থাকে, তার কোন বিপদ হলো না তো, তার মেয়ে শিশুটি স্কুলে নিরাপদ তো, তাদের সন্তানেরা ঠিক শিক্ষাটা পাচ্ছেতো। অবশ্যই মানতে হবে বর্তমান পরিস্থিতিতে এমনটা চিন্তা হওয়া অমূলক নয়, তবে এসব চিন্তা আর গুটিকয়েক খারাপ ঘটনার জেরে আমরা সমগ্র শিক্ষকসমাজ, বিদ্যাপিঠ তথাপি শিক্ষাব্যবস্থাকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দিচ্ছিনাতো। আর বাচ্চারা তো কোমলমতি অনুকরণপ্রিয়। তারা তো শুধু স্কুলের শিক্ষক নয়, বাবা-মা এর কর্মকান্ড থেকেও অনেকখানি শিক্ষাগ্রহণ করে। ব্যাপারখানা যেন আমরা বেমালুম ভুলে যাই। হামি ছবিটি এই দিকটির প্রতি জোরভাবে অঙ্গুলিনির্দেশ করে।
হামি এর গল্পের প্রধান চরিত্র দুইটি; ৬-৭ বছরের দুই শিশু ভুটু ভাইজান আর চিনি। তাদের ভালো নাম যথাক্রমে বোধিসত্ত্ব ও তনুরুচি। বোধিসত্ত্ব খুব পাকা ছেলে, মনে তার কৌতূহলের চুড়ান্ত। স্কুলের মিস, প্রিয় বান্ধবীকে প্রেমনিবেদন করে ফেলে সে! আর তনুরুচি বাবা-মা এর সঙ্গে দিল্লি থেকে কোলকাতা এসে নতুন স্কুলে ভর্তি হয়। ভারী মিষ্টি সভাবের মেয়ে তনুরুচির প্রথম দিন থেকেই বন্ধু হয় বোধিসত্ত্ব। তাদের সারল্যভরা বন্ধুত্ব অভিভাবকদের আতশকাচে ক্রমে জটিল রুপ ধারন করে। চলচ্চিত্রটিতে ভুটুর চরিত্রে অভিনয় করেছে ব্রত এবং চিনির ভূমিকায় ছিলেন তিয়াসা। ছবিতে আরো রয়েছেন তনুশ্রী শংকর, গার্গী রায় চৌধুরী, কনিনীকা, অপরাজিত আঢ্য, চূর্ণি গঙ্গোপাধ্যায় এর পাশপাশি রয়েছেন পরিচালক শিবপ্রসাদ স্বয়ং, খরাজ মুখোপাধ্যায়ের মত অভিনেতারা। অভিনয়ের মাপে প্রত্যেকেই দূর্দান্ত, তবে ছবির আসল ইউএসপি ভুটু আর চিনি। গোটা ছবিতে তাদের সরব সাবলীল উপস্থিতি দর্শকদের অনেকদিন মনে কেটে থাকবে। শিশুদের দিয়ে এমন সাবলীল অভিনয় বের করার দক্ষতাটা দেখেছিলাম সত্যজিৎ রায়, মাজিদ মাজিদির কাজগুলোতে। আরেকটা বিষয় বিশেষভাবে নজর কেড়েছে, অভিনেত্রী চূর্ণী গাঙ্গুলির মুখের সঙ্গে মিলিয়ে দারুণভাবে কাস্টিং করা হয়েছে তিয়াসাকে (চিনি)। আর ব্রত (ভুটুর) বাবা শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের (লাল্টু বিশ্বাসের) গোলগাল মুখের সঙ্গে তার আশ্চর্য সেই মুখের মিল।
খবরের কাগজে খারাপ সংবাদগুলো বেশী করে পড়া, টিভিতে দিনরাত সংবাদের চ্যানেল বেশী করে দেখা, প্রতিদিন বাচ্চার মা-বাবাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ অনুসরণ করা! এসব ঘটনা যেন আমাদের নিত্যদিনের চেনা, তার মধ্য থেকে অসাধারন একটা চলচ্চিত্রের জন্য প্লট বের করে আনার জন্য পরিচালক জুটিকে ধন্যবাদ। হামি ছবিটি যেমনটা না বড়দের, ঠিক ততটাই শিশুদের। পশ্চিমবঙ্গে নায়ক নির্ভরের চেয়ে গল্পনির্ভর ছবির চাহিদা যে দর্শকদের কাছে ঢের বেশী তার প্রমাণ ছবিটি যেটি ৮৫ লক্ষ রুপির বাজেটে নির্মিত হলেও উইকিপিডিয়ার মতে কামিয়ে নিয়েছে প্রায় সাড়ে সাত কোটি রুপি। সঙ্গীত পরিচালক অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায় এর অনিন্দ্য সুন্দর সব গানে হামি হয়েছে আরো অলঙ্কৃত।
সোয়া দুই ঘন্টার ছবিটি শেষ হয়, কিন্তু ভুটু আর চিনির সরল ছেলেমানুষি মনে রয়ে যায়। তাদের চেয়ে আর কে ভালো বোঝাতে পারে, হামি আর চুমু এক নয়..
আর্টিকেলটি দৈনিক ভোরের কাগজে পূর্বপ্রকাশিত
লেখকের অনুমতি ছাড়া সাইটে ব্যবহৃত সকল প্রকার লেখা পুনঃপ্রকাশ বেআইনি। জরুরী যোগাযোগে ইমেইলঃ altamishnabil@gmail.com
