সিনেমা শুরুর গপ্পঃ রুশ বিপ্লব, মন্তাজ ও সোভিয়েত চলচ্চিত্র

ফরাসী শব্দ মন্তাজ এর মানে হলো সম্পাদনা বা কোন কিছুকে জোড়া লাগানো। সিনেমার একটি শটের পর আরেকটি শট জোড়া লাগানোই মন্তাজের সাধারণ সংজ্ঞা। তবে কোন শটের পর কোনটি পর্দায় দেখানো হবে, আর তার ফলে দর্শকমনে কি প্রতিক্রিয়া হবে মন্তাজের অন্তর্নিহিত অর্থটা সেখানেই। বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকেই নতুন আঙ্গিকের চলচ্চিত্র নির্মান শুরু হয় রুশদেশে। ১৯১৭ সালে এ অঞ্চলে সংঘঠিত হয় বিপ্লব। বিপ্লবের পূর্বে রাশিয়ার ছবিগুলো ছিলো তৎকালীন হলিউড চলচ্চিত্রের নিম্নমানের অনুকরণ। তবে বিপ্লবের পরই সোভিয়েত ইউনিয়নের জনক ভ্লাদিমির লেনিন চলচ্চিত্রকে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্প হিসেবে ঘোষণা দেন। এরপরই এ অঞ্চলে সের্গেই আইজেনস্টান, পুদোভকিন, লেভ কুলেশভ, দভচেঙ্কো কিংবা ঝিগা ভের্তভ এর মত নির্মাতার জন্ম হয় যাদের মাধ্যমে চলচ্চিত্র নতুন একটি রুপ পায়।

সম্পাদনা একটি নিরীক্ষার গল্প দিয়ে শুরু করা যায়। তৎকালীন জনপ্রিয় অভিনেতা মোঝুখিনকে নিয়ে লেভ কুলেশভ কিছু শট এর পরীক্ষা করেছিলেন। প্রথমে নেয়া হয়েছিলো মোঝুখিনের নির্লিপ্ত ভঙ্গিমায় একটি শট। এরপর আলাদাভাবে একটি প্লেটে রাখা কিছু খাদ্য, কফিনে শায়িত একটি শিশু এবং শুয়ে থাকা এক রমণীর শট নেয়া হলো। এখন মোঝুখিনের শটটি যখন খাবারের প্লেটের শটের সঙ্গে জুড়ে দেয়া হলো তখন মনে হলো তিনি ক্ষুধার্ত, কফিনের শিশুর সঙ্গে জুড়ে দেয়ায় তাকে শোকার্ত আর রমণীর সঙ্গে তাকে মনে হলো রোমান্টিক। ভিন্ন শটের পাশে একটি অঙ্গভঙ্গি জুড়ে দেয়ার ফলে এক একটি নতুন অর্থ তৈরি হচ্ছে! এই নিরীক্ষাকে চলচ্চিত্র ইতিহাসে কুলেশভ ইফেক্ট নামে অভিহিত করা হয়।

মন্তাজ তত্ত্বের প্রাথমিক প্রবক্তাদের মধ্যে অগ্রগণ্য ছিলেন আরেক সোভিয়েত নির্মাতা সের্গেই আইজেনস্টাইন। কুলেশভের মতে যেভাবে ইঁটের পরে ইঁট সাজিয়ে বাড়ি তৈরী করতে হয়, সেইভাবেই সম্পাদনার মাধ্যমে শটের পরে শট সাজিয়ে ছবিকে নির্মাণ করতে হয়। তবে আইজেনস্টাইন এর সাথে কিছুটা ভিন্নমত পোষণ করতেন। আইজেনস্টাইন মনে করতেন পরস্পর সম্পর্কহীন শটও পরপর দেখিয়ে দর্শকমনে ধাক্কা দেয়া যায় এবং এটির মাধ্যমে দর্শকদের সঙ্গে আলাভাবে যোগাযোগ রক্ষা করা যায়। এই ভাবনার উজ্জ্বল নিদর্শন হল তার নির্দেশিত ছবি ব্যাটেলশিপ পটেমকিন যেটি বিশ্বের অন্যতম সেরা চলচ্চিত্র হিসেবে ইতিহাসের পাতায় ঠাই করে নিয়েছে। আইজেনেষ্টাইনের মতে মন্তাজ চার প্রকার; মেট্রিক, রিদমিক , টোনাল ও ওভারটোনাল। ছবির পর্দায় এর যে কোন একটি কিংবা একাধিক মন্তাজ সহাবস্থানের মাধ্যমে বিমূর্ত কোন ধারনাকে প্রকাশ করা যায়। তবে এটি দেখতে দর্শককেও পর্যাপ্ত পরিমানে বুদ্ধিবৃত্তির প্রয়োগ করতে হবে। এই বুদ্ধিবৃত্তি আর বিমূর্ত ধারণা একীভূত হয়ে যা তৈরি করে তাকে বলা হয় ইন্টেলেকচুয়াল মন্তাজ। অন্যান্য নির্মাতাদের মত আবেগতাড়িত করতে নয়, আইজেনস্টাইন চাইতেন দর্শকদের চিন্তাশক্তিকে নাড়া দিতে।

নির্মাতা আইজেনষ্টাইনের ছবিতে যেখানে মূল চরিত্র হচ্ছে যৌথ জনতা, সেখানে আরেক নির্মাতা পুদোভকিন এর ছবির নায়ক একক ব্যক্তিসত্ত্বা। পুদোভকিন নির্মিত আলোচিত চলচ্চিত্রের নাম মাদার (১৯২৬)। তৎকালীন আরেক চলচ্চিত্র নির্মাতা আলেক্সান্দার দভচেঙ্কোকে বলা হয় চলচ্চিত্রের কবি। ফ্রেম কম্পজিশন, আলোছায়া, স্লো মোশন, প্রখর রাজনৈতিক বক্তব্য ছিলো তার চলচ্চিত্রগুলোতে। ১৯৩০ সালে নির্মিত আর্থ ছবিটি দুনিয়া কাঁপিয়েছে। সোভিয়েত চলচ্চিত্রের সেকালে সবার থেকে যিনি আলাদা ছিলেন তিনি হলেন ঝিগা ভের্তভ যার আসল নাম ডেনিস কাউসম্যান। ঝিগা ভের্তভ এর মানে হচ্ছে ঘুরন্ত লাট্টু, প্রামাণ্যচিত্র নির্মানেই একমাত্র ঝোক আর ক্যামেরা নিয়ে বেরিয়ে পড়ার জন্য তার এমন নাম। তার নির্মিত ম্যান উইথ অ্যা মুভি ক্যামেরা চলচ্চিত্র ম্যাগাজিন সাইট অ্যান্ড সাউন্ডের মতে সর্বকালের ৮ম সেরা চলচ্চিত্র। তিনি শুরু করেন কিনো-আই নামক একটি আন্দোলন যেখানে ক্যামেরাকে একটি চোখের সাথে তুলনা করা হয়। সোভিয়েত চলচ্চিত্র বিভাগের পক্ষ থেকে ঝিগা ভের্তভ, কিনো প্রাভদা ১, ২, ৩ নামে তেইশটি সংবাদচিত্র ধারণের উদ্যোগ নেয় যেটি আধুনিক প্রামান্যচিত্র নির্মানে একটি অগ্রণী ভূমিকা রাখে।

সোভিয়েতের সেকালের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র নিয়ে আলোচনা করা যাক।

ব্যাটেলশিপ পটেমকিন (১৯২৫)

পটেমকিন যুদ্ধজাহাজকে নিয়ে নির্মিত সের্গেই আইজেনস্টাইন পরিচালিত এ চলচ্চিত্রটি বিশ্ব চলচ্চিত্র ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য এক স্থান তৈরি করে নিয়েছে। ১৯০৫ সালের জুন মাস, তখন রুশদেশে চলছিলো জারতন্ত্রের রাজত্ব। যুদ্ধজাহাজ পটেমকিনের নাবিকরা জাহাদের উচুতলার অফিসারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলো। সত্য এই ঘটনাটি অবলম্বনে নির্মিত হয়ে ব্যাটেলশিপ পটেমকিন চলচ্চিত্রটি। ছবিটি মোট পাঁচটি আলাদা অংশে বিভক্ত। প্রথম অংশে আমরা দেখতে পাই জাহাজের নাবিকদের পোকাধরা দূগন্ধ খাদ্য খেতে দেয়া হচ্ছে যা তারা খেতে অস্বীকৃতি জানায়। দ্বিতীয় অংশে জাহাজ বন্দরে পৌছে কিন্তু নিহত হন বিপ্লবের নেতা ভাকুলিনচুক। তৃতীয় অংশে ভাকুলিনচুক এর মৃত্যুর বিচার চেয়ে বিক্ষোভ করে অন্যান্যরা। এরপরের অংশে ওডেসার সিড়িতে গনহত্যায় লিপ্ত হতে দেয়া যায় জারের সৈন্যদের তবে পঞ্চম ও শেষ ভাগে এসব সৈন্য বাহিনীরাই সব ভূলে গিয়ে সাধারণ নাবিকদের সঙ্গে যোগ হয়। সত্য কাহিনী অবলম্বনে নির্মিত হলেও ছবিটিতে বর্ণিত কিছু ঘটনা কাল্পনিক। এরমধ্যে ওডেসার সিড়িতে গনহত্যার দৃশ্যটি কাল্পনিক। আসল ঘটনায় গনহত্যা হয়নি, তবে ফাঁকা গুলি ছোড়া হয়েছিলো। ছবিটিকে ১৯৫৮ সালে ব্রাসেলস বিশ্ব মেলায় সর্বকালের সেরা চলচ্চিত্র হিসেবে ঘোষণা করা হয়। চার্লি চ্যাপলিনেরও অন্যতম পছন্দের চলচ্চিত্র এটি। বিশ্বের অন্যতম সফল প্রপাগান্ডা চলচ্চিত্র হিসেবে ছবিটির সুখ্যাতি রয়েছে। ছবির মন্তাজ দৃশ্যগুলো দিয়ে পরিচালক সফলভাবে দর্শকমনে পটেমকিনের নাবিকদের জন্য সমবেদনা ও জাহাজের অফিসারদের প্রতি ঘৃণা তৈরি করতে পেরেছেন।

মাদার (১৯২৬)

মাক্সিম গোর্কির অমর উপন্যস ‘মা’ হয়তোবা আমরা অনেকেই পড়েছি। তারই এই গল্প অবলম্বনে ১৯২৬ সালে নির্মিত হয় মাদার যা নির্মান করেন পরিচালক সেভোলোদ পুদোভকিন। ছবির গল্পে দেখানো হয়েছে ১৯০৫ সালের রাশিয়ান বিপ্লবের সময় এক মহিলার সংগ্রামের গল্প। চলচ্চিত্রটি পুদোভকিন। এর রেভ্যুলেশন ট্রিলজির প্রথম চলচ্চিত্র। চলচ্চিত্রটি ১৯৩০ সালে যুক্তরাজ্যে প্রদর্শনীর উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। নির্বাক এ চলচ্চিত্রটি ১৯৬৮ সালে মসফিল্ম স্টুডিওতে পুনরুদ্ধার করা হয় এবং এতে আবহ সঙ্গীত যুক্ত করা হয়।

অক্টোবর (১৯২৮)

রুশদেশে অক্টোবর বিপ্লবের দশ বছর পূর্তি উপলক্ষে ১৯২৭ সালে তৎকালীন সোভিয়েত সরকার নির্মাতা পুদোভকিন ও আইজেনস্টাইনকে দুটি ছবি নির্মানের কাজ দেন। পুদোভকিন তখন নির্মান করেন এন্ড অব সেন্ট পিটার্সবার্গ, আর আইজেনস্টাইন বানান অক্টোবর নামক একটি চলচ্চিত্র। অক্টোবর চলচ্চিত্রটি যৌথ চিত্রনাট্য লেখন ও পরিচালনা করেন গ্রিগরি আলেকজান্দ্রোভ। ছবিতে অক্টোবর আন্দোলনকে এর গুরুত্বপূর্ণ তারিখ ভিত্তিতে নাটকীয়তা দেয়া হয়। তবে চলচ্চিত্রটি ব্যাটেলশিপ পটেমকিনের মত সোভিয়েতে এতটা সফলতা লাভ করেনি। ছবিতে রাষ্ট্রনায়ক ভ্লাদিমির লেলিনকে একটি চরিত্রে অভিনয় করতে দেখা যায়।

ম্যান উইথ অ্যা মুভি ক্যামেরা (১৯২৯)

১৯২৯ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ম্যান উইথ অ্যা মুভি ক্যামেরা চলচ্চিত্রটিতে আদতে কোন ধারাবাহিক কাহিনী নেই। পরিচালক ঝিগা ভের্তভ তৎকালীন সোভিয়েতের ওডেসা সহ মস্কো, কিয়েভ এর জনজীবনকে ফ্রেমবন্দী করেছেন। ছবিটি আজকের দিকে হয়ে উঠেছে সে সময়ের সোভিয়েত ইউনিয়নের জীবন-আচারের জ্বলন্ত দলিল। ছবিতে স্লো মোশন, ফাষ্ট মোশন, জাম্প কাট, স্প্লিট স্ক্রিন, ক্লোজ-আপ শট সহ চিত্রগ্রহণের নানা আধুনিক কারিগরী দিক ফুটে উঠেছে। ছবিটির দৃশ্যধারন করা হয়েছে চার বছর ধরে। পরে ছবিটিকে গোছালোভাবে সম্পাদনার সুতোয় বেঁধেছেন তার স্ত্রী এলিজাভেটা ইসভিলোভা। ছবিটির প্রারম্ভিক মুক্তিকালে এতে কোন মিউজিকের ব্যবহার করা হয়না, দর্শক বর্তমানে এর যে ভার্সনটি দেখেন তা ছবি মুক্তির পর বিভিন্ন সময়ে এতে যুক্ত করা হয়েছে।

আর্থ (১৯৩০)

সোভিয়েত ইউনিয়নের আরেক প্রোপাগান্ড চলচ্চিত্র আর্থ মুক্তি পায় ১৯৩০ সালে যা পরিচালনা করেন আলেকজান্ডার দভচেঙ্কো। পরিচালক ইউক্রেন ট্রিলজি বলে তিনটি ছবি বানিয়েছিলেন যার একটি এই আর্থ, অন্য দুটি ছবির নাম ভেনিগোরা (১৯২৮) ও আর্সেনাল (১৯২৯)। তবে ট্রিলজির মধ্যে চলচ্চিত্রবোদ্ধাদের মতে আর্থ ছবিটিই পরিচালকের দভচেঙ্কোর সেরা কাজ।

আর্থ চলচ্চিত্রটিতে আলেক্সান্দার দভচেঙ্কো সোভিয়েতের তৎকালীন গ্রাম, প্রকৃতির চিত্র তুলে ধরেছিলেন, ছবিতে ছিলো স্লো মোশনের দূর্দান্ত ব্যবহার। সেদেশের গ্রামাঞ্চলে ভূমির মালিক কুলাকদের বিরুদ্ধে ভাসিল নামের এক যুবকের আত্মদানের গল্প দেখানো হয়েছে ছবিটিতে।

লেখাটি ভোরের কাগজে পূর্বপ্রকাশিতঃ প্রথম খন্ড

লেখকের অনুমতি ছাড়া সাইটে ব্যবহৃত সকল প্রকার লেখা পুনঃপ্রকাশ বেআইনি। জরুরী যোগাযোগে ইমেইলঃ altamishnabil@gmail.com

আরো পড়ুন...